সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > আউলিয়ায়ে কিরাম > হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী

হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী

লিখেছেনঃ অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান
এলমে লুুদুন্নিয়ার প্রস্রবণ, উলুমে এলাহিয়ার ধনভাণ্ডার, হাক্বীকতের গুপ্ত রহস্যাবলীর অন্তরদ্রষ্টা, গাউসে জমান মাওলানা মুর্শিদেনা খাজায়ে খাজেগান হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন মাওলা আলী শেরে খোদা হযরত আলী মুরতুজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বংশধর। তাঁর মাযহাব ছিল হানাফী, তরীক্বা ছিল কাদেরিয়া। গাউসিয়াতে কোবরা ও বেলায়তের মহান উচ্চাসনে আসীন মহান সাধক হযরত ফকির মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির ঔরসে ১২৬২ হিজরিতে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার হরিপুর শহরের নিকটবর্তী চৌহর শরীফে তিনি জন্মগ্রহণ  করেন। তাঁর মহান পিতার এক অলৌকিক ঘটনায় দেখা যায়- একদিন তিনি একাকী  ‘গজল’ গাইছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ সুন্দর পোশাক পরিহিত এক সুদর্শন পুরুষ তাঁর সামনে হাযির হয়ে বললেন, ‘‘গজল শোনাও।’’ নির্দেশ মতে গজল গাওয়া শেষ হলে আগন্তুক বললেন, ‘‘তুমি আমাকে চেন?’’ হযরত ফকির মুহাম্মদ ছাহেব ইতোপূর্বে তাঁকে কোনদিন দেখেননি বিধায় বললেন, ‘‘না’’। আগন্তুক উত্তরে বলেন, ‘‘আমি খিজির’’ (আলায়হিস্ সালাম)। তোমার গজল শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি, তোমার মধুর সুর শুনে আমি এসেছি। ভবিষ্যতেও আসব। তিনি তাকে ‘তাওয়াজ্জুহ্’ দিলেন অর্থাৎ পূর্ণতা দান করলেন। আরো বললেন, যেহেতু বাই‘আত সুন্নাত, কাজেই কোন বুযুর্গ ব্যক্তির নিকট ‘বাই‘আত’ গ্রহণ কর। অতঃপর তিনি বুযুর্গ ব্যক্তি হযরত এয়াকুব শাহ্ গিনছাতরী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির নিকট বাই‘আত গ্রহণ করে পীরের খেদমতে থেকে গেলেন। তিনি কখনো মুর্শিদের সাথে সকাল কিংবা বিকেলে ভ্রমণে বের হলে দেখা যেতো পীর-মুরীদ দু’জনই পাশাপাশি হাঁটছেন। একদিন এক মুরিদ মুর্শিদকে বললেন, হুযূর, আপনি হাজারা জিলার লোকটির সাথে যখন ভ্রমণে বের হন তখন দেখা যায়, কেউ কারো আগে যান না। পাশাপাশি চলেন, এর কারণ কি? মুর্শিদ উত্তরে বললেন, ‘‘তিনি (ফকির মুহাম্মদ) ‘এ যুগের গাউস’। আদবের কারণে আমি তাঁর অগ্রে যাই না, আর তিনিও আমার আগে চলেন না, যেহেতু আমি তাঁর মুর্শিদ। (সুবহানাল্লাহ্)। হযরত খিজির আলায়হিস্ সালাম থেকে ফয়ূজাত লাভ করায় তিনি সকলের নিকট খিজিরী উপাধিতে পরিচিত হন। হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেন নি। শুধুমাত্র পবিত্র কুরআন শরীফ পড়তে জানতেন। তাঁর বয়স যখন আট বছর তখন পিতা হযরত ফকির মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বললেন, ‘‘এক কোষে দুই তলোয়ার রাখা যায় না’’। এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি কিছুদিনের মধ্যে স্রষ্টার সান্নিধ্যে গমন করেন। আট বছর বয়সে তিনি ‘চিল্লা’ সাধনা করার ইচ্ছা পোষণ করে কেউ তাঁকে সেবা করতে চান কিনা জানতে চাইলে প্রতিবেশী একজন তাঁর ‘খেদমত’ করবেন বলে ওয়াদা করলেন। হুযূরের নির্দেশ মতো পাশে একটি ‘থালা’ রাখা হলো, প্রত্যেক দিন নির্দিষ্ট সময়ে তিনি থালায় রক্ত বমি করতেন। পানাহার সম্পূর্ণ বন্ধ। একসময় শরীরের এমন জীর্ণ দশা হল যে, রক্তবমির বদলে পানি বমি হতে লাগল। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হলে বমি বন্ধ হল। এ রকম অকল্পনীয় ও অভাবনীয় রিয়াজত দেখে এলাকাবাসী বিস্মিত হন। এ থেকে সকলেই নিশ্চিত হল যে, এ ছেলেটি ভবিষ্যতে মস্তবড় ‘ওলী’ হবেন। এ রকম কষ্টসাধ্য রিয়াজত দ্বারা শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক ত্রুটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে পরিপূর্ণ রূহানী শক্তি হাসিল হয়। কিছুদিন পর সোয়াতে অবস্থানরত ওই সময়কার শ্রেষ্ঠ ওলী হযরত আখুন ছাহেবের সাক্ষাতে গমন করলেন কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে। হযরত আখুন ছাহেবের আস্তানার চতুর্দিকে হাজার হাজার দর্শণার্থীর ভিড় দেখে সঙ্গীরা প্রমাদ গুনলেন। দু’দিন থাকার পর সঙ্গীরা হুযুরকে বললেন, যেখানে শক্তিশালী পাঠানরা দেখা করতে পারছে না সেখানে একজন শিশু কিভাবে দেখা করবে। তারা ফিরে

যাবার অনুরোধ করলে হযরত চৌহরভী অবিচল স্থির কণ্ঠে বললেন, অন্তত আর একটি দিন অপেক্ষা করা যাক! তিনি আরো বললেন, আগামীকাল ভোরে সাক্ষাত না হলে ফিরে যাবেন। বুজুর্গানে দ্বীন’র ‘কাশ্ফ’ তথা অন্তরদৃষ্টি ভবিষ্যৎ প্রত্যক্ষ করেন। ভোরে হযরত আখুন ছাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হবে এটা তিনি অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন বিধায় এ রকম প্রতিজ্ঞা করেছেন। সুবহানাল্লাহ্ , আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারীদের মধ্যে এ রকম হাজারো ‘কারামত’ প্রত্যক্ষ করা যায়। সঙ্গীদের একটু ধৈর্যধারণ করার কথা বলে স্বগতোক্তি করলেন, ‘‘দূর দেশ হতে প্রেমের শরাব পান করতে এ প্রেমের ‘শরাবখানায়’ এসেছিলাম, কিন্তু আফসোস! আমরা ওই প্রেম সুধা হতে বঞ্চিত হয়ে ফিরলাম।’’ আরো বললেন, হযরত আখুন ছাহেব চাশতের নামাযের সময় মসজিদের উঁচু সিঁড়ির ওপর বসে দূর হতে আসা আল্লাহর বান্দাদের সাক্ষাত দেবেন। সুতরাং তোমরা একটু ধৈর্য ধরো। ঐ মহাত্মাকে এক নজর দেখে বাড়ি ফিরব। চাশতের নামাযের সময় হযরত আখুন ছাহেব হুজরার দরজা খুলে খাদেমকে নির্দেশ দিলেন ‘‘আগত মুসাফিরদের মধ্যে হাজারা জিলার এক ব্যক্তি আছেন তাকে খোঁজ করে নিয়ে এসো।’’ খাদেম ভিড়ের মধ্যে এসে বলেন হাজারা জিলার কেউ আছেন কি, তাঁকে হযরত আখুন ছাহেব স্মরণ করেছেন। সঙ্গীরা হযরত চৌহরভী ছাহেবকে দেখা করে আসতে অনুরোধ জানালে তিনি নির্বিকার থাকেন। এখানে হাজারা জিলার অনেকেই থাকতে পারেন, আমি একজন নগন্য লোক। যারা তালাশ করছেন তারাই খুঁজে নেবেন ওই ব্যক্তিকে। আমি নিজ থেকে কিছু বলবো না। কোন সাড়া না পেয়ে তালাশকারীরা বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে দেখে সফরসঙ্গীরা নিরাশ হয়। এমতাবস্থায় এক সঙ্গী হুজুরের দিকে ইংগিত করে তালাশকারীদের দেখিয়ে দিলে তারা কোলে করে হুযূরকে হযরত আখুন ছাহেবের হুজরায় নিয়ে যান। বেলায়তের সূর্য হযরত চৌহরভী ছাহেবকে দেখেই হযরত আখুন ছাহেব পশতু ভাষায় বলেন দাগাদি, দাগাদি, দাগাদি, অর্থাৎ ইনিই তিনি, ইনিই তিনি, ইনিই তিনি, যাঁকে আমি তালাশ করছি। সুবহানাল্লাহ্! হযরত আখুন ছাহেব বললেন, ‘‘ওহে বেলায়তের পরশমণি, দোয়া করুন।’’ হযরত চৌহরভী ফরমান, ‘হযরত আখুন ছাহেব যখন হাত উঠালেন তখন মনে হল সমস্ত আসমানের বোঝা আমার ওপর ন্যস্ত হল। যখন দোয়া শেষ করলেন, তখন ওই বোঝা মহা আনন্দের কারণ হল। “এক জামানা ছোহবতে বা-আউলিয়া বেহতর আজ ছদ ছালাহ্ তা-আত বে-রিয়া” অর্থাৎ ‘এক মুহূর্ত আউলিয়া কেরামের সঙ্গ লাভ করা শত বছরের কবুল হওয়া ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।’

তিনি স্বপ্নযোগে রাতে কিছু দেখেছেন কিনা জানতে চাইলেন হযরত চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হিকে। প্রত্যুত্তরে বললেন, হ্যাঁ, তাঁর চিল্লাস্থলটিই দেখেছেন, হযরত আখুন ছাহেব বললেন, ‘‘আপনি ওখানেই অবস্থান করুন, অন্য কোথাও যাবেন না। পীর ছাহেব আপনার বাড়িতে এসে আপনাকে মুরিদ করাবেন।’’ কিছুদিন পর ‘নুরে মোতলাক’ হযরত এয়াকুব শাহ্ গিনছাতরী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি কাস্মীর হতে হাজারা জিলায় নির্দিষ্টস্থানে চৌহর শরীফে এসে ‘আবদুর রহমান’ বলে এলাকায় কেউ আছেন কিনা জানতে চাইলে স্থানীয় লোকেরা তাকে হযরত চৌহরভী’র হুজরাখানায় নিয়ে যান।
মুর্শিদকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করতেই তিনি হুজরার বাইরে আসেন, অতঃপর মুর্শিদসহ হুজরা শরীফে তশরীফ নেন। মুর্শিদ ‘বাইয়াত’ শেষে তাঁকে অপরিসীম কৃপাদান করে বিদায় হন। হযরত আবদুর রহমান চৌহরভী(রাহঃ) ‘উম্মী’ ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা তাঁর ছিল না। পবিত্র ‘কুরআন’ পাঠ করতে ও লিখতে পারতেন। মোটামুটি ‘কুরআন’ পাঠ শিক্ষা উস্তাদের নিকট থেকে হলেও প্রচলিত ইলমে হাদিস, তাফসীর, ফিক্হ, উসুল ইত্যাদি শিক্ষা কোন জাহেরী উস্তাদ হতে লাভ করেননি এবং লিখার পদ্ধতিও কোন শিক্ষকের নিকটে শেখেননি। কিন্তু কী আশ্চর্য! ইলমে লাদুন্নী তাঁর মধ্যে এসে গেলো। এটা আল্লাহর দান যাঁকে চান প্রদান করেন। তিনি অল্প বয়সে সম্মানিত পিতা হযরত ফকির মুহাম্মদ খিজরী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ‘গাউসিয়াত’ ও ‘কুতুবিয়াত’র সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। তাঁর মৃত্যুশয্যায় এক ভক্ত ‘সমগ্র জগতের কুতুব অর্থাৎ গাউসে আ’যমের পদে এখন কে অধিষ্ঠিত আছেন প্রশ্ন করলে হুজুর বললেন, ‘‘হযরত শাহে জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির পরে ওই মহামর্যাদাপূর্ণ পদে আল্লাহর কোন ওলী দুনিয়াতে আসেননি, তাঁর স্থান শূন্যই ছিল । বহুকাল অতিবাহিত হবার পর একটি বংশধর জন্মলাভ করেন এবং অল্প বয়সেই পিতৃহীন হয়েছেন। তিনি ওই অবস্থায় অতি স্বল্প বয়সেই শাহে জিলান সৈয়্যদুনা হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির প্রকৃত নায়েব হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ওই মহাপুরুষ অসীম আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসহকারে বিশ্বজগতের গাউসরূপে অধিষ্ঠিত আছেন।’’ (তিনিই সে মহাপুরুষ ছিলেন) তাঁর প্রধান খলীফা গাউসে জমান কুতবুল আকতাব হযরত মাওলানা হাফেজ সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ ছিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হিকে ফরমান যে, ‘‘গাউসিয়াতের মহামর্যাদাপূর্ণ পদ খান্দানে কাদেরিয়ার জন্য সংরক্ষিত। যদি এ খান্দানের কোন ব্যক্তি উপযুক্ত না থাকে তবে অন্য সিলসিলা থেকে গাউসে জামান মনোনীত হন। তিনি আরো ফরমান, এটা অত্যন্ত লজ্জার কারণ হবে যদি আমাদের অনুপযুক্ততার কারণে আমাদের ঘরের দৌলত অন্য কাউকে দেয়া হয়।’’ হযরত চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট দোয়া করতেন, ‘তাঁকে যেন কেউ না চেনে, এমন কি যাঁরা তাঁর নিকট আসবে, তারা যেন মিসকিন, ফকির ও দ্বীনি আলেম হন। আমীর ওমারাহ্ বা ধনী ব্যক্তিদের জন্য তাঁর দরজা বন্ধ হয়। আল্লাহ্ পাক তাঁর এ দোয়া কবুল করেছেন বলে জানান, পীর মীর আলী শাহ্ ছাহেব একবার তাঁকে বললেন, ‘‘অনেক মেহমান তাঁর নিকট আসে, কিন্তু হাদিয়া তোহফা তেমন আসেনা। আমি একটি দোয়া শিখিয়ে দিচ্ছি যাতে আপনার হাদিয়া তোহফা বৃদ্ধি পায়।’’ তখন হযরত চৌহরভী  রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, হযরত ছাহেব! খোদার নিকট আমি লজ্জাবোধ করি যে, ‘‘লোকেরা আমাকে বুযুর্গ মনে করে আসবে, আর আমি পয়সা রোজগারের জন্য ওজিফা পাঠ করবো।’’
তিনি স্বল্প ও মিষ্ঠভাষী ছিলেন। শ্রুতিমধুর বাক্যালাপে সিলসিলার কার্যাদি সমাপ্ত করতেন। অনর্থক কথা-বার্তা বলতেন না। একদিন এক মাওলানা জটিল মাসআলার সমাধান খুঁজতে হুজুরের নিকট আসলে অতি সরল পদ্ধতিতে সমাধান করে দিলেন এবং এ কথা কাউকে না বলার জন্য অছিয়ত করলেন। তিনি ‘জজবাত’ ও ‘জালালিয়াত’ মুক্ত ছিলেন। তাঁরই প্রধান খলিফা হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ আরজ করলেন, ‘‘আল্লাহর ওলীর আখেরী দরজা কি ‘তাখাল্লাক্বূ বেআখলিকাল্লাহ্?’ অধিকাংশ সময় তিনি বলতেন, আমি ‘উম্মী’। কেউ মাসআলা জিজ্ঞেস করলে বলতেন একজন আলেমের নিকট জেনে নাও। তবুও কেউ বারংবার অনুরোধ করলে সঠিক সমাধানটি দিয়ে দিতেন। তাঁর অবিস্মরণীয় কিতাব দুরূদ সম্বলিত ত্রিশপারা ‘মুহাইয়্যিরুল উকুল ফী বয়ানে আওছাফে আকলিল উকুল’ ‘মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রসূল’ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) অনেক বছর পূর্বে লেখা হলেও জীবদ্দশায় তিনি এটা লুকিয়ে রাখেন। ইন্তেকালের কয়েক বছর পূর্বে রেঙ্গুন (ইয়াংগুন) প্রবাসী প্রধান খলীফা হযরত মাওলানা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটির নিকট জানালেন এ অপূর্ব বিস্ময়কর সৃষ্টির কথা। এটা বোখারী শরীফের মতো ত্রিশপারা সম্বলিত, পারা গুলো কুরআন শরীফের পারা হতে একটু বড়। যদি সম্ভব হয় সেখানকার লোকজন থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে কিতাবখানা ছাপিয়ে দিও। এতে মাখলুকাতের উপকার হবে। এ বিশাল দরূদ শরীফ লেখা সম্পন্ন করতে সময় লেগেছিল ১২ বছর ৮ মাস ২০ দিন। অথচ এটা প্রণয়নের কথা ইতোপূর্বে কেউ জানতে পারেননি। বিশ্বখ্যাত এ ওলীর বাসগৃহ ছিল কাঁচা, ছাদ ছিল ফুটো, বৃষ্টির পানিতে ঘরের ভিতরে পানি এসে গেলে রাতে তিনি থালায় করে পানি বাইরে ফেলতেন। মেহমানদের আপ্যায়ন করতে তিনি অধিক মনোযোগী থাকতেন। ঘরে তৈরি রুটি তরকারি নিয়ে তিনি প্রতিদিন খানকায় যেতেন। অবশিষ্ট থাকলে খাওয়া হতো, না হয় উপোস থাকতেন। তিনি ছিলেন প্রিয় নবীর প্রতিচ্ছবি। যখন তিনি জানতে পারলেন যে, প্রিয়নবী মসজিদের চাঁটাই সেলাই করেছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে চাটাই সেলাই করতে লেগে যান। এ সময় ওপর থেকে হযরত পীর শাহ্ আলী এসে বললেন, ‘আমাকে মাখন এনে দাও, আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে’ হুজূরকে নির্লিপ্ত দেখে তিনি আবার বললেন, ‘হয়েছে এবার উঠো, আংশিক সেলাই করা সুন্নাত পুরোটা নয়।’ একথা শুনে হুযূর একটু হাসি দিয়ে পীর আলী শাহ’র জন্য মাখন এনে দিলেন।
পাকিস্তানের হরিপুরে হুজুরের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা

দ্বীনি এলেম শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর আন্তরিক মুহাব্বত ছিল। হুযূরের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা-এ ইসলামিয়া রহমানিয়া হরিপুরের ছাত্রদের জন্য তাঁর নিজস্ব লঙ্গরখানা হতে রুটি পাঠানো হতো। একবার নামাজের সময় এমন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল যে, ঘর হতে বের হওয়ায় ছিল দুষ্কর। খানকাহ্ শরীফে অবস্থানরত কেউই মাদরাসার ছাত্রদের জন্য রুটি নিয়ে যেতে সাহসী হলেন না দেখে হুজুর নিজেই এ বৃষ্টির মধ্যে রুটি তরকারি নিয়ে বের হলেন। তিনি সর্বদা মোটা কাপড় পরিধান করতেন।

হুজুর ২টি জিনিস হতে তাওবা করেছিলেন।
১. ‘কাশ্ফ’ হতে, ২. নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি হতে। 
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী হুজুর একদিন ঘরে বলেছিলেন যেন তাঁর জন্য দু’খানা কালো চাদর তৈরি করে দেয়া হয়। এটা বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। পরক্ষণেই ফিরে এসে চাদর তৈরি না করার জন্য বললেন। পরদিন একজন ভক্ত এসে চাদর প্রস্তুতের জন্য সুতা, রং বুননের জন্য পারিশ্রমিক হুজুরের হাতে দিয়ে বললেন, আমি বাইরে অন্যত্র চলে যাচ্ছি আপনি নিজের কাপড় প্রস্তুত করে নেবেন। কেননা, শীত ঘনিয়ে আসছে। তাওবা করার পর হতে আল্লাহর পক্ষ হতে শীতের সময় শীত ও গ্রীস্ম মৌসুমে গরম কাপড় খেয়াল ব্যতীত যোগাড় হতো। সুবহানাল্লাহ্। হুযূর একদিন একস্থানে বিশ্রাম করছিলেন। সে সময় এর অদূরে একজন লোক এসে গোসল করলো। হুযুর তাকে বললেন, তুমি জেনা করেছ? লোকটি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে হুজুরের নিকট ক্ষমা চাইলো। সঙ্গে সঙ্গে হুজুরের ভাবান্তর ঘটে, আল্লাহ্ পাক বান্দার পাপ কাজ দেখেও গোপন রাখেন, আর আমি আল্লাহর বান্দাদের গোপন দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে দিচ্ছি। ওইদিন হতে হুজুর কাশফ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, সংযমী ও চরম ধৈর্যশীল। অভাবগ্রস্ত লোকদের সান্নিধ্য বেশী পছন্দ করতেন, আলেম ও ফকির দরবেশ আগমন করলে তাদের সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন, সাক্ষাতের কোন নির্ধারিত সময় ছিল না। যে কোন সময় যে কেউ দেখা করতে পারতেন। হুজুরের ছাহেবজাদা মুহাম্মদ ফজলে সোবহান জনৈক ব্যক্তির পরামর্শে জিজ্ঞেস করলেন- হুজুরের পর কে গদীনশীন হবেন? একথা শুনে খুবই ক্রোধান্বিত হয়ে হুজুর বললেন, ‘গদীর উপর গাধা বসে, আমিতো চাটাইতে বসার লোক।’
একদিন এক ভক্তকে কিছু উপঢৌকন দিয়ে বললেন, ‘তুমি হজ্বে যাও।’ হজব্রত পালন শেষে ফেরার পথে অমুক অমুক লোকদের এগুলো পৌঁছিয়ে দেবে। লোকটা ছিল খুবই ঘুমকাতুরে। যাত্রাকালে হুজুর সামনের ‘তুত’ গাছটিকে লক্ষ্য করে বললেন, এ লোকের ঘুম গচ্ছিত রাখ, পরে ফেরত দিও। হজব্রত পালন শেষে লোকটি হুজুরের নিকট সবিস্তারে বর্ণনা করলেন এবং বললেন, যে তাঁর মোটেই ঘুম আসেনি। ঘুমের অভ্যাস নেই বললেই চলে। একথা শুনে হুজুর বললেন, ‘তুত’ গাছ থেকে তোমার গচ্ছিত জিনিসটা নিয়ে নাও। একথা বলার সাথে সাথে লোকটির ঘুম এসে গেল। ঘুমের কারণে লোকটির কয়েক ওয়াক্ত নামাজ ক্বাযা হয়ে গেল। হুজুর একসময় ঘুম থেকে জাগিয়ে রুটি খেয়ে পুনরায় ঘুমিয়ে যেতে বললেন। এক ভক্ত ‘গাউসে যামানের পরিচয়’ কী জানতে চাইলে হুজুর বললেন, সে সামনের ওই ‘তুত’ গাছকে হেঁটে চলে আসতে হুকুম করলে সে চলে আসবে। কথা শেষ হতে না হতেই ‘তুত’ গাছটি শিকড় সমেত হাঁটা শুরু করে দিলে হুজুর ‘তুত’ গাছকে বললেন, থামো! তোমাকে আসতে বলিনি। আমি এ লোকটিকে গাউসে যামানের পরিচয় বলছিলাম। সুবহানাল্লাহ! প্রিয় নবীজি চন্দ্রকে ইঙ্গিত করতেই চন্দ্র টুকরো হয়ে যায়। আবার হুজুরের ইশারায় চন্দ্র আপন অবয়বে স্থির হয়ে গেল, তেমনি প্রিয় নবীর উত্তরসূরি মহান অলী হুজুর চৌহরভীর বেলায়ও সে রকম কারামত পরিলক্ষিত হয়। এতে বোঝা যায় যে, এ মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের ক্ষমতা কত ব্যাপক ও অকল্পনীয়। সুবহানাল্লাহ্। হুজুর চৌহরভী ও জনৈক পীর ছাহেব হজব্রত পালনে যাত্রাকালে এক দরবেশ এসে বললেন, সেতার বাজানোর কারণে গ্রামের মাওলানা তাঁকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিয়েছেন। আপনারা তাঁকে বুঝিয়ে বলেন যেন আমাকে ‘কাফের’ না বলে। এ কারণে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। হুজুরের সঙ্গী-পীর ছাহেব সেতার বাজানো বন্ধ ও ফতোয়া সম্পর্কে ওই মওলানা ছাহেবকে বলবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু হযরত চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সঙ্গী সেই পীর ছাহেবকে কোন রকম সমাধান করতে বারণ করলেন। এও বললেন, হজ্বব্রত পালন শেষে ফিরতি পথে ফয়সালা করা হবে। ফিরতি পথে সেই পীর ছাহেবকে সেতারা বাদকের ফতোয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে উভয়ই মাদরাসার ওই মুফতি আলেমের নিকট উপস্থিত হয়ে দেখেন যে, মুফতি নিজেই সেতার বাজাতে বাজাতে মেহমানদের সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন। প্রশ্নকর্তা পীর ছাহেব মুফতি ছাহেবকে কাফের ফতোয়া দেয়া সত্ত্বেও তিনি কেন এখন সেতার বাজাচ্ছেন? প্রত্যুত্তরে মাওলানা বললেন, আপনাদের দু’জনের একজনের মেহেরবানীতে হয়েছে। সঙ্গী পীর ছাহেব তখন হযরত চৌহরভী ছাহেবের নিকট এর রহস্য জানতে চাইলে হুজুর বলেন, যাত্রাপথে আপনি যখন সমাধানের কথা ভাবছিলেন, তখন আমি দেখলাম যে দরবেশ ওয়াদা করে সেতার বাজানো বন্ধ করলে তার রূহানী খোরাকের অভাবে সে মারা যেতেন আর আপনি (পীর ছাহেব) খুনের দায়ে অভিযুক্ত হতেন। (হুজুর) খুনের দায় হতে আপনাকে রক্ষা করলাম। আর মাওলানা ছাহেব এলমের ওপর গর্ব করে ব্যথিত ব্যক্তিকে ‘কাফের’ বলতেন তাকেও সে ব্যথা থেকে উদ্ধার করলাম। এক গুলিতে দুই শিকার হলো। এ ঘটনা দ্বারা নিশ্চিত হওয়া গেল যে, তাঁর মধ্যে হযরত খিজির আলায়হিস্ সালাম’র উদ্দীপনা ও কর্মক্ষমতা বিদ্যমান ছিল। তিনি যখন যে ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে যে অবস্থারই প্রতিফলন ঘটাতে ইচ্ছে করতেন অতি সামান্য নেক নজরে তা সম্পন্ন করতেন। তিনি ‘কামালিয়াতের ওপর পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও আধিপত্যের অধিকারী ছিলেন।
হুজুরের লিখিত ত্রিশ পারা দরুদ শরীফের কিতাব এটি। আলহামদুলিল্লাহ! কিতাবটির ত্রিশপারার মধ্যে ইতোমধ্যে বারো পারা বাংলা অনুবাদ সহকারে প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর রচিত অবিস্মরণীয় দুরূদ শরীফের অমূল্য কিতাব মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রত্যেকটি ছত্রে প্রিয় নবীজির কোন না কোন বৈশিষ্ট্য এবং গুণাবলীর বর্ণনা করা হয়েছে। সমগ্র কিতাবে চারিত্রিক সৌন্দর্য, মাধুর্য ও বৈশিষ্ট্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। এ গ্রন্থ সম্পর্কে তার প্রধান খলীফা গাউসে জমান হযরত মাওলানা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মূল্যায়ন এ গ্রন্থ হুজুর চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হির ইলম ও মা’রিফাত সমুদ্রের একটি বিন্দুমাত্র; যা তাঁর ইন্তিকালের পর বিশ্ববাসীর সামনে মহান আল্লাহর রহমত ও করুণার বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। এ গ্রন্থের আওরাদ বা ওজিফাগুলো প্রায় ১০০টি নির্ভরযোগ্য কিতাব হতে সংকলিত। দুরূদ শরীফ রচনার এ অভিনব পদ্ধতি তাঁর নিজস্ব আবিষ্কার। অদ্যাবধি কোন দুরূদ শরীফ রচয়িতার মধ্যে এমন রচনাশৈলী বিরল। এটা অধ্যয়নে তাফসীর, উসুলে তাফসির, হাদীস ও উসুলে হাদীস, ফিকহ্, উসুলে ফিকহ্, মানতেক, দর্শন প্রভৃতি জ্ঞান-বিজ্ঞান অধ্যয়ন ও বুঝার সক্ষমতা সৃষ্টি হয়। এখানে এমন কিছু বিষয় আছে যা শুধু হুজুর চৌহরভী রহমাতুল্লাহি আলায়হির সাথেই সম্পৃক্ত ও নির্দিষ্ট। এ মহান মুর্শিদের জ্ঞান কামালিয়াতের স্তর ও কারামতের বর্ণনা দেয়া দুঃসাধ্য। কেননা যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন গাউসে জমান আওলাদে রাসূল হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি কবির ভাষায় ব্যক্ত করেছেন- মানছে গোয়াম শরহে ওয়াছফে আঁ জনাব আফতাবাস্ত, আফতাবাস্ত, আফতাব। আমি ওই সম্মানিত ব্যক্তির গুণাবলীর কি ব্যাখ্যা দেব, তিনি সূর্য, সূর্য তো সূর্যই।

ছবিতে চৌহরশরীফে দেখা যাচ্ছে হুজুরের মাজারের গম্বুজ ।

এ মহান পথ প্রদর্শক, নুরে মুজাচ্ছম প্রিয় নবীর প্রতিচ্ছবি উলুমে এলাহিয়ার ধণভাণ্ডার, মা‘আরেফে লুদুন্নিয়ার প্রস্রবণ খাজায়ে খাজেগান হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী ১ জিলহজ্ব ১৩৪২ হিজরি রোজ শনিবার বাদ নামাজে মাগরিব ইন্তেকাল করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কুতবুল এরশাদ হযরত হাফেজ সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি, কতুবুল এরশাদ হযরত হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ ও যীনাতে কাদেরিয়াত হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ মাদ্দাজিল্লুহুল আলীর মতো আওলাদে রসূল, গাউসে জামানদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দ্বীন মাযহাব-মিল্লাত, নবী-ওলী প্রেমিকদের দল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’র ঝাণ্ডা বিশ্বে সমুন্নত রেখে আসছেন। আমরা নবী-ওলী প্রেমিকগণ যেন এ সকল মহাপুরুষের ফয়ূজাত লাভে ধন্য হতে পারি এ কামনা করি। এদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জীবন অতিবাহিত করার শক্তি ও সাহস যেন আল্লাহ্ পাক আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করেন।

[প্রবন্ধটি মাসিক তরজুমান হতে সংগৃহীত]

Check Also

ইসলামী শিক্ষার ব্যাপারে ইমাম আহমদ রেযা (রহঃ)-এর দৃষ্টিভঙ্গী

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরেলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৮৫৬ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *