সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > সাহাবায়ে কিরাম > হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও কল্যাণময় রাষ্ট্র

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও কল্যাণময় রাষ্ট্র

জসিম উদ্দীন মাহমুদ

হযরত আবু বকর! আড়ম্বরহীন সহজ সরল একটি নাম। যে নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে মনে জাগে একটি সৌম্য, স্নিগ্ধ, পবিত্র পুরুষের মুখ। একমাত্র সন্ধ্যাতারার সঙ্গেই সে মুখের তুলনা হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার সাহাবীরা তারকা সদৃশ্য। তাদের মধ্যে তোমরা যারই অনুসরণ করবে সৎপথ পাবে।” জান্নাতের দশজন সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের প্রথম জন হলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের দুই বছর তিন মাস পর পবিত্র মক্কা নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম আব্দুল্লাহ, আবু বকর কুনিয়াত (উপনাম)। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে “সিদ্দীক” এবং “আতীক” উপাধিতে ভূষিত করেন, কালক্রমে সিদ্দিকে আকবর এবং আবু বকর এ উভয় নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। মাতা-পিতা উভয়ের দিক থেকে হযরত সিদ্দিকে আকবর এর বংশ তালিকা উর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ মুররা ইবনে কাবে গিয়ে হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম -এর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তাঁর পিতার নাম আবু কোহাফা, মাতার নাম ছিল উম্মুল খাইর।

হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পিতা-মাতার অত্যন্ত স্নেহভাজন সন্তান ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বভাবজাত বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানের অধিকারী। সদ্ব্যবহার, অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট ও মাধুর্য, ব্যবসায়িক সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিপ্রেক্ষিতে মক্কা নগরীতে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। সে সময়ে আরবে সর্বপ্রকার পাপাচার পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ মানুষ পাপাচারে লিপ্ত ছিল। এমতাবস্থায় যে কয়জন মুষ্টিমেয় পুণ্যাত্মা এসব পাপাচারকে আন্তরিকভাবে ঘৃণা করতেন হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ছিলেন তাঁদের একজন। সামগ্রিক পর্যালোচনায় তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, নেক ও নিষ্কলুষ ব্যক্তি। নিলর্জ্জতা, মন্দ কথা বলা, কটূক্তি করা, নেশাগ্রহণ ইত্যাদির প্রতি তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যেহেতু প্রকৃতিগতভাবেই নির্মল অনুপম চরিত্রসম্পন্ন ছিলেন, তাই তাঁর কাছে এমন ধরনের মানুষই বাঞ্চিত ও কাক্সিক্ষত ছিল। আর এজন্যই তিনি হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে বেছে নেন।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রকাশ্য হায়াত জীবনের অবসানের পর হিজরী ১১-এর ১৩ রবিউল আউয়াল শনিবার খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। এরপর তিনি সরকার প্রধান বা খলিফাতুর রাসুল হিসেবে জাতির উদেশে প্রথম ভাষণ দেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার অনন্য দলীল হিসাবে আজও স্মরণীয়।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, “সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর। তিনি বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও প্রতিপালক, দরূদ শান্তিপ্রিয় রাসুল, তাঁর পরিবারের সকল সদস্য এবং সাহাবাগণের উপর”।

প্রিয় জনগণ! যদিও আমি আপনাদের প্রধান হয়েছি, কিন্তু আমি আপনাদের চেয়ে উত্তম নই। আমাদের জন্য পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। মানুষের জীবন ও সমাজ পরিচালনার জন্য আল্লাহর মাহবুব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিয়ম-নীতি প্রবর্তন করে দিয়েছেন। আমরা তা খুব ভালোভাবে বুঝে নিয়েছি।

প্রিয় ভাইয়েরা! সবচেয়ে বুদ্ধিমান তারাই যারা আল্লাহকে ভয় করে জীবন চালায়। খুব বেশি নির্বোধ তারাই যারা আল্লাহর অবাধ্যতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। প্রিয় ভাইয়েরা! আপনাদের মধ্যে যিনি খুব শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত তিনি আমার কাছে অত্যন্ত নগণ্য ও দুর্বল। তিনি যদি কারো কোন অধিকার ও পাওনা আত্মসাৎ করে তা প্রাপকের নিকট ফিরিয়ে দিতে আমাকে কোন বেগ পেতে হবে না। পক্ষান্তরে, আপনাদের বিবেচনায় যিনি নগণ্য ও দুর্বল তিনি আমার কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সবল। তাই, তাঁর অধিকার ও পাওনা তাকে ফেরত দিতে না পারা পর্যন্ত আমি নিজেকে নিরাপদ মনে করব না।

প্রিয় ভাইয়েরা! আমি রাষ্ট্রীয় সকল সিদ্ধান্ত ও প্রয়োগে প্রিয় রাসুলের শতভাগ অনুসরণ করবো। আমার কোন কিছু রাসুলের নিয়ম-নীতির পরিপন্থী হবে না।

প্রিয় ভাইয়েরা! আমি রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পদাঙ্ক অনুসরণ করব, ততক্ষণ আমাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা আপনাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হবে। আর আমি যদি কোনো সিদ্ধান্ত ও প্রয়োগে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করি, তাহলে আমাকে অনুসরণ করা আপনাদের কর্তব্য হবে না। এ ক্ষেত্রে আমাকে সতর্ক করা আপনাদের দায়িত্ব হবে। আমি আল্লাহর কাছে আমার ও আপনাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

ইসলাম নিছক মাত্র ব্যক্তি জীবনকেন্দ্রীক কোন ধর্ম নয়। সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর কার্যকারিতা অপরিসীম। সরকার প্রধান হিসেবে জাতির উদ্দেশে সিদ্দিকে আকবরের প্রদত্ত ভাষণ সে কথাই ঘোষণা করে।
বর্তমান অনেকে মনে করেন, একটি রাষ্ট্রে মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বসবাস থাকতে পারে। কিন্তু ইসলাম অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হলে অমুসলিমরা তাদের অধিকার হতে বঞ্চিত হবে, অবহেলিত হবে। অথচ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর। ইসলামে রয়েছে অমুসলিমদের জন্য পৃথক নীতিমালা। অমুসলিমদের জান-মাল, ইজ্জত-সম্মান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনালয় রক্ষাসহ যাবতীয় নিরাপত্তার বিধান রয়েছে ইসলামি শাসন-ব্যবস্থায়। অমুসলিমদের সাথে সামাজিক অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ রয়েছে ইসলামে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক পবিত্র মদিনা রাষ্ট্রে অমুসলিম বনী-নজীর, বনী কায়নুকা ও বনী কুরায়জার সাথে সম্পাদিত চুক্তি এর উজ্জ্বল প্রমান। এই চুক্তিতে মদীনা রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সমান অধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্র ও জনগণের উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা বিধানে সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। নাগরিক শত্র“কে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করার সংকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, অশান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার আবেদন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সাম্য, মৈত্রী, শান্তি, ক্ষমা, ঔদার্য, ন্যায়নীতি ও মানবপ্রেমের পক্ষে কথা বলার মানুষগুলো কমে আসছে চোখে পড়ার মতো। সমাজে বিদ্যমান হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির পথ বের করা বিবেকবান মানুষের জরুরী নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অথচ বিবেকবান মানুষগুলোও বিভিন্ন কারণে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন আমাদের সমাজে।
আমরা জানি স্বাধীন অর্থ স্ব-অধীন। যে কেবল নিজের অধীন, অপরের আজ্ঞাবহ নয়, স্বনির্ভর বা অন্য কারো উপর নির্ভরশীল নয়, আভিধানিক অর্থে সে স্বাধীন। স্বাধীন একটি বিশেষণবাচক শব্দ। এর বিশেষ্য হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এই স্বাধীনতা ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সর্বদা সর্বজন কাঙ্খিত। এবং স্বাধীনতা দুনিয়ার অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিয়ামত।
ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং সমাজ ও জাতির ক্ষেত্রে এটা সামাজিক, রাষ্ট্রিক, বা জাতীয় স্বাধীনতা। এগুলো এক একটি আলাদা শব্দ হলেও অর্থ ও কার্যকারিতার দিক থেকে পরস্পর সম্পূরক বা সমার্থক। ব্যক্তি স্বাধীনতা ব্যতীত সামাজিক ও জাতীয় স্বাধীনতা যেমন অর্থহীন, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বাধীনতাও তেমনি খর্বিত। অতএব, স্বাধীনতা হতে হবে সার্বিক। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যখন অন্যের অধীনতা ও খবরদারী থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু করতে পারে, সর্বোপরি বিশ্বের দরবারে স্বীয় স্বাধীন সত্তা ও মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয় তখন সেটাকেই যথার্থ স্বাধীনতা বলে অভিহিত করা চলে।

তবে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। যা খুশী তাই করার নাম স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতা বলতে নিজের যেসব অধিকার বুঝায়, অন্যের ক্ষেত্রেও সেসব অধিকার নিশ্চিতকরণের মধ্যে স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেমন একটি সংবিধান দরকার, একটি সমাজ পরিচালনার জন্যও তেমনি কতগুলো নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধান প্রয়োজন। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের অন্য সকল মানুষের সাথে মিলে মিশে সামষ্টিক কল্যাণ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সকলের সমঅধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি মেনেই তাকে চলতে হয়। ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় ‘Peaceful co-existence’ অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। অন্যভাবে এটাকে ‘Mutual trade policy’ অর্থাৎ পারস্পরিক লেনদেন নীতিও বলা চলে। সমাজে যে কোন ব্যক্তি জীবনধারণের প্রয়োজনে সর্বক্ষণ সমাজ থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করতে হয়। অনুরূপভাবে, সমাজকে বিভিন্নভাবে অহরহ কিছু না কিছু তাকে দিতেও হয়। সমাজ থেকে যা কিছু সে নেয়, সেটা হলো তার অধিকার আর সমাজকে সে যা কিছু দেয় সেটা হলো সমাজ ও মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব-কর্তব্য। যে সমাজ তার নাগরিককে যত বেশি সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার প্রদান করে, সে সমাজ তত উন্নত, সুন্দর ও জনকল্যাণকামী সভ্য সমাজ। আবার যে সমাজের নাগরিকগণ তাদের নাগরিক ও সামাজিক দায়িত্ব যত বেশি সুষ্ঠু ও যথাযথভাবে পালন করে সে অনুযায়ী তাদেরকে সমাজের আদর্শ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এভাবে সুষ্ঠু সামাজিক ব্যবস্থা, উন্নত সুশীল নাগরিক জীবনের জন্য সমাজ ও সামাজিক ব্যক্তিদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা তথা পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই একান্ত অপরিহার্য। আর এ বিষয়ে যত সচেতন হওয়া যাবে ততই স্বাধীনতার সুফল লাভ সহজ হবে। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর জীবন থেকে আমরা সে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *