সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > হজ্ব এবং কুরবানি > হজ্বে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা

হজ্বে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা

মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

ধৈর্যের আরবী প্রতিশব্দ- اَلصَّبْرُ وَالْحِلْمُ। আল-মু‘জামুল ওয়াসীত গ্রন্থাকার বলেন, اَلصَّبْرُ هُوْ حَبْسُ النَّفْسِ عَنِ الْجَزْعِ- অর্থাৎ: ‘অন্তরকে বিপদের অসহনীয়তা প্রকাশ করা হতে রুদ্ধ করার নাম সবর’ (ধৈর্য)। মুফতী আল্লামা সৈয়্যদ আমীমুল ইহসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ‘আত-তারীফাত’ গ্রন্থে বলেন,اَلصَّبْرُ هُوَ تَرْكُ الشِّكْوَى مِنْ أَلَمِ الْبَلْوَى لِغَيْرِ اللهِ لَا إِلَى اللهِ فَإذَا دَعَا اللهَ الْعَبْدُ فِىْ كَشْفِ الضُّرِّ عَنْهُ لَا يَقْدَحُ فِىْ صَبْرِهِ- – অর্থাৎ: ‘ধৈর্য হলো- আল্লাহ তা‘য়ালা ব্যতিত অন্য কারো নিকট সর্বোত বিপদাপদ হতে অভিযোগ বর্জন করাকে সবর বলে’। আর যদি বান্দা যে কোন কষ্ট-বিপদ হতে মুক্তির জন্য আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট প্রার্থনা করেন, তবে এরূপ প্রার্থনা তার সবরে কোন ক্ষতি করবে না (তিনি সবরকারীই থাকবেন, কেননা বান্দা তার সকল প্রার্থনা তো আল্লাহ তা‘য়ালার নিকটই করবেন)। اَلصَّبْرُ এর কর্তৃবাচক শব্দ হলো- اَلصَّابِرُ। বাংলা অর্থ- ধৈর্যশীল, সহিষ্ণুতাধারী, সহনশীল, সহ্যশীল ইত্যাদি। ইংরেজিতে ধৈর্যকে- Patience, Endurance বলে।

 

কুরআন মাজীদের আলোকে ধৈর্যের বর্ণনা:

ধৈর্য মানব জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ধৈর্যশীল ব্যক্তি সর্বত্র সম্মানিত ও পুরুস্কৃত হন। মহামহিম আল্লাহ ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে ভালবাসেন এবং তার জন্য উত্তম প্রতিদানের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘য়ালা নিজেই সবচেয়ে বড় ধৈর্যশীল। তাই আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদের ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং একে তার সাহায্য ও সান্নিধ্য লাভের উপায় বলে ঘোষণা করে সূরা বাক্বরার ১৫৩ নং আয়াতে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ –

অর্থাৎ: “ওহে মুমিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”।

ধৈর্যই সফলতার সোপান উল্লেখ করে আল্লাহ পাক সূরা আলে ইমরান-এর ২০০ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ –

অর্থাৎ: “ওহে মু’মিনগণ! ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্যধারণকারী ও সুসম্পর্ক স্থাপনকারী হও আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার”।

সূরা হজ্বের ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়া’লা বলেন,

الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ

অর্থাৎ: “(শুভ সংবাদ দিন) ঐ সকল ব্যক্তিদের- যাদের সামনে আল্লাহর নাম নেওয়া হলে, তাদের অন্তরসমূহ ভয়ে কম্পিত হয় এবং যারা ধৈর্যশীল- যে বিপদই তাদের উপর আপতিত হয়। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠাকারী ও আমার প্রদত্ত রিযিক হতে যারা ব্যয় করে থাকে”।

পবিত্র কুরআন ধৈর্যকে কত গুরুত্ব দিয়েছে তার বর্ণনায় ইমাম আহমদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘য়ালা কুরআনে কারীমের নব্বই স্থানে ধৈর্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন’। আর ধৈর্যের আলোচনা নামাযের চেয়ে ০৮ বার বেশী করা হয়েছে।

 

পবিত্র সুন্নাহর আলোকে ধৈর্য:

হাদিস শরীফেও ধৈর্যের গুরুত্ত্ব ও ফলাফলের অনেক বর্ণনা এসেছে। রাসূলে কারীম (ﷺ) নিজেই ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক ছিলেন। যেমন, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,

‘ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপকতর কল্যাণ কাউকে প্রদান করা হয়নি’। (বুখারী শরীফ, হাদিস নং- ১৩৭৬; মুসলিম শরীফ, হাদিস নং- ১৭৪৫।)

অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:

‘মু’মিনের ব্যাপারটি চমৎকার, নেয়ামত অর্জিত হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যা তার জন্য মঙ্গলজনক এতে কৃতজ্ঞতার সওয়াব অর্জিত হয়। মুসিবতে পতিত হলে ধৈর্যধারণ করে, তাও তার জন্য কল্যাণকর এতে ধৈর্যের সওয়াব লাভ হয়’। (মুসলিম শরীফ, হাদিস নং- ৭৬৯২, মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং- ১৮৯৫৪।)

জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা:

প্রতিটি পদক্ষেপে মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর নির্দেশের সামনে ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর পথে সফলতার অর্জনের ক্ষেত্রেও ধৈর্যের প্রয়োজন। কারণ, এ পথে নামলে নানা ধরণের কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেছেন,

‘মুমিন নর-নারীর ওপর সময় সময় বিপদ ও পরীক্ষা এসে থাকে। কখনো সরাসরি তার ওপর বিপদ আসে, কখনো তার সন্তান মারা যায়, আবার কখনো বা তার ধন-সম্পদ বিনষ্ট হয়। আর সে এসব মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করার ফলে তার কলব পরিষ্কার হতে থাকে এবং পাপ থেকে মুক্ত হতে থাকে। অবশেষে সে নিষ্পাপ আমলনামা নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়। (জামি‘ তিরমিযি, হাদিস নং- ২৭৮৬)। হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে, “সবর হল জ্যোতি।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং- ২২৯০২ ও ২২৯০৮ ও মুসলিম শরীফ, হাদিস নং- ২২৩)।

 

বিজ্ঞজনের দৃষ্টিতে ধৈর্য:

জগতের সকল সফল, স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিগণ ধৈর্যকে আপন জীবনে নানান রূপে অধিগ্রহণ করেছেন। যেমন,
১. হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “ধৈর্যকে আমরা আমাদের জীবন-জীবিকার সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে পেয়েছি।” (বুখারী)
২. হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “ঈমানের ক্ষেত্রে ধৈর্যের উদাহরণ হল দেহের মধ্যে মাথার মত।” এরপর আওয়াজ উঁচু করে বললেন, “যার ধৈর্র্য নাই তার ঈমান নাই।”
৩. ইমাম হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: ‘আমাদের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানীদেরও অভিজ্ঞতা, ধৈর্যের চেয়ে মূল্যবান বস্তু আর পায়নি। ধৈর্যের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা যায়, তবে তার সমাধান সে নিজেই।” অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিসের জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন, আবার ধৈর্যের জন্যও ধৈর্য প্রয়োজন। আর ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কারবালর প্রান্তরে তো অনাগত কালের উম্মতের জন্য ধৈর্যের সর্বশ্রেষ্ঠ উপমা স্থাপন করে গেছেন।

 

পবিত্র হজ্ব ও ধৈর্য:

আল্লাহ তা‘য়ালার প্রদত্ত মহা নেয়ামত পবিত্র হ্জ্বব্রত কিন্তু এমন দেশে ও পরিবেশে আদায় করতে হয়, যেখানে রুক্ষ-গরম আবহাওয়া মানব মনকে বিচলিত করে থাকে। বিশেষতঃ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের মত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোকদের জন্য এই এক মহা পরীক্ষার মত। এই রুক্ষ আবহাওয়া মন-মেজাজকেও তিরিক্ষি ও গরম করে তুলে। এমন বিরুদ্ধ পরিস্থিতে প্রবল ধৈর্যই সম্মানিত হাজ্বী সাহেবানদের পবিত্র হারমাইন শরীফাইন মক্কা-মদীনা শরীফে আদব রক্ষা করে চলতে এবং ইবাদত কার্য সমূহ সম্পাদন করতে সাহায্য করবে।

খেয়াল রাখবেন এই পবিত্র জায়গা সমূহে আদব রক্ষা করা কিন্তু ফরয। অধৈর্যের বেশী ইবাদতের চেয়ে ধৈর্যের চুপচাপ অবস্থান অনেক সওয়াব জনক। মন্দ-খরাপ আচরণ তো দূরের কথা!!!?

এমন একজন ব্যক্তির কল্পনা করুন- যিনি ভয়ে জড়োসড়, ক্ষিধেয় পাগল প্রায়, সাথে কানা-কড়িও নেই, সাথে কোন খাবারও নেই বা যা ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে বা চুরি হয়ে গেছে, আর মৃত্যু তার দ্বারে কড়া নাড়ছে; এমতাবস্থায় ঐ লোক কী করবেন? আল্লাহর ইচ্ছার উপর ধৈর্য ধারণ করবেন? না আল্লাহর বিরুদ্ধাচারণ করবেন? এই বিরূপ-প্রতিকুল অবস্থায় ধৈর্যধারণকারীদের জন্যই আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জাত কিন্তু জান্নাত, দয়া, রহমত ও সৎপথের শুভসংবাদ দিয়েছেন। যেমন সূরা বাক্বারার ১৫৫-১৫৭ নং আয়াতে বর্ণনা করেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ، الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ، أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

অর্থাৎ: “আর আমি অবশ্যই তোমাদের কিছু বিষয়ে- ভয়, ক্ষিধে, সম্পদের ক্ষতি, প্রাণের ক্ষতি এবং ফসলের ক্ষতির দ্বারা পরীক্ষা করবো; আর (হে হাবীব (ﷺ)! যারা এ কঠিন মূহুর্তে ধৈর্যসহকারে সহ্য করবে) আপনি সেই ধৈর্যশীলদের শুভসংবাদ দিন। যারা যখনই কোন বিপদে পতিত হয়, তারা বলে- নিশ্চয়ই আমারা আল্লাহরই, আর তার দিকেই আমারা প্রত্যাবর্তনকারী। ঐ সকল ব্যক্তি যাদের উপর আল্লাহর দয়া, রহমত বর্ষিত; আর তারাই সৎপথ প্রাপ্ত”। সম্মানিত হাজ্বীগণ! হজ্বে এমন বিরূপ পরিস্থিতি কিন্তু হরহামেশাই সৃষ্টি হতে পারে। সর্বাবস্থায় ধৈর্যই আপনার একমাত্র পরম সঙ্গী। আর এই সঙ্গীই আপনাকে উভয় জগতে সফলকাম করবে।

 

হজ্বের ভ্রমণে আল্লাহর উপর ভরসা:

হজ্বের সফরে আল্লাহ তা‘য়ালার উপর পরিপূর্ণ ভরসা ও প্রবল ধৈর্য আপনাকে ইসলামের এই মহান ফরয কর্মকে সূচারুরূপে আদায় করতে সাহায্য করবে। একটু কষ্ট, একটু পিপাসা অনেক নিয়ামত দিতে পারে একসাথে। উভয় জগতে অঢেল কল্যাণ আর পুরস্কারের যোগ্য করতে পারে আপনাকে। যেমন, এক হজ্বের সফরে হযরত হাসান বাসরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাথে কিছু আলিম-ওলামা ও বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ জন সঙ্গী হলেন। পথিমধ্যে খাবার পানি শেষ হয়ে গেল। পাশেই ছিল এক কূফ। সবাই যখন ঐ কূপ হতে পানি আনতে গেলেন; দেখলেন পানি একবারে তলায় চলে গেছে কিন্তু কোন দঁড়ি-বালতি নেই। সবাই এসে হযরত হাসান বাসরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কে জানালেন। তিনি বলেন, যখন আমি নামাজে দাঁড়াব, তখন তোমরা কূপের নিকট গিয়ে পানি সংগ্রহ করিও। হযরত হাসান বাসরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নামাজে দাঁড়াতেই পানি কূপ হতে বের হয়ে আসলেন এবং সকল হাজ্বী সাহেবান ইচ্ছেমত পানি পান করলেন। তন্মধ্যে একজন এক পাত্র পানি ভরে নিলে, তৎক্ষণাৎ পানি আবার নিচে চলে যায়। এই ঘটনা জানার পর হযরত হাসান বাসরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তোমাদের আল্লাহর উপর হতে ভরাসা উঠে গেছে বিধায় এরূপ ঘটেছে। পুনরায় চললেন ক্বাবার পথে। কিছু দূর গিয়ে ঐ সঙ্গী সবাইকে রাস্তা হতে অল্প খেজুর সংগ্রহ করে খেতে দিলেন। তারা খাওয়ার পর দেখলেন বীচিগুলো জ্বল জ্বল করছে। ঠিক যেন স্বর্ণের কণা। তার এগুলো সংরক্ষণ করলেন আর মদীনা শরীফে গিয়ে জহুরীকে দেখালে; জহুরী এগুলোকে খাঁটি সোনা বলে রায় দেন এবং উচিত মূল্যে ক্রয় করে নেন। বিক্রয় মূল্য দ্বারা অভাবীদের অভাব দূর হলো আর অন্যদের অতিরিক্ত কিছু পাথেয় হলো। (তাযকিরাতুল আউলিয়া কৃত শেখ ফরিদুদ্দীন আত্তার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)

দেখুন! তাওয়াক্কুল এর ফলাফল। আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে ধৈর্যের সাথে আল্লাহ নির্ভরতা সকল বিপদ হতে আপনাকে উত্তরণ ঘটাবে এবং আপনার ধারণা-কামনাতীত বিনিময় প্রদান করবে।

 

হজ্ব হলো সবরের পাঠশালা:

পবিত্র হজ্ব ধৈর্য শিক্ষার বিদ্যালয় আর হজ্ব পরবর্তী হাজ্বীর জীবন হলো- ঐ হজ্ব পাঠশালার শিক্ষাকে আপন-পর জীবনে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্র বা পরীক্ষার হল। হজ্ব পরবর্তী হাজ্বীর জীবনাচার বলে দেবে তার হজ্ব মাকবুল কি না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআন পাকের সূরা বাক্বারার ১৯৭ নং আয়াতে বলেছেন,

“হজের রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মাস। সুতরাং যাদের উপর (হজ্বের মাস সমূহের মধ্যে) হজ্ব ফরজ হয়, তারা যেন (হজ্বের মধ্যে) যৌন সম্ভোগ, কোন প্রকারের অশ্লীল ও মন্দ কথা এবং ঝগড়া-ঝাটি না করে”।

হজ্বের অনেক বড় শিক্ষা হলো সবরের শিক্ষা। হজ্বে খুব বেশি প্রয়োজন হয় সবরের। যেহেতু হজ্বের সফর দীর্ঘ হয়ে থাকে এবং হজ্বের অনেক সফরে এমন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় যা অন্তরে ক্রোধের জন্ম দেয়। তাই সবর বা ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। সবরের মাধ্যমে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। বর্ণিত আয়াতে বিশেষভাবে আল্লাহ তা‘য়ালা ইহরাম অবস্থায় তিনটি নিষিদ্ধ বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন,
১. কোনো যৌন সম্ভোগে লিপ্ত হবে না (শুধু নাফসের সবর),
২. কোনো গুনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত হবে না (নফস ও কর্মের সবর) ও
৩. কারো সঙ্গে কোনো ঝগড়া-বিবাদ করবে না (শুধু কর্মে সবর)। তিনটি ক্ষেত্র হতেই পরিত্রাণের জন্য প্রচুর সবরের প্রয়োজন।

 

হজ্ব ধৈর্যের পুরস্কার:

এটা নিশ্চিত জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তা’য়ালা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে মহা পরীক্ষায় বিশাল ধৈর্যের পুরস্কার স্বরূপ পবিত্র হজ্ব দান করেছেন। এই মহা পরীক্ষা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কর্ম, আপন প্রিয় পুত্র সন্তানের কুরবানী। যেমন, পবিত্র কুরআনের সূরা সাফ্ফাতের ৯৯-১০২ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে,

وَقَالَ إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِينِ، رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ، فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ، فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ– –

অর্থাৎ: “আর তিনি (ইবরাহীম আলাই হিস সালাম) বলেন, নিশ্চয় আমি আমার প্রতিপালকের দিকে গমনকারী আর তিনি আমাকে শীঘ্রই পথ দেখাবেন। হে প্রভু! আমাকে সৎ সন্তান দান করুন। আর (তাঁর প্রভূ) তাঁকে এক ধৈর্যশীল সন্তানের শুভ সংবাদ দিলেন। আর যখনই (ঐ সন্তান) তাঁর সাথে ভ্রমণ করার উপযোগী বয়সে পৌঁছলেন; তিনি বলেন, হে প্রিয় সন্তান! আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, ‘আমি তোমাকে (আল্লাহর তরে) যবে করছি’; এবিষয়ে তোমার অভিমত কী? (ঐ ধৈর্যশীল সন্তান) বলেন, হে সম্মানিত পিতা! আপনি তাই করুন, যা আপনাকে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছায় আমাকে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত পাবেন”।

বাহ! পিতা-পুত্রের কী অপূর্ব ত্যাগ এবং খোদায়ী নির্দেশনার উপর কী ধৈর্য!! পিতা-পুত্রের এই মহা ধৈর্যের পরীক্ষায় পাশের পরইতো আল্লাহর পক্ষ হতে পবিত্র বায়তুল্লাহর হজ্জ্বের নির্দেশনা আসে। যেমন, সূরা হজ্জ্বের ২৭-২৮ নং আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে,

وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ، وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ –

“আর (হে হাবীব (ﷺ)!) আপনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করুন, যখন আমি ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কারো অংশীদার করবে না, আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ক্বিয়াম, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর। আর মানুষের মাঝে হজ্বের ঘোষণা প্রচার কর। তারা পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উঠের পিঠে চড়ে দূর-দূরান্ত হতে তোমার নিকট আসবে”।

 

কঠিন মুহুর্তে ধৈর্যের ফল:

জীবনের কঠিন মুহুর্তেও যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে পারে তার জন্য আল্লাহর হাবীব (ﷺ) এর পক্ষ হতে বিশাল পুরস্কার রয়েছে। যেমন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

“রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আমি বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি জীবনের কঠিন ও দরিদ্রাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সুপারিশকারী বা সাক্ষীদাতা হবো’। (মুসলিম শরীফ, হাদিস নং- ৫৮৬০; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং- ৬৪৪০।)

 

ধৈর্যের পরীক্ষা ঈমানদারের হয়:

বিশ্ব নবি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পার্থিব জগতে মু’মিনদের অবস্থার একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। তিনি বলেন,

‘একজন মু’মিনের উদাহরণ একটি শস্যের মত, থেকে থেকে বাতাস তাকে দোল দেয়। তদ্রুপ একের পর এক মুসিবত অবিরাম অস্থির করে রাখে মু’মিনকে। পক্ষান্তরে একজন মুনাফিকের উদাহরণ একটি দেবদারু বৃক্ষের ন্যায়, দোলে না, কাত হয়েও পড়ে না, যাবৎ-না শিকড় থেকে সমূলে উপড়ে ফেলা হয় তাকে’। (মুসলিম শরীফ, হাদিস নং- ৫০২৪।)

সম্মানিত পাঠক! বাংলা প্রবাদে আছে, ‘সবরে মেওয়া ফলে’ এই কথাটিই বিখ্যাত দার্শনিক মলিয়ারের ভাষায় ফুটে উটেছে। তিনি বলেন,

‘Trees that are slow to grow bear the best fruit.
যে বৃক্ষের বৃদ্ধি ধীরে ধীরে হয়, সেই বৃক্ষের ফল কিন্তু খুব ভাল হয়।

এ পার্থিব জগৎ দুঃখ-বেদনা, দুর্যোগ-দুর্ঘটনা, সংহার ও জীবন নাশকতায় পরিপূর্ণ। এক সময় সুস্থ, সচ্ছল, নিরাপদ জীবন। আরেক সময় অসুস্থ, অভাবী ও অনিরাপদ জীবন। মুহূর্তে জীবনের পট পাল্টে যায়। কারণ এ দুনিয়ায় নিয়ামত-মুসিবত, হর্ষ-বিষাদ, হতাশা-প্রত্যাশা সব কিছুর অবস্থান পাশাপাশি। ফলে কোন এক অবস্থার স্থিরতা অসম্ভব। পরিচ্ছন্নতার অনুচর পঙ্কিলতা, সুখের সঙ্গী দুঃখ।

এ জন্যেই বিখ্যাত সুফী মরমী কবি শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তার (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন,

تا شوی در روز گار از صابراں * غم مکن از ديدن سختی گراں-
ধরার মাঝে সবরকারী হতে হলে ভাই, দুঃখে চিন্তা ছেড়ে চলুন ধৈর্য পথে যাই।

হর্ষ-উৎফুল্ল ব্যক্তির ক্রন্দন করা, সচ্ছল ব্যক্তির অভাবগ্রস্ত হওয়া এবং সুখী ব্যক্তির দুঃখিত হওয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। এ হলো দুনিয়া ও তার অবস্থা। প্রকৃত মু’মিনের এতে ধৈর্যধারণ বৈ উপায় নেই। বরং এতেই রয়েছে দুনিয়ার উত্থান-পতনের নিরাময় তথা উত্তম প্রতিষেধক। বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল বলেন,

“Patience is bitter, but its fruit is sweet.”
‘ধৈর্য যদিও আঘাত দেয়, ফলটা কিন্তু খুব মিষ্টি দেয়’।

ইংরেজি প্রবাদে আছে,

“Patience is a virtue, Virtue is a grace;
Both put together- make a very pretty face.”
‘ধৈর্য একটি গুণ, গুণ হলো দয়া; দু’টি মিলে একসাথে মুখে আনে মায়া’।

সম্মানিত হাজ্বী সাহেবানের পবিত্র হজ্ব পালনের সময় তাদের অবয়বে সেই ময়াময় চেহেরাই দেখতে ফুটে উঠুক এই কামনাই রইল। করুণাময় আল্লাহ আমাদের সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করার এবং ধৈর্যশীলদের পথে থাকার তাওফীক নসীব করুন। আমীন! বিহুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরসালীনা (ﷺ)।

Check Also

কোরবানীর জরুরী মাসায়েল

আল্লামা মুহাম্মদ সিরাজুম্মুনীর শোয়াইব পবিত্র ঈদুল আজহাকে সাধারণতঃ কোরবানীর ঈদ বলা হয়। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *