সৎ লোকদের সান্নিধ্য

শায়খ আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী
সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ.
আত্মশুদ্ধি বা ‘তাযকিয়া’ অর্জন করা অতীব জরুরী। যেমন শরীর অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হই ঠিক তদ্রুপ অন্তরের রোগ সমুহ, যেমন- ক্রোধ, লোভ-লালসা, মোহ, হিংসা-দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, অহংকার প্রভৃতির চিকিৎসার জন্যও একজন রুহানী ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যার সান্নিধ্য দ্বারা এই রোগ সমুহের সু-চিকিৎসা সম্ভব, অন্যথায় রুহানী রোগে আক্রান্ত হয়ে বিপদগামী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী।
মহান রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (آل عمران-১৬৪৫)
“মু’মিনগণের প্রতি আল্লাহর ইহসান যে, তাদের মধ্য হতে তাদের জন্য একজন রসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদেরকে আল্লাহ পাকের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে শুনাবেন, তাযকিয়া (পরিশুদ্ধ) করবেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন। যদিও তারা পূর্বে হেদায়েত প্রাপ্ত ছিল না।”(সূরা আল- ইমরান/১৬৪। অনুরূপ সূরা বাকারা ২৯, ১৫১, সূরা জুমুয়া ২নং)
একমাত্র আত্বশুদ্ধির মাধ্যমেই চারিত্রের উন্নয়ন এবং দূর্নীতি, অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কারের সয়লাব হতে বাঁচানো সম্ভব। আর এই আত্বশুদ্ধি অর্জন করতে হলে অবশ্যই কোন না কোন নেক ছোহবতের সংস্পর্শে যেতে হবে। পবিত্র কোরানেও আল্লাহ পাক এ ব্যাপারে আদেশ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِين [التوبة: ১১৯.
“হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।” (সূরা তওবা, আয়াত ১১৯) আল্লাহ তা’লা আরও ইরশাদ করেন:
وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ] سورة لقمان – الآية ১৫[
“আমার দিকে যে ব্যক্তি রুজু প্রত্যাবর্তন করেছে তোমরা তার পুর্নাঙ্গ অনুসরণ কর। (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৫) আল্লাহ তা’লা আরও ইরশাদ করেছেন:
﴿ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ ]سورة المائدة-৩৫ [
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁকে পাওয়ার জন্য ওসীলাহ্ (মাধ্যম) তালাশ কর।(সুরা মায়িদা, আয়াত-৩৫)
♦ ছোহবতের অর্থ ও প্রকার:
আর ছোহবত অর্থ ‘সংশ্রব’। সাধারনতঃ ছোহবত ২ শ্রেণীর হয়-
(১) নেক ছোহবত বা সৎ সংশ্রব
(২) বদ ছোহবত বা অসৎ সংশ্রব।
নেক ছোহবত বলতে হক্কানী উলামা-মাশায়েখ, দ্বীনদার শ্রেণীর লোকদেরকে বুঝায় এবং বদ ছোহবত দ্বারা অসৎ লোক, বাতিল ফেরকা, এক শ্রেণীর ধর্ম-ব্যবসায়ী, ভন্ড পীর ও মূর্খ-জাহেল প্রকৃতির লোকদেরকে বুঝায়।একজন মু’মিন দিনে কমপক্ষে ৪৮ রাকাত নামাযে ৪৮ বার সুরা ফাতেহায় আল্লাহর কাছে চায়:
اهدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ. صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ
“আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত কর, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গযব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।” ( সুরা ফাতেহা :৬ -৭)
নিয়ামত প্রাপ্তরা কারা? আর এ নিয়ামত প্রাপ্তগণ হচ্ছেন- নবী, ছিদ্দীক, শহীদ, ছলেহীন। আল্লাহ তা’লা ইরশাদ করেছেন:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ ۚ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا
“আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন সে তাঁদের সঙ্গী হবে। আর তাঁরা হলেন- নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হল উত্তম।” (সুরা নিসা : ৬৯)
এ আয়াতটি নাযিল হবার কারণ হিসেবে মুফাসসিরগন বলেন, এটি হযরত সাওবানের প্রসঙ্গে নাযিল হয়, আর ঘঠনাটি হলো নিম্মরূপ:
قَالَ الْكَلْبِيُّ: نَزَلَتْ فِي ثَوْبَانَ مَوْلَى رسول اللَّه صلى اللَّه عليه وسلم، وَكَانَ شَدِيدَ الْحُبِّ لَهُ، قَلِيلَ الصَّبْرِ عَنْهُ، فَأَتَاهُ ذَاتَ يَوْمٍ وَقَدْ تَغَيَّرَ لَوْنُهُ وَنَحِلَ جِسْمُهُ، يُعْرَفُ فِي وَجْهِهِ الْحُزْنُ، فَقَالَ لَهُ. رَسُولُ اللَّهِ: يَا ثَوْبَانُ، مَا غَيَّرَ لَوْنَكَ؟ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا بِي مِنْ ضُرٍّ وَلَا وَجَعٍ، غَيْرَ أَنِّي إِذَا لَمْ أَرَكَ اشْتَقْتُ إِلَيْكَ، وَاسْتَوْحَشْتُ وَحْشَةً شَدِيدَةً حَتَّى أَلْقَاكَ، ثُمَّ ذَكَرْتُ الْآخِرَةَ وَأَخَافُ أَنْ لَا أَرَاكَ هُنَاكَ، لِأَنِّي أَعْرِفُ أَنَّكَ تُرْفَعُ مَعَ النَّبِيِّينَ، وَأَنِّي إِنْ دَخَلْتُ الْجَنَّةَ كُنْتُ فِي مَنْزِلَةٍ أَدْنَى مِنْ مَنْزِلَتِكَ، وَإِنْ لَمْ أَدْخُلِ الْجَنَّةَ فَذَاكَ أَحْرَى أن لا أراك أَبَدًا. فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى هَذِهِ الْآيَةَ. ( ১)
“নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একজন সাহাবী এসে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! বাড়ীতে নিজ পরিবারের কাছে থাকা অবস্থায় যখন আপনার কথা মনে পড়ে, তখন ধৈর্য ধারণ করতে পারি না। আপনাকে দেখার জন্য চলে আসি। যখন আমার মৃত্যুর কথা স্মরণ হয় এবং আপনার কথা মনে পড়ে, তখন ভাবি যে, আপনি তো জান্নাতে নবীদের সাথে চলে যাবেন। আর আমার আশঙ্কা হচ্ছে, আমি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবো, তখন তো আপনাকে দেখতে পাবো না। (তখন আপনাকে না দেখার কষ্ট আমি কিভাবে সহ্য করবো?) তাঁর এই পশ্নের জবাবে উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।(২ )
জনৈক সাহাবী নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেনঃ
عَنْ ثَابِتٍ ، عَنْ أَنَسٍ ، أَنَّ رَجُلا قَالَ ” يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى السَّاعَةُ ؟ قَالَ: وَمَا أَعْدَدْتَ لَهَا ؟ قَالَ: لا، إِلا أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ . قَالَ: فَإِنَّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ “قَالَ أَنَسٌ: فَمَا فَرِحْنَا بِشَيْءٍ بَعْدَ الإِسْلامِ فَرَحَنَا بِقَوْلِ رَسُولِ اللَّهِ: “إِنَّكَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ”. قَالَ أَنَسٌ: فَأَنَا أُحِبُّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ مَعَهُمْ بِحُبِّي إِيَّاهُمْ وَإِنْ كُنْتُ لا أَعْمَلُ بِأَعْمَالِهِمْ . (৩ )
“একদা এক ব্যক্তি(সাহাবী) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেয়ামত কবে হবে? নবীজী প্রশ্ন করলেন: কেয়ামতের জন্যে কী প্রস্তুতি নিয়েছ? সাহাবী বলেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি, নবীজী বললেন: তুমি যাকে ভালোবাস, তার সাথেই থাকবে! হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথায় আমরা এতটা আনন্দিত হয়েছি যে, ইসলাম গ্রহণের পর অন্য কোন কারণে আর এতটা আনন্দিত হইনি। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি আল্লাহকে ভালোবাসি, ভালোবাসি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ও হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকেও। আমার আমল যদিও তাঁদের সমতূল্য নয় তবুও আমি আশাবাদী, আমি পরকালে তাঁদের সঙ্গেই থাকবো! (৪ )
উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে এ কথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, দুনিয়াতে যে মানুষ যাকে ভালবাসবে, কিয়ামতের দিন সে তার সাথেই থাকবে, তার সাথেই তার হাশর হবে, সে জান্নাতী হলে সেও জান্নাতী হবে, জাহান্নামে গেলে সেও জাহান্নামে যাবে। সুতরাং কাউকে বন্ধু ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তার সাথে ভালবাসার বন্ধন রচনা করার আগে একজন মুসলিমকে ভালভাবে চিন্তা করতে হবে, যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে, সে কাকে ভালবাসবে? আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطاً ]الكهف[ ২৮ .
আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যাঁরা সকাল-সন্ধ্যা নিজেদের রবকে ডাকে তাঁর সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য।” (সূরা কাহাফ- আয়াত ২৮)
হযরাত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সমস্ত উম্মতের মধ্যে অর্থাৎ হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের পর সবচেযয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। তাঁদের এ ফযীলতের উৎসই হচ্ছে আল্লাহ পাকের হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ছোহবত।
একথা সুস্পষ্ট যে, সোহবতের প্রভাব সত্বর বিস্তার করে থাকে। সৎ হোক বা অসৎ হোক তার যথাযথ প্রভাব রয়েছে। তাই কোন ফার্সী কবি বলেছেন,
صحبت صالح ترا صالح كند صحبت طالح ترا طالح كند
“ছোহবতে ছালেহ তুরা ছালেহ কুনন্দ, ছোহবতে ত্বালেহ তুরা ত্বালেহ কুনন্দ” অর্থাৎ (তোমাকে ভালো সংশ্রব ভালো করবে এবং খারাপ সংশ্রব খারাপ করবে)।
ভালো মন্দের উপমা দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا مَثَلُ الجَلِيسِ الصَّالحِ والجَلِيسِ السّوءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِير، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إمَّا أنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الكِيرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً (৫ )
“সৎ লোকের সংশ্রব ও অসৎ লোকের সংশ্রব যথাক্রমে কস্তুরি বিক্রেতা ও কর্মকারের ভাট্টিতে ফুঁক দেয়ার মতো। কস্তুরি বিক্রেতা হয়তো তোমাকে এমনিতেই কিছু দান করবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে কিছু কস্তুরি ক্রয় করবে। আর অন্ততঃ পরে কিছু না হলেও তার সু-ঘ্রাণ তোমার অন্তর ও মস্তিস্ককে সঞ্জীবিত করবে। পক্ষান্তরে ভাট্টিতে ফুঁক দানকারী তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে। আর কিছু না হলেও তার দুর্গন্ধ তুমি পাবে। (৬ )
উক্ত হাদীস শরীফ নিয়ে গবেষণা করলে একথা সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, ভালো বা নেককার লোকদের সোহবতে থাকলে ঈমান-আমল সব ঠিক থাকবে, পক্ষান্তরে বদ সোহবত দ্বারা ঈমান-আমল ধ্বংস হয়ে যায়।
যেমন আল্লামা জালালুদ্দিন রুমী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত মসনবী শরীফে বলেছেনঃ “হে ভাই খারাপ বন্ধু হতে দুরে থেকো, কেননা খারাপ বন্ধু বিষাক্ত সর্প হতেও ভয়ঙ্কর। বিষাক্ত সর্প দংশনে শুধু মাত্র তোমার প্রাণ হরণ হবে, কিন্তু একজন খারাপ বন্ধু তোমার ঈমানকে ধ্বংস করবে।”
এদ্বারা বুঝা যায়, আমাদের উঠা-বসা যদি খারাপ বা বাতিল ফেরকার লোকদের সাথে হয় তাহলে আমাদের ঈমান-আমল এমনকি আক্বায়েদ ধ্বংস হওয়ার সম্ভবনা আছে। এ ব্যাপারে সুফী সম্রাট আল্লামা জালালুদ্দিন রুমী রাহমাতুল্লাহ সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, “পৃথিবীতে বহু মানবরূপী শয়তান আছে, তাই সাবধান যে কারো হাতে বায়াত হবেনা”। ইমামে আ’যম হযরত আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি ছোহবতের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
لولا السنتان لهلك النعمان( ৭)
“আমি যদি দু’বছর না পেতাম, তাহলে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেতাম।”( ৮)
ইমামে আ’যম, আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি সে দু’বছরের কথা উল্লেখ করেছেন, যে দু’বছর তিনি হযরত ইমাম জাফর সাদিক্ব রহমতুল্লাহি আলাইহির ছোহবত হাছিল করেন। তিনি আরো বলেনঃ “ইলমে শরীয়ত বাহিরের দিককে পরিশুদ্ধ করে। আর ইলমে তাসাউফ ভিতরের দিককে পবিত্র করে”।
তাই মওলানা রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:
یک زمانہ صحبت با اولیا بہتر از صد سالہ طاعت بے ریا
“আল্লাহর ওলীর সাথে এক মুহুর্তের সান্নিধ্য লাভ করা শত বৎসরের এবাদতের চাইতে উত্তম”। তিনি আরও বলেন, “ওলিগণ আল্লাহর নিকট হতে এমন ক্ষমতা লাভ করেন যে তাঁরা নিক্ষিপ্ত তীরকে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন”। তিনি আরও বলেছেন, “যারা ওলী আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকবে তারা খোদার রহমত লাভের পথ থেকে দূরে সরে পড়বে”।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত মুফাচ্ছির, দার্শনিক ও বিখ্যাত আলেম। তাঁর মৃত্যুর বিছানায় শয়নকালীন সময়ে শয়তান এসে তাকে জিজ্ঞাস করল, ‘আল্লাহ’ যে এক তার প্রমাণ কি? তখন তিনি আল্লাহর একত্ববাদের উপর শয়তানের মোকাবেলায় মোট ৩৬০টি দলিল উপস্থাপন করলেন, শয়তানের কাছে তার সব দলিলই হেরে গেল। আর একটি দলিমাত্র বাকী। শয়তান যদি এটাকেও হারিয়ে দিতে পারে, তাহলে ইমাম রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহির মত আলেমকে ইহজগত থেকে ঈমান হারা হয়ে বিদায় নিতে হবে। এদিকে তার পীর হযরত নজমুদ্দীন কোবরা রহমতুল্লাহি আলাইহি সে সময় নামাযের জন্য ওযু করছিলেন। পরিশেষে ইমাম রাযীর এ দুরবস্তা দেখে তাঁর নিকট জালালীয়াত এসে গেল। তখন তিনি ওযু রত ছিলেন, এতাবস্থায় তিনি ওযুর বদনা শয়তানের দিকে নিক্ষেপ করে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, হে ইমাম রাযী! তুমি শয়তানকে বলে দাও, আমি অন্তর দিয়ে আল্লাহকে এক স্বীকার করছি। আমার নিকট দলিলের কোন প্রয়োজন নেই। “বিনা দলিলে আল্লাহ্ এক”। আল্লাহর অলীর ক্ষমতার মাধ্যমে, নিক্ষিপ্ত ঐ বদনা তাঁর আস্তানা থেকে কয়েক’শ মাইল দূরে ইমাম রাযীর মৃত্যু শয্যায় তাঁর মাথার পাশে গিয়ে পড়ল। তিনি স্বীয় মোর্শেদের সেই আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং বলিষ্ঠ কন্ঠে বলে দিলেন, “বিনা দলিলে আল্লাহ এক।” আর কলেমা শরীফ পাঠ করতে করতে তিনি ইহজগত ত্যাগ করেন। (৯ )
বিশ্ববিখ্যাত ইমাম আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী রহমতুল্লাহি আলাইহির মৃত্যকালীন ঘটনার দিকে খেয়াল করলেও ছোহবত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সহজে অনুভব করা যায়। বিশুদ্ধ ঈমান ও সৎ জিন্দেগী গড়ে তুলতে আউলিয়ায়ে কেরামের ছোহবতে আসতে হবে।
নবীজীর প্রসিদ্ধ হাদীস: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে এসে আরয করলেন:
قِيلَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلُ يُحِبُّ الْقَوْمَ وَلَمَّا يَلْحَقْ بِهِمْ قَالَ الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ(১০ )
“হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কী বলেন, যে একটি গোষ্ঠীকে ভালোবাসে অথচ তাদের সমান নেক আমল করতে পারেনি! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন: যে যাকে ভালোবাসে তার হাশর হবে তারই সাথে।’ (১১ )
রোজ হাশরে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ দল বা বন্ধুদের সাথে উত্থিত হবে। তাই আল কোরআনে এ মর্মে হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে,
لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ [سورة آل عمران: ২৮
“মু’মিনগণ যেন মু’মিনদের ছাড়া কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে।” ]সুরা আল-ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াত[ আরো বলা হয়েছে,
﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي
الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে আউলিয়া (বন্ধু) হিসাবে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তাদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন রূপে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। -(সুরা মায়িদা,৫১)
আল্লাহ তায়ালা তার নিজের বন্ধুদের অভয় বাণী শুনিয়েছেন এভাবে –
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّـهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ﴿٦٢﴾ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ﴿٦٣﴾ لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّـهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿٦٤﴾
“জেনে রাখ! আল্লাহর ওলীদের কোন ভয় নাই এবং তাঁরা দুঃখিতও হবেন না (যাঁরা আল্লাহর ওলী) তাঁরা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল এবং খোদা ভীরু। তাঁদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালে, আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নেই, উহাই মহা সাফল্য”। (সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২৬৪-) ।
আল্লামা জালালউদ্দীন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বড় আলেম হওয়ার পরও তিনি হযরত শামছে তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে তরীকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মসনবী শরীফে উল্লেখ করেন:
مولوی ہرگز نہ باشد مولائے روم تا غلامِ شمس تبریزی نہ شد
“আমি নিজে নিজে মাওলানা রুমী হতে পারিনি, যতক্ষন পর্যন্ত না আমি শামছে তাবরিযী রহমতুল্লাহি আলাইহির গোলাম হয়েছি।
সুতরাং স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে আমাদেরকে সত্যিকার আওলিয়ায়ে কেরাম ও পীর-মুরশিদের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে হবে এবং প্রেম ও ভক্তির সাথে ওলী-বুজুর্গণের খেদমত ও ছোহবতে থেকে খোদার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফায়াত দ্বারা ধন্য হবার খোশ নসীব হবার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে। তবেই আমাদের পার্থিব ও পরকালীন জীবন সার্থক ও সুন্দর হবে। অন্যথায় আমরা গন্তব্যস্থলে কোনদিন পৌছুতে পারব না। [আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হিদায়াতের পথে অটল রাখুন-আমিন]
—————————————————-
১ – الجامع لأحكام القرآن سورة النساء قوله تعالى ومن يطع الله والرسول فأولئك مع الذين أنعم الله عليهم
২- দেখুন: ইবনে হিব্বান, তাবরানী, হাদীছ নং- ২৯৩৩)
৩- (رواه البخاري صحيح البخاري كتاب الأدب باب علامة حب الله عز وجل برقم (৭১৫৩, ৫৮১৯, ، ومسلم برقم ((৬৮৭৮ رواه مسلم (৪/২০৩২) رقم (২৬৩৯(.
৪- বুখারী, হা-৭১৫৩,৫৮১৯ ও মুসলিম, হা- ৬৮৭৮, ২৬৩৯
৫- أخرجه البخاري، باب المسك (৭/৯৬)، رقم: (৫৫৩৪)، ومسلم، كتاب البر والصلة والآداب، باب استحباب مجالسة الصالحين، ومجانبة قرناء السوء (৪/২০২৬)، رقم: (২৬২৮)ورواه أيضا الإمام أحمد في حديث أبي موسى الأشعري ورواه أبو داود في سننه كتاب الأدب، (باب من يؤمر أن يجالس) ورواه البخاري في كتاب البيوع، باب (في بيع العطار وبيع المسك) رواه مسلم في كتاب البر والصلة والآداب، باب (استحباب مجالسة الصالحين ومجانبة قرناء السوء)
৬ – বুখারী ৭/৯৬, হা-৫৫৩৪ ও মুসলিম ৪/২০২৬, হা-২৬২৮।
৭- قال الآلوسي في ” صب العذاب على من سب الأصحاب ” ( ص ১৫৭ – ১৫৮ ) كتاب التحفة الإثي عشرية فقد جاء في مختصرها للآلوسي ص ৮
৮- আলূসী: স্বব্বুল আযাব-১৫৭-১৫৮, তুহফা ইসনাই আশারিয়্যাহ: ০৮
৯- سير أعلام النبلاء للذهبي ২২/১১৩
১০- صحيح البخاري গ্ধ كتاب الأدب গ্ধ باب علامة حب الله عز وجل. رقم الحديث: ৫৮১৮
১১- বুখারী ১:৫৫৭, হা-৫৮১৮ মুসলিম ৪: ২০৩৪

Check Also

ইসলামে সেবার গুরুত্ব

অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান সেবা মানবতার ধর্ম, জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ সেবা গ্রহণ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *