সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > রোযা ও রমযান সংশ্লিষ্ট > রোজায় ডায়াবেটিক রোগী- কী করবেন, কী করবেন না

রোজায় ডায়াবেটিক রোগী- কী করবেন, কী করবেন না

ডায়বেটিস রোগটা এমনিতেই প্রাণঘাতী, তিল তিল করে ধ্বংস করে দেয় শরীরটা। সারা বিশ্বে রোজাদার ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। এই সিয়াম সাধনার মাসে রোজা রাখা নিয়ে তারাই সবচাইতে ঝামেলায় ভুগে থাকেন। যেমন- তাঁদের দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা ঠিক কি না, ইনসুলিন কিভাবে নেবেন বা গ্লুকোমিটার দিয়ে শর্করা মাপলে রোজা ভেঙে যাবে কি না ইত্যাদি। আসুন জানি, ডায়বেটিস রোগীর রোজা রাখার নানান দিক।
কাদের জন্য রোজা ঝুঁকিপূর্ণ?

চিকিৎসকরা কয়েক ধরনের ডায়াবেটিক রোগীর জন্য রোজা রাখা ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে বিবেচনা করে থাকেন। এঁরা হলেন- টাইপ ১ ডায়াবেটিক রোগী, ডায়াবেটিক গর্ভবতী ও দিনে তিন বা চারবার ইনসুলিন গ্রহণকারী। এ ছাড়া যাঁদের সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করা স্বল্পতা) বা মারাত্মক হাইপারগ্লাইসেমিয়া কোমা (রক্তে শর্করা আধিক্যজনিত অজ্ঞান হওয়া) হয়েছে, যাঁরা হাইপোগ্লাইসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন নন, ডায়াবেটিসের সঙ্গে যাঁদের কিডনি, যকৃৎ, হৃদযন্ত্রের জটিলতা আছে বা ডায়ালিসিস করছেন তাঁরাও অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন। ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় আরো পড়েন ইনসুলিন ও সালফোনিলইউরিয়া ওষুধ ব্যবহারকারীরা। বাকিরা সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করলে রোজা রেখেও ভালো থাকতে পারেন।
খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে মেনে চলুন এই টিপসগুলো-

রমজান মাসে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও খাবার সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। যেহেতু ডায়াবেটিক রোগীর সুনিয়ন্ত্রিত ও সঠিক সময়সূচির খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হয়, তাই তাঁদের এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের বেলায় লক্ষ করা দরকার-

-দৈনন্দিন ক্যালরির পরিমাপ আগের মতোই থাকবে, কেবল সময়সূচি বা খাদ্য উপাদান পরিবর্তিত হতে পারে।

-শেষ রাতে সেহরি খাওয়া আবশ্যক ও তা গ্রহণ করতে হবে যথাসম্ভব দেরি করে। সেহরিতে জটিল শর্করাসহ সব ধরনের উপাদান রাখতে হবে। কেননা এই খাবারই দিনভর শক্তি জোগাবে।

-ইফতারে একসঙ্গে প্রচুর খাবার না খেয়ে ধাপে ধাপে খেতে হবে। মিষ্টিজাতীয় ও ভাজাপোড়া তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন। যেমন- কাঁচা বা সিদ্ধ ছোলার সঙ্গে শসা টমেটোর সালাদ. চিঁড়া-টক দই, ঘুগনি বা চটপটি, স্যুপ, ফল ইত্যাদি। শরবতের বদলে ডাবের পানি বা লেবুপানি। একটি কি দুটি খেজুর খাওয়া যেতে পারে।

-ইফতার ও সেহরির মধ্যে নৈশভোজে রুটি বা অল্প ভাত খাওয়া যেতে পারে।

-রোজা রেখে দিনের বেলা বেশি ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম না করাই ভালো। সন্ধ্যার পর চাইলে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। তারাবির নামাজ নিয়মিত পড়লে অতিরিক্ত ব্যায়াম না করলেও চলবে।
সতর্ক থাকবেন যেসব বিষয়ে

-ডায়াবেটিক রোগীর এ সময় চার ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে- রক্তে হঠাৎ শর্করা স্বল্পতা বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া, রক্তে শর্করা আধিক্য বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া, কিটোনিউরিয়া বা প্রস্রাবের সঙ্গে কিটোন নির্গত হওয়া এবং পানিশূন্যতা।

-রোজা রেখে দিনের বেলা গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে শর্করা পরিমাপ করুন। আলেমরা মত দিয়েছেন, গ্লুকোমিটার দিয়ে শর্করা মাপলে রোজা ভাঙে না। ইফতারের এক ঘণ্টা আগে ও দুই ঘণ্টা পরে এবং মাঝেমধ্যে দুপুরে রক্তে শর্করা দেখুন। দিনের বেলা কখনো রক্তে শর্করা চার মিলিমোলের কম বা ১৬.৭ মিলিমোলের বেশি হয়ে গেলে রোজা ভাঙতে হবে।

-সন্ধ্যার পর একসঙ্গে অনেক খাবার ও সহজ শর্করা বা চিনি-মিষ্টি জাতীয় খাবার খাবেন না। এতে হঠাৎ করে শর্করা বেড়ে যেতে পারে।

-পানিশূন্যতা এড়াতে সন্ধ্যার পর বেশি করে পানি, ডাবের পানি, জলীয় অংশ বেশি এমন খাবার গ্রহণ করুন।

-রমজানে ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ও সময়সূচি সম্পর্কে রোজার আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

-রোজায় ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ও সময়সূচিতেও পরিবর্তন আসবে। নতুন খাদ্যসূচির সঙ্গে মিলিয়ে এই পরিবর্তন করা হয়।

-যাঁরা মেটফরমিন, গ্লিনাইড, ডিপিপি গোত্রের ওষুধ খান, তাঁদের তেমন কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কেবল ওষুধের সময়টাকে পাল্টে নিন।

-যাঁরা সালফোনিল ইউরিয়া গোত্রের ওষুধ, যেমন- গ্লিক্লাজাইড, গ্লিবেনক্লেমাইড, গ্লিমেপেরোইড ইত্যাদি ওষুধ খান তাঁরা সকালের ডোজ পূর্ণমাত্রায় ইফতারে এবং রাতের ডোজ অর্ধেক মাত্রায় শেষ রাতে গ্রহণ করতে পারেন।

-যাঁরা দুবেলা ইনসুলিন নেন, তাঁরাও সকালের ডোজ পূর্ণমাত্রায় ইফতারে এবং রাতের ডোজ অর্ধেক মাত্রায় সেহরিতে গ্রহণ করতে পারেন।

-যাঁরা আধুনিক বেসাল-বোলাস ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাঁরা বেসাল বা দীর্ঘ সময় কার্যকরী ইনসুলিন আগের মাত্রায় আগের সময়ে (যেমন রাত ১০টায়) গ্রহণ করবেন। আর বোলাস বা দ্রুত কার্যকরী ইনসুলিন গ্রহণ করবেন ইফতারে, নৈশভোজে ও অর্ধেক মাত্রায় সেহরিতে। নৈশভোজ গ্রহণ না করলে ওই সময় ইনসুলিন না নিলেও চলবে।

-চিরায়ত বা কনভেনশনাল ইনসুলিনের তুলনায় আধুনিক অ্যানালগ ইনসুলিন যেমন- ডেটেমির, ডেগলুডেক, গ্লারজিন, লিসপ্রো, অ্যাসপার্ট বা গ্লুলাইসিন জাতীয় ইনসুলিনে শর্করা স্বল্পতা হওয়ার ঝুঁকি কম। তাই সম্ভব হলে পুরনো ইনসুলিন পাল্টে আধুনিক ইনসুলিন গ্রহণ করুন।

-ওষুধের মাত্রার এই পরিবর্তন অনেকটাই রক্তে শর্করার পরিমাণ ওঠা-নামার ওপর নির্ভর করবে। তাই রক্তে শর্করা পরিমাপ করুন ও চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।

 

 

Check Also

রোজা সংযম শিক্ষক

আরবি হিজরির নবম মাস রমজান। ঈমাম বাগাভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মতে রমজান শব্দটি আরবি রমদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *