সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > রোযা ও রমযান সংশ্লিষ্ট > রমজানের দর্শন

রমজানের দর্শন

আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ বখতিয়ার উদ্দীন

রহমতের মাস রমজান, পাহাড়সম পাপ মার্জনার মাস মাহে রমজান। দোযখের ভীষণ আযাব হতে মুক্তির মাস মাহে রমজান। পবিত্র কোরআন নাযিলের মাস মাহে রমজান। হেদায়তের মাস মাহে রমজান। আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান। সর্বোপরি ইবাদত, তাক্ওয়া, পরহেজগারী অর্জনের মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের মাস মাহে রমজান।

আল্লাহ্ পাক রব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন- “রমজান মাস যাতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যের পার্থক্যকারীরূপে পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে এবং পীড়িত থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করতে হবে।

পবিত্র হাদীসে বর্ণিত, রমজান মাস আসার সাথে সাথে বেহেশ্তের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে গ্রেফতার করা হয়। একদা  হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্ তায়ালার নিকট আরজ করলেন হে মাবূদ! আপনি উম্মতে মুহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জন্য ফজিলতের মাস হিসেবে কোন্ মাস নির্ধারিত করেছেন? আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন- আমি তাদের জন্য রমজান দান করেছি। হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম আরজ করলেন, মাবূদ! রমজান মাসের ফজিলতের কিরূপ। আল্লাহ্ বললেন, সমগ্র সৃষ্টি জগতের উপর আমার যেরূপ শ্রেষ্ঠত্ব, রমজান মাসেরও তদ্রুপ অন্যান্য মাসের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব বিদ্যমান।

এ মাসে যে রোযা রাখবে আমি তাকে সমগ্র জ্বিন ইন্সান ও যাবতীয় পশু-পাখীর ইবাদতের সাওয়াবের তুল্য সাওয়াব দান করব। এ কথা শুনে হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম বললেন- মাবূদ! আমাকেও উম্মতে মুহাম্মদীতে শামিল করলে কতইনা ভাল হত?

অন্য হাদীসে রয়েছে- যখন রমজান মাস আগমন করে তখন খুশী এবং স্বচ্ছলতা আগমন করে। হযরত আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আন্হু হতে বর্ণিত, রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন রমজানের প্রথম রাত্রি আগমন করে আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় মাখলূকের দিকে দৃষ্টিপাত করেন।

  • বিশেষ নেয়ামত প্রাপ্তির মাস রমজানঃ

‘রমজান’ শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাফসীর বেত্তাগণ বলেন ‘রমজান’ শব্দটির মধ্যে আরবী পাঁচটি অক্ষর রয়েছে। ঐ পাঁচটি অক্ষর রব্বুল আলামীনের পাঁচটি বড় বড় গুণ ও নেয়ামতের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেমন-

প্রথমত: ‘রা’ অক্ষরটি আল্লাহর রহমত এর প্রতি ইঙ্গিত করছে। ‘মীম’ হরফটি আল্লাহর মুহাব্বত এর প্রতি, ‘দোয়াদ’ আল্লাহর জেমান (জামিন হওয়া) এর প্রতি ‘আলিফ’ আমান বা নিরাপত্তার প্রতি এবং সর্বশেষ ‘নূন’ শব্দটি আল্লাহর নূরানী তাজাল্লীর প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত পূর্বক বান্দাহ্কে উপরোক্ত নেয়ামতরাশি হাসিলের জন্য দিক নির্দেশনা দিচ্ছে।

অধিকন্তু রমজান মাসে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি ইবাদত রয়েছে। যেমন- রোযা, তারাভীহ’র নামায, কোরআন তিলাওয়াত, ই‘তিকাফ এবং লাইলাতুল কদর। যারা মুহাব্বতের সাথে উল্লিখিত পাঁচ প্রকারের ইবাদতে আঞ্জাম দেবে, আল্লাহ্ পাক তাদেরকে বিশেষ দয়াপরবশ হয়ে উক্ত পাঁচটি নেয়ামত দানে ধন্য করবেন।

সর্বোপরি যারা রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা পূর্বক যাবতীয় ইবাদতে মশগুল থাকে আল্লাহ্ পাক তাদের জীবনের পূর্ববর্তী সব গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। পবিত্র হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-  যে ব্যক্তি পরিপূর্ণ ঈমান ও পূণ্যার্জণের প্রত্যাশা নিয়ে পবিত্র রমজান মাসে রোযা পালন করবে, তার অতীত জীবনের সমুদয় পাপরাশি মার্জনা করা হবে।

এছাড়া পবিত্র হাদীস শরীফে রয়েছে- মহান আল্লাহ্ রমজান মাসের প্রতি রাতে তিনবার বান্দাহদেরকে সম্বোধন করে বলেন- ওহে কোন প্রার্থণাকারী আছ কি? আমি তার প্রার্থনা কবূল করব। কোন তাওবাকারী আছ কি? আমি এক্ষুণি তার তাওবা কবূল করব। গুনাহ্ মাফের প্রার্থণাকারী কেউ আছ কি? আমি তার গুনাহ্ মাফ করব। উল্লেখ্য যে, রমজানের প্রতিটি দিনে আল্লাহ্ পাক হাজার হাজার জাহান্নামীকে আযাব হতে মুক্তি দিয়ে থাকেন।

  • জাহান্নামীদের মুক্তির মাস রমজানঃ  

রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের মাস মাহে রমজান আগমনের সাথে সাথে আল্লাহ্ তায়ালার রহমতের বিশেষ দ্বার খুলে দেয়া হয়। রহমতের অংশ হিসেবে এ মাসে হাজার হাজার জাহান্নামীকে মুক্তি দেয়া হয়।

রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রমজান এবং কোরআন কিয়ামতের দিবসে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে সুপারিশ করবে। সেদিন রোযা বলবে- হে আল্লাহ্! আমি তোমার এই বান্দাহ্‌ কে দিনের বেলায় পানাহার এবং জৈবিক চাহিদা হতে বারণ করে রেখেছিলাম। সুতরাং আজকে আমি তার ব্যাপারে সুপারিশ করছি, তুমি তাকে মুক্তি দাও। অপর দিকে কোরআন বলবে- হে আল্লাহ্! আমি তোমার এ বান্দাহ্কে রমজান মাসে রাতের বেলায় ঘুম থেকে বারণ করেছিলাম। সুতরাং আজকের এই কঠিন সন্ধিক্ষণে আমি তোমার পক্ষে সুপারিশ করছি, তুমি মেহেরবাণী করে তাকে মুক্তি দাও।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ্ পাক হযরত মূসা আলাইহিস্ সালামকে সম্বোধন করে বলেন, আমি উম্মতে মুহাম্মদীকে দু‘টি নূর দান করেছি যাতে তারা দু‘টি বড় ধরণের তিমিরাচ্ছন্ন বিপদ হতে রক্ষা পায়। ঐ দু‘টি নূর হল  রমজানের নূর এবং কোরআনের নূর। আর যে দু‘টি অন্ধকার থেকে মুক্ত করা হবে সে দু‘টির একটি হল কবরের অন্ধকার অপরটি হল কেয়ামতের ঘোর তমসাচ্ছন্ন পরিবেশ।

  • যার জন্য বেহেশ্ত অপেক্ষমানঃ 

কোন মুসলমানকে যদি প্রশ্ন করেন, আপনি কেন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন, কেন এত কষ্ট স্বীকার করে ইবাদত করেন কিংবা রাতের পর রাত কোরআন তিলাওয়াত করেন? তখন হয়তো কেউ উত্তর দেবেন। আল্লাহর হুকুম পালনার্থে অথবা কেউ বলবেন, পরকালে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, আবার কেউ বলবেন, বেহেশ্ত পাবার আশায়। কিন্তু বুদ্ধিমান মাত্রই বলবেন- আমার যাবতীয় ইবাদত বন্দেগী, কষ্ট স্বীকারের পেছনে একটি মাত্র উদ্দেশ্য; আর তা হল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কারণ, হাদীসে এসেছে, যে আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে তার জন্য সবই। বেহেশ্ত তার কাছে তুচ্ছ। বরং বেহেশ্ত নিজেই ঐ ব্যক্তিকে পাবার আশায় ব্যাকুল থাকে। তেমনি এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হল রোযাদার। রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- চার প্রকারের ব্যক্তির প্রতি বেহেশ্তের আকর্ষণ রয়েছে।

১. নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াতকারী।

২. অশ্লীল ব্যাক্যালাপ হতে মুখকে সংরক্ষণকারী।

৩. ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী এবং

৪. রমজান মাসে রোযা পালনকারী।

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আন্হু হতে বর্ণিত, রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন তোমাদের কেউ গভীর রাতে ঘুম হতে জাগ্রত হয় এবং ওঠার জন্য বিছানায় নড়চড়া করে একাত হতে ওকাত হয় তখন এক ফেরেশ্তা তাকে আহ্বান করতে থাকে। হে আল্লাহর বান্দাহ্ আপনি ওঠুন। আল্লাহ্ আপনার সামগ্রিক জীবনে বরকত দান করুন। অতঃপর বান্দাহ্ যখন তাহাজ্জুদ এর নিয়তে বিছানা ত্যাগ করে তখন ফেরেশ্তা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে, হে আল্লাহ্ তুমি তোমার এই বান্দাহ্কে বেহেশ্তের সুউচ্চ বিছানা দান করো। বান্দা যখন কাপড় চোপড় পরিধান করে তখন ঐ কাপড় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে হে আল্লাহ্! তুমি এই বান্দাকে বেহেশ্তী পোষাকে সজ্জিত করিও আর যখন জুতা, স্যান্ডেল পরিধান করে তখন ওগুলো প্রার্থনা করে হে আল্লাহ্! তুমি এই বান্দাকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা সঠিক পথের উপর অটল-অবিচল রেখো।

  • গুঢ় রহস্যে ভরা রমজানঃ

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন, আমি একদা রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‘কে জিজ্ঞেস করলাম ইয়া রসূলাল্লাহ্, রমজান মাসের ফজিলত কি? উত্তরে নবীজি এরশাদ করলেন- রমজানুল মোবারককে তাওরাতে ‘হাত্বা’ ইঞ্জিলে ‘ত্বাব’ যাবূরে ‘কেরাবত এবং পবিত্র কোরআনে ‘রমজান’ বলা হয়েছে। হাত্বা মানে নৈকট্য আর কেরাবত অর্থও নৈকট্য। যেহেতু রমজান মাসে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। সেহেতু এ মাসকে ওই নামসমূহ দ্বারা আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ মাসে এমন কতিপয় নেয়ামত অবতীর্ণ হয়ে থাকে যা সচরাচর অন্যান্য মাসে হয়না। সে সব নেয়ামতের মধ্যে বিশেষ ১৫টি হল-  ১. রিয্ক বৃদ্ধি হয়। ২. ধন-জন বৃদ্ধি পায়। ৩. এ মাসে যা কিছু খাওয়া হয় সবই ইবাদতে শামিল হয়। ৪. প্রত্যেক নেক্ কাজ দ্বিগুণ করে দেয়া হয়। ৫. আসমান-জমিনের সকল ফেরেশ্তা রোযাদারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। ৬. শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। ৭. রহমতের দরজাসমূহ প্রশস্ত করা হয়। ৮. বেহেশ্তের দরজাসমূহ খোলা হয়। ৯. রমজানের প্রতি রাতে সাত লক্ষ গুনাহ্গারকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে দেয়া হয়। ১০. রমজানের প্রতি শুক্রবার রাতে এই পরিমান গুনাহ্গার আযাদ হয়, যে পরিমাণ সাত দিনে আযাদ হয়। ১১. রমজানের শেষ রাতে সবার গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হয়। ১২. প্রত্যেক রোযাদারের জন্য বেহেশ্ত সজ্জিত করা হয়। ১৩. রোযাদারের রোযা কবূল করা হয়। ১৪. রোযাদারের শরীর সমস্ত গুনাহ্ হতে পবিত্র হয়। ১৫. আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ হয়।

হাদীস শরীফে বর্ণিত, রমজানের নতুন চাঁদ যখন দেখা যায় তখন আরশ-কুরসি ফেরেশ্তা সবাই মিলে সমস্বরে চিৎকার করতে থাকে আজকের দিবসে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সুখবর। এমনকি চন্দ্র, সূর্যও এ উম্মতের জন্য গুনাহ্ মাফ চেয়ে থাকে। আকাশে উড়ন্ত পাখি, সমুদ্রের গভীরে মৎস্যরাজি এ উম্মতের গুনাহ্ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে থাকে।

আর এদিকে আল্লাহ্ পাক স্বয়ং ফেরেশ্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, হে ফেরেশ্তারা তোমরা তোমাদের যাবতীয় ইবাদত বন্দেগী, তাসবীহ্, তাহলীল আমার বান্দাদেরকে দিয়ে দাও।

  • আসমানী কিতাব নাযিলের মাসঃ     

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, রমজান মাস যাতে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আসলে এ কেবল পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে এমনটি নয়। বরং সমস্ত আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছে এ মাসেই। যেমন- হাদীস শরীফে বর্ণিত হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম এর উপর অবতীর্ণ সহীফাসমূহ নাযিল হয় এ মাসের প্রথম তারিখ। তাওরাত নাযিল হয় হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম এর উপর এ মাসের ষষ্ঠ দিবসে। ইঞ্জিল নাযিল হয় তেরতম তারিখে। যাবূর নাযিল হয় ১৮তম তারিখে এবং সর্বশেষ আসমানী কিতাব কোরআন করীম নাযিল হয় রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‘র উপর এই মাসের ২৪তম মতান্তরে ২৭তম তারিখ রাতে। নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মাসকে তিনভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম দশদিন হল রহমতের অংশ, দ্বিতীয় দশ দিন হল মাগফিরাতের এবং শেষের দশ দিন হল দোযখ ও আযাব হতে নাজাত বা মুক্তির দশক। তাই রমজানের প্রথম দশ দিনে আল্লাহ্ পাক তার বান্দাদেরকে বিশেষ ধরণের রহমতদানে ধন্য করেন। আর যারা সত্যিকারার্থে রোযা পালন করে, তাদেরকে ব্যাপকহারে রহমত বা দয়া করে থাকেন। তা কেবল পবিত্র রমজানের উসিলায়।

অপর হাদীসে রয়েছে, এই মাসের প্রথম তারিখেই মহান আল্লাহ্ কিরামান-কাতিবীন ফেরেশ্তাদেরকে ডেকে নির্দেশ প্রদান করেন, যাতে এ মাসে রোযা পালনকারীদের আমল নামায় কেবল সাওয়াবই লেখা হয় এবং কোন গুনাহ্ যাতে লেখা না হয়। অধিকন্তু আল্লাহ্ তায়ালা রোযাদারের পূর্ববর্তী যাবতীয় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন।

মুফাস্সিরকুল প্রধান হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আন্হুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‘কে বলতে শুনেছি- যদি আমার উম্মতরা জানত যে, এ মাসের মধ্যে কী মহাত্ম রয়েছে, তাহলে তারা আল্লাহর দরবারে কেবলই প্রার্থনা করত। হায়! আল্লাহ্ যদি পুরো বৎসরটাই রোযা হত তাহলে তো ভালই হত। কেননা এ মাস সাওয়াবে ভরপুর, যাবতীয় ইবাদত এমাসে কবূল হয়ে যায়। যেকোন প্রার্থনা এ মাসে পূরণ করা হয় এবং ব্যাপকহারে পাপ মার্জনা করা হয়। সর্বোপরি রোযাদারের জন্য জান্নাত নিজেই প্রত্যাশী হয়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানায়।

  • আত্মশুদ্ধির মাসঃ 

মানুষের শরীরের চালিকাশক্তি হল তার আত্মা। আত্মা যেদিকে দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে। সুতরাং আত্মা পরিশুদ্ধ হলে সে ব্যক্তি সৎকাজে ব্রতী হয়। আর আত্মা অশুদ্ধ হলে ব্যক্তি অসৎ বা অন্যায় কাজে পা বাড়াতে দ্বিধাবোধ করেনা। সুতরাং সচ্চরিত্র অর্জনে আত্মার ভূমিকাই প্রধান। আর সে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ্ পাক রোযার বিধান প্রবর্তন করেন। আত্মা পরিশুদ্ধতার অন্যতম উপায় হল উপবাস থাকা। রোযার রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত শায়খ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, রমজান শব্দটি এসেছে ‘রমজুন’ মূলধাতু হতে যার অর্থ হল জ্বালিয়ে ফেলা। সর্বোপরি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আর আত্মর পরিশুদ্ধতা অর্জিত হয় উপবাসের মাধ্যমে। মানবসৃষ্টির উপাদান সমূহের মধ্যে আল্লাহ্ তায়ালা সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছিলেন, আকল (বিবেক) এবং নাফস (আত্মা)কে। অতঃপর আকলকে সম্বোধন করে প্রশ্ন করেছিলেন তুমি কে? আর আমি কে? আকল উত্তর দিল। আপনি আমার মহামান্য প্রভু এবং সৃষ্টিকর্তা। আর আমি আপনার অনুগত এক দুর্বল বান্দাহ্। আকল এর এই সুন্দর উত্তর শুনে আল্লাহ্ পাক খুশী হয়ে গেলেন। পক্ষান্তরে নাফসকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কে? আর আমি কে? নাফস জবাব দিল- তুমি তুমিই আর আমি আমিই। নাফস’র এরূপ দাম্ভিকতাপূর্ণ জবাবে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হলেন এবং ফেরেশ্তাকে আদেশ দিলেন এই অকৃতজ্ঞ নাফস পরিশুদ্ধ করার জন্য। আদেশ পেয়ে ফেরেশ্তা ঐ নাফসকে এক বৎসর মতান্তরে একশ বৎসর উত্তপ্ত আগুনে পোড়ালেন অতঃপর আল্লাহর সামনে হাজির করলেন। এবার আল্লাহ্ প্রশ্ন করলেন এখন বল তুমি কে আর আমি কে? নাফস এর অহঙ্কার এতটুকু হ্রাস পেলনা। বরং পূর্বের ন্যায় দম্ভভরে বলে উঠলো তুমি তুমিই আর আমি আমিই। আল্লাহ বলেন একে আরো শাস্তি দেয়া হোক। যাতে তার অহঙ্কার প্রশমিত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফেরেশ্তা এবার তাকে প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে এক বৎসর মতান্তরে একশ বৎসর ডুবিয়ে রাখলেন। অতঃপর পুনরায় হাজির করলেন আল্লাহর দরবারে। এবার প্রশ্ন করা হল- ঠিক একই উত্তর। অহঙ্কার বরাবরের মতই রয়ে গেল। শেষ বারের মত আল্লাহ্ পাক ফেরেশ্তাকে আদেশ দিলেন এই অহঙ্কারী নাফসকে যদি নরম করতে চাও তাহলে একটা উপযুক্ত শাস্তি রয়েছে আর তা হল, তাকে এক মাস খাবার দেয়া বন্ধ রাখা হোক। আদিষ্ট ফেরেশ্তা ঠিক তাই করলেন। দেখা গেল কয়েকদিন যেতে না যেতেই তার ভিতর পরিবর্তন শুরু হল। একমাস পর উপবাসের কারণে একেবারেই দুর্বল হয়ে গলে। অহঙ্কার চিরতরে বিদায় নিল। এবার আল্লাহ্ প্রশ্ন করলেন তুমি কে? আর আমি কে? অত্যন্ত আনুগত্য সহকারে বলল- হে প্রভু! আপনি মহান সৃষ্টিকর্তা, আর আমি দুর্বল বান্দাহ্।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, নাফসকে আগুন আর ঠান্ডা পানি দুর্বল করতে পারেনি। সেই নাফস দুর্বল এবং পরিশুদ্ধ হয়ে যায় এক মাস উপবাসের কারণে। মানুষের অধিক উৎকর্ষতা আর পরিশুদ্ধতার জন্যই মূলত: এই একমাস রোযার বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে।

  • রোযা তাক্ওয়া অর্জনের অনন্য উপায়ঃ   

মুসলমানের সার্বিক জীবনে রোযার অশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ রোযা কেবল উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপরই ফরজকৃত নতুন ইবাদত নয়। বরং তা পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরজ ছিল। হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম হতে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম পর্যন্ত সকল উম্মতের উপর রোযা ফরজ ছিল। তবে পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের সাথে বর্তমান ফরজকৃত রোযার সংখ্যা, সময়সীমা ইত্যাদিতে পার্থক্য রয়েছে। মূলত: রোযা বা সিয়াম সাধনা এক কষ্টসাধ্য ইবাদত। আর এ রোযা সম্পাদনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে খোদাভীরু করা। এ পর্যায়ে পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা ১৮৩নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা মুত্তাকী (খোদাভীরু) হতে পার।

রোযা হল আরবী ‘সওম’ এর প্রতিশব্দ এর শাব্দিক অর্থ হল বিরত থাকা। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় রোযার নিয়তে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং যৌন সম্ভোগ হতে বিরত থাকা। সূর্যাস্তের ১ মিনিট আগেও যদি কেউ কোন কিছু খেয়ে ফেলে বা পান করে কিংবা যৌন সম্ভোগে লিপ্ত হয় তবে রোযা হবে না। রমজান মাসকে আল্লাহ্ তায়ালা বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। সাধারণতঃ ইবাদতের পরিমাণ দশগুণ হতে সাতশ‘ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রোযার ব্যাপারটা তার ব্যতিক্রম। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা হাদীসে কুদসীতে এরশাদ করেন- “রমজানের রোযা ছাড়া অন্যসব ইবাদতের বদলা দশগুণ থেকে সাতশ‘ গুণ পর্যন্ত দেয়া হবে। কিন্তু রোযা আমারই এর প্রতিদান আমিই।” সুতরাং বুঝা গেল রোযার প্রতিদানের নির্দিষ্ট কোন পরিমান নেই। স্বয়ং আল্লাহ্ তাঁর দায়িত্ব নিজ কুদরতি হাতেই গ্রহণ করেছেন। তার পেছনে অনেকটা কারণ রয়েছে- প্রথমত: এই রোযা আর অন্যান্য ইবাদতের মধ্যকার একটা পার্থক্য সুস্পষ্ট। কারণ অন্যান্য ইবাদতে লোক দেখানোর কিছুটা অবকাশ রয়েছে। কিন্তু রোযাতে তাও নেই। যেমন কেউ নামায পড়লে লোকেরা তাকে নামাযী হিসেবে আখ্যায়িত করে। আর কোন ব্যক্তি হজ্ব করলে তাকে সবাই হাজ্বী সাহেব সম্বোধন করে, আর যে ব্যক্তি যাকাত দেয় তারও একটা সমাজে পরিচিতি থাকে। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি রাতের গভীরে ঘুম থেকে ওঠে রোযার উদ্দেশ্যে সেহরী খেলো এবং সারাদিন রোযা রাখল কি রাখলনা তা কেউ বুঝতে পারেনা। কারণ লোকচক্ষুর অন্তরালে কিছু খেলে তা জানার সাধ্য কারো নেই। সুতরাং রোযাদার রোযা রাখে একমাত্র আল্লাহর ভয়ে। তাই রোযার পুরস্কার আল্লাহ্ তায়ালা নিজের কুদরতি হস্তেই গ্রহণ করেছেন।

  • ধৈর্যের চরম পরাকাষ্টা প্রদর্শনের মাসঃ

ধৈর্য মানবচরিত্রের একটি মহৎগুণ। আল্লাহ্ পাক সূরা বাকারায় ইরশাদ করেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু চার ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত নয়- ১. যারা আল্লাহ্ এবং রসূল এর উপর ঈমান এনেছে। ২. সৎকাজ করেছে। ৩. যারা একে অপরকে হকের অসিয়ত পরামর্শ দেয় এবং ৪. যারা পরষ্পর ধৈর্যের পরামর্শ দিয়ে থাকে (সূরা আসর)।

আল্লাহ্ পাক নবীদের নবুয়্যত প্রাদানের প্রাক্কালে সবর বা ধৈর্যের পরীক্ষা করেছেন। মানবজাতির আদিপিতা হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম থেকে শুরু করে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম, হযরত আইয়ূব আলাইহিস্ সালাম‘সহ অসংখ্য নবী-রসুল‘কে আল্লাহ্ তায়ালা কঠিন সাধনার মাধ্যমে ধৈর্যের চরম পরীক্ষা করেছেন। এমনকি নবীকুল সরদার হুজূর আন্ওয়ার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র দুনিয়াবী জীবনেও দেখা যায়- ধৈর্যের অসংখ্য নিদর্শন। ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তাকে সহ্য করতে হয়েছে তৎকালীন কাফির-মুশরিকদের অশালীন আচরণ আর অকথ্য নির্যাতন। কিন্তু মুহূর্তের জন্য এতটুকু ধৈর্য হারা হয়নি। বরং অকাতরে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছেন। হে আল্লাহ্ তুমি তাদেরকে হেদায়াত করো, তারা না বুঝেই এহেন আচরণ করছে। এভাবে দেখা যায় প্রতিটি যুগে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছে ধৈর্যের মাধ্যমে এবং তাদের সফলতা অর্জনের নৈপথ্য শক্তিই এই ‘ধৈর্য’।

ধৈর্য নামক মহৎগুণটি মানবজীবনে অর্জিত হয় পবিত্র রমজান মাসেই। একজন রোযাদার যখন ক্ষুধায় ও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ে তখন সে এদিক সেদিক ছটফট করতে থাকে। অথচ তার সামনেই রয়েছে নানা ধরণের মজাদার খাবার, পানীয়, ইচ্ছা করলেই হাত বাড়িয়ে খেলে ফেলতে পারে। কিংবা লুকিয়ে কিছু খেয়ে ফেললেও তা বুঝা সম্ভব নয়। কিন্তু রোযাদার কি তা করে ? নিশ্চয়ই না। বরং ধৈর্যের মাধ্যমে নিজেদের প্রবৃত্তির তাড়নাকে সংযত রাখে। আর তা একমাত্র আল্লাহর ভয়ে, ফলে রোযাদার আল্লাহর নৈকট্যলাভে সক্ষম হয়।

  • সেহরী মহা ফজিলতপূর্ণ ইবাদতঃ

রোযাদার রোযা পালনের মানসে শেষ রাত্রিতে যে খাবার খেয়ে থাকে তা কেবল আহার নয়। বরং সিয়াম পালনকারীর পক্ষে সেহরী খাওয়া সুন্নাত ও সাওয়াবের কাজ। এ পর্যায়ে হাদীস শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে সেহরী খাও এতে অতিশয় বরকত রয়েছে। এই সেহরী পেটভর্তি করে খাওয়া শর্ত নয়। বরং দু‘এক লোকমা খেলেও সাওয়াব পাওয়া যায়। যারা সেহরী খাওয়ার সময় পাবেনা তারা অন্তত এক গ্লাস পানি পান করে নিবে। সেহরী খাওয়ার উৎকৃষ্ট সময় হল রাত্রির শেষ ভাগে তথা সুব্‌হে সাদিকের সামান্য পূর্বে। আর কেউ যদি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে দেখল যে, সুব্‌হে সাদিক হয়ে গেল। তাহলেও সারাদিন রোযা পালন করতেই হবে।

হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আন্হু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন। যখন রোযাদার সেহরীর উদ্দেশ্যে শেষ রাতে জাগ্রত হয়ে বিছানায় নড়াচড়া করে এদিক-সেদিক ফিরে, তখন এক ফেরেশ্তা বলতে থাকে হে আল্লাহর বান্দাহ্ জেগে ওঠো, আল্লাহ্ পাক তোমার জীবন বরকতময় করুন। অতঃপর রোযাদার তাহাজ্জুদের নামায এর নিয়তে উঠে দাঁড়ায় তখন বিছানায় তার জন্য দোয়া করে, হে আল্লাহ্ তুমি এই বান্দাকে বেহেশ্তে সুউচ্চ বিছানা দান করিও। অতঃপর সে যখন কাপড়-চোপড় পরিধান করে ঐ কাপড় দোয়া করতে থাকে- হে আল্লাহ্ তুমি এই বান্দাকে বেহেশ্তী পোষাকে সজ্জিত করিও। অতঃপর যখন জুতো বা স্যান্ডেল পরিধান করে সেগুলি দোয়া করে হে আল্লাহ্ তুমি এই বান্দাকে সিরাতুল মুস্তাকীম এর উপর অটল অবিচল রাখো। নামায আদায়ান্তে আল্লাহর দরবারে যে দোয়াই করা হয় সব কবূল হয়। সর্বশেষে যখন সেহরী খাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসন হাতে নেয় তখন ওই বাসন ফরিয়াদ করতে থাকে- হে আল্লাহ্! তুমি এ বান্দাকে বেহেশ্তী খাবার দিয়ে পরিতৃপ্ত করিও। আর এদিকে আল্লাহ্ পাক স্বয়ং আহ্বান করেন- হে আমার বান্দাহ্! আজকের এ শুভ মুহূর্তে তোমার কাজ হলো দোয়া করা আর আমার কাজ হল দোয়া কবূল করা। তোমার কাজ গুনাহ্ মাফ চাওয়া আর আমার কাজ গুনাহ্ মাফ করা।

  • ইফতার রোযাদারের সুখময় সন্ধিক্ষণঃ  

দিনের অবসানে সূর্য ক্রমান্বয়ে পশ্চিামাকাশে ঢলে পড়লো, লাল হয়ে এল তার চেহারা, অল্পক্ষণ পরেই হারিয়ে যাবে সে দিনের মত। ঠিক এমন এক মুহূর্তে সাজানো হল হরেক রকম খাবার। ঝাল, মিষ্টি কত বৈচিত্র খাবারের সমারোহ শোভা পাচ্ছে দস্তারখানায়। সবক’টি আল্লাহর নেয়ামত। এসব সামনে নিয়ে কেবলি তাকিয়ে আছে রোযাদার। সারাদিন সে কিছুই খেতেই পারেনি; ক্ষুধার্ত তাড়নায় পেটের অবস্থা কাহিল। অথচ সামনেই রয়েছে অঢেল খাবার। হাত বাড়ালেই যেন মুখে এসে যাচ্ছে, কিন্তু এতটুকু লোভ সংবরণ করার যে ধৈর্য এবং আদর্শ তা কেবল রোযার সম্মানে। তাইতো আল্লাহ্ ফেরেশ্তাদের বলেন- ‘দেখ, দেখ, আমার বান্দাহ্ অসংখ্য মজার মজার খাবার সামনে নিয়েই বসে আছে একমাত্র আমার সম্মানেই এসব খাচ্ছেনা। সুতরাং তোমরা আমার কাছে তাদের গুনাহ্ মাফ চাও। ফেরেশ্তাগণ সমস্বরে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করবে- আল্লাহ্, তুমি দয়াময়, তোমার এ সমস্ত বান্দা একমাত্র তোমার ভয়েই না খেয়ে সারাদিন অতিবাহিত করল আর অসংখ্য সুস্বাদু খাবার হাতের মুঠোয় পাবার পরেও খাওয়ার সাহস করছেনা। সুতরাং এ একাগ্রতার কারণে তুমি আজ তাদের সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দাও। আল্লাহ্ পাক অত্যন্ত খুশী হয়ে বান্দার গুনাহ্ মাফ করে দেন।

এদিকে প্রহর গুণতে গুণতে সূর্য হারিয়ে গেল। বেজে ওঠলো চতুর্দিকে মুয়াজ্জিনের কন্ঠে আযানের সুললিত ধ্বনি। এতো রোযাদারের আনন্দময় মুহূর্ত। কোথাও মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই আর কোথাওবা বন্ধু-বান্ধব মিলে ইফতার করছে। এরপর মসজিদে চলছে সমান তালে মুসল্লিদের আমেজ। কী এক অপূর্ব আমেজ। ফেরেশ্তারা দেখে কেবলই হাসছে আর আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছে। এ পর্যায়ে হাদীসে কুদ্সীতে ইরশাদ হয়েছে-

রোযাদারের দু‘টি আনন্দ। এক. ইফতারের সময়। দ্বিতীয়. রোযা, সেহরী, ইফতার, তাহাজ্জুদ ইত্যাদির বদৌলতে চূড়ান্ত সফলতা হিসেবে সর্বশেষে রব্বুল আলামীনের একান্ত দিদার লাভে ধন্য হবার চরম মুহূর্তে।

  • সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের অনুপম নিদর্শন রোযাঃ

চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন

ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে?

কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে

কভু আশিবিষে দংশেনি যারে।

যে কোন দিন অভুক্ত থাকেনি, সে কোনদিন ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করতে পারবে না। পারবে না বুঝতে গরীব দুঃখী, মানুষের অভাবের যন্ত্রণা। দুঃখে যাদের জীবন গড়া, অনাহারে অর্ধাহারে যাদের দিনাতিপাত তাদের কষ্ট-যাতনা কী জ্বালামীয় তা অনুভবের এক উপযুক্ত সময় মাহে রমজান। রমজানের রোযা পালনে ধনী-গরীব সবাই সমান অংশীদার দিনের বেলায় অভাব অনটনে জর্জরিত লোকেরা যেমন উপবাস জীবন যাপন করে ঠিক তেমনি অঢেল সম্পত্তির মালিক ব্যক্তিও উপোস করে সমান তালে আর তখন থাকেনা তাদের মাঝে কোন ব্যবধান। ধনীর হৃদয়ে অনুভূত হয় গরীবের দুঃখ-যাতনা ফলে বাড়তে থাকে তাদের মাঝে সহানুভূতি আর সম্প্রীতি। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হয়ে ওঠে আরো সুদৃঢ় এবং সর্বশেষ তা চূড়ান্তরূপ লাভ করে পবিত্র ঈদের ময়দানে।

সিয়ামের মাধ্যমে মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে এমন সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের সৃষ্টি হয় যার দৃষ্টান্ত বিশ্বের কোথাও পাওয়া যায়না। সেহরী-ইফতার-তারাভীহ ইত্যাদির শুভমুহূর্তে সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির যে নিদর্শন তা পৃথিবীতে বিরল। বিশেষত প্রত্যহ ইফতারের সময়ে একই সাথে বসে ইফতারী গ্রহণের মত বড় সাম্যের শিক্ষা সত্যিই প্রাণবন্ত।

  • রোযাদার পরিচ্ছন্ন কাপড়ের ন্যায় পাপমুক্তঃ

রমজানের তিনটি দশকের তিন বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে রোযাদারের ব্যক্তি জীবন হয়ে ওঠে স্বচ্ছ ও সুন্দর। সিয়াম মানুষকে পাপমুক্ত করার অনন্য সহায়ক। সাবান যেভাবে কাপড়কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দেয়, রোযাও তেমনি রোযাদারকে পাপমুক্ত সুন্দর মানুষে রূপান্তরিত করে দেয়। এছাড়া অতিরিক্ত সাওয়াব লাভের জন্য রাত্রিবেলায় তারাভীহর নামাযের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে।

‘তারাভীহ’ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্। হাদীস শরীফে রয়েছে তারাভীহ্ রোযাদারের রোযা আল্লাহর দরবারে পৌছে দেয়ার মাধ্যম। যে ব্যক্তি রোযা রাখল, কিন্তু তারাভীহ নামায পড়লনা তার সে রোযা আসমান ও জমীনের মধ্যখানে ঝুলন্ত থাকে। আর যে ব্যক্তি রোযা রাখল পাশাপাশি তারাভীহ নিয়মিত আদায় করল তার রোযা আল্লাহর দরবারে বিনা বাঁধায় কবূল হয়ে যায়। অধিকন্তু রমজানের শেষ দশদিনের বিজোড় তারিখের রাতে রয়েছে সম্মানিত কদরের রাত। যে রাত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে, এ রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এ রাতের নিরঙ্কুশ ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ হয়ে ওঠে নবজাত শিশুর মত পাপমুক্ত।

মানুষ মাত্রই দুর্বলতার উর্ধে নয়। ফলে তার দ্বারা দূর্ভাগ্যজনকভাবে ঘটে যায় অনেক পাপ। তবে পরবর্তী সালাত সার্বিকভাবে আদায় করলে তা মাফ হয়ে যায়। এভাবে দৈনিক পাঁচবার আদায় করলেও যদি কোন পাপ মাফ না হয়, তবে সপ্তাহে জুমআর নামায আদায়ের মাধ্যমে অবশিষ্ট পাপ মোচন হয়ে যায়। এরপরও যদি অবশিষ্ট থাকে তবে পবিত্র রমজানের রোযা সঠিকভাবে আদায় করলে সেগুলো গুনাহ্ মাফ হয়ে যায়।

  • রোযা ত্যাগের মহিমায় সমৃদ্ধঃ 

ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। মূলত: এই শিক্ষা ইসলামেরই। ইসলামে ত্যাগের রয়েছে বিরাট গুরুত্ব। যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সফলতার চরম শিখরে আরোহনের নেপথ্যে যে শক্তি কাজ করেছিল তা হচ্ছে ত্যাগ। নবী-অলীদের জীবনী দেখলেই ফুটে ওঠে তার বাস্তবতা হাজারো সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আরাম আয়েশকে পদদলিত করে তারা বেছে নিয়েছিলেন চরম কষ্টের জীবন। অনাহারে অর্ধাহারে কাটিয়েছেন তাদের সাধনালব্ধ জীবন।

মূলতঃ আত্মিক সাধনার সঙ্গে উপবাসের একটা গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। অন্ধকার যুগেও অনেকে আত্মশুদ্ধির ব্রতে উপবাস থাকত। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হল আত্মশুদ্ধি এবং সংযমের ভিতর দিয়েই খোদার নৈকট্য অর্জন সহজ। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সাত বৎসর বয়স হতেই রোযা রাখার অভ্যাস করেছিলেন। সনাতন ধর্মে উপবাসের যে সমস্ত পদ্ধতি রয়েছে, মূলত: তার যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। পক্ষান্তরে ইসলাম হল, একটি ব্যবহারিক ও লৌকিক ধর্ম। সর্বসাধারণের জন্য ইসলামের যে সব ব্যবস্থা রয়েছে তাতে এ ধরণের কৃচ্ছতা সাধনের নির্দেশ নেই। মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্ম অনুসরণ করার মধ্যে দৈনিক পাঁচবার আল্লাহর দরবারে হাজির হবে তার নিয়মিত নামাযের মাধ্যমে। অতঃপর বছরে সে একবার নিজেকে নিয়ন্ত্রিত ও শানিত করবে রোযা পালনের মাধ্যমে। এটা হল মোটামুটি ইসলামের অনুপম ব্যবস্থা।

রোযার উদ্দেশ্যই হল সব ইন্দ্রিয় ও সর্বপ্রকার প্রবৃত্তির সঠিক সংযম, রোযাদারের কর্তব্য হল তার মনকে বিরত রাখা পাপাচার হতে, চক্ষুকে বিরত রাখা অবৈধ বস্তু দর্শন হতে, এভাবে প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে বিরত রাখা নিষিদ্ধ বস্তু হতে।

যে ব্যক্তি ত্যাগের চরম পরাকাষ্টা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিষ্টার সাথে একমাত্র রোযা পালন করে তখন তার অন্তরে লুকিয়ে থাকা কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত হতে বাধ্য হয় এবং সে আধ্যাত্মিকভাবে হয়ে ওঠে আরো সমৃদ্ধশালী।

  • শেষ দশকের প্রতিটি রাতই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময়ঃ

মাহে রমজানের শেষ দশক মহা বরকতময়। এর প্রতিটি দিবসের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি শেষের দশ রোযা ইজ্জত সম্মানের সাথে অতিবাহিত করবে তার ভাগ্যে রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার।

মাওলা আলী শেরে খোদা কার্‌রামাল্লাহু ওয়াজহাহূ হতে বর্ণিত রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন রমজানের শেষ দশকের প্রথম রাত্রি তথা একুশতম রাত্রিতে আল্লাহ্ পাক রব্বুল আলামীন রোযাদারের জন্য বেহেশ্তের মধ্যে একটি নূরের দালান তৈরী করেন। বাইশতম রাত্রির বদৌলতে এ রোযাদার কেয়ামতের কঠিন মুহূর্তে সমস্ত দুঃখ বেদনা হতে মুক্ত থাকবে। তেইশতম রাত্রিতে আল্লাহ্ পাক ঐ রোযাদারের জন্য বেহেশ্তে এমন এক সুন্দর শহর তৈরী করবেন যেখানে সে মনের আনন্দে শুধু ঘুরে বেড়াবে। চব্বিশতম রাত্রির বদৌলতে তার যেকোন চব্বিশটি রোযা বিশেষভাবে কবূল করা হবে। পঁচিশতম রাত্রির বদৌলতে তার কবরের আযাব উঠিয়ে নেয়া হবে। ছাব্বিশতম রাত্রির বদৌলতে চল্লিশ বৎসরের সাওয়াব তার আমলনামায় প্রদান করা হবে। সাতাইশতম রাত্রির বদৌলতে বিদ্যুৎ গতিতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। আটাশতম রাত্রির বরকতে তার মর্যাদা বেহেশ্তের মধ্যে আরো এক ধাপ উন্নীত করা হবে। ঊনত্রিশতম রাত্রির বদৌলতে আল্লাহ্ পাক তাকে একহাজার মকবূল হজ্বের সাওয়াব প্রদান করবেন এবং সর্বশেষ ত্রিশতম রাত্রির বদৌলতে রব্বুল আলামীন ওই বান্দাকে তাঁর দীদার দানে ধন্য করবেন এবং অত্যন্ত আদরের সাথে ডেকে বলবেন-  বান্দা আমার! তুমি বেহেশ্তের যেখান থেকে ইচ্ছা মজাদার ফল ভক্ষণ করো, তুমি গোসল করো সালসাবীল নামক ঝর্ণা হতে, আর তৃপ্ত সহকারে পান কর হাউজে কাউসারের অমীয় বারি। আমিই তোমার প্রভু আর তুমি আমার বান্দাহ্।

আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে পবিত্রতম মহান মাহে রমজানের সার্বিক শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আমাদের বাস্তব জীবনে লালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥

 

Check Also

রোজা সংযম শিক্ষক

আরবি হিজরির নবম মাস রমজান। ঈমাম বাগাভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মতে রমজান শব্দটি আরবি রমদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *