সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > ইসলামের ভ্রান্ত মতবাদ সমূহ > যে কারণে ইয়াযিদকে রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও আমীরুল মু’মিনীন বলা ইসলামের পরিপন্থী

যে কারণে ইয়াযিদকে রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও আমীরুল মু’মিনীন বলা ইসলামের পরিপন্থী

 মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত অবধি উদ্ভাবিত ও প্রভাবিত সকল ফিতনার ব্যাপারে উম্মতকে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দিয়েছেন । এরই প্রেক্ষিতে হুযুর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াযিদের ফিতনার ব্যাপারেও অবগত করেছেন । এ প্রসঙ্গে একাধিক হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে। কোন বর্ণনায় ইঙ্গিত করা হয়েছে আবার কোন বর্ণনায় সরাসরি বলা হয়েছে যে, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, সুন্নতকে পরিবর্তনকারী, দ্বীনে ফাটল সৃষ্টিকারী হবে বনু উমাইয়ার ইয়াযিদ নামক ব্যক্তি ।

হযরত আবু উবাইদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,

عَنْ أَبِي عُبَيْدَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” لَا يَزَالُ أَمْرُ أُمَّتِي قَائِمًا بِالْقِسْطِ حَتَّى يَكُونَ أَوَّلَ مَنْ يَثْلِمُهُ رَجُلٌ مِنْ بَنِي أُمَيَّةَ يُقَالُ لَهُ: يَزِيدُ

অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের শাসন ন্যয়সঙ্গত থাকবে অর্থাৎ শাসক ন্যয়পরায়ণ হবে। সর্বপ্রথম যে তা বিনষ্ট করবে সে হল বনু উমাইয়ার ইয়াযিদ। [১]

প্রসিদ্ধ মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসীর তার আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ গ্রন্থের ৮:২৩১ পৃষ্ঠায় হাদীসটি উল্লেখ করেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম শিহাব উদ্দীন আহমদ বিন হাজর মক্কী হায়তামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার ‘সওয়ায়িকুল মুহাররিকাহ’ গ্রন্থের ১৩২ পৃষ্ঠায় গ্রন্থে উল্লেখ করেন। হাফিজুল হাদীস, মুফাসসির আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ তার তারিখুল খুলাফা গ্রন্থের ১৫৮ পৃষ্ঠায় হাদীসটি উল্লেখ করেন।

ইবনে হাজর হায়তামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ‘সওয়ায়িকুল মুহাররিকাহ’ গ্রন্থে আরও বর্ণনা করেন-

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أَوَّلُ مَنْ يُبَدِّلُ سُنَّتِي رَجُلٌ مِنْ بَنِي أُمَيَّةَ يُقَالُ لَهُ يَزِيدُ

অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে যে সর্বপ্রথম আমার সুন্নাতকে পরিবর্তন করে দিবে সে হল বনু উমাইয়ার ইয়াযিদ।[২]

সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত হচ্ছে-

حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ سَعِيدٍ، قَالَ: أَخْبَرَنِي جَدِّي، قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ فِي مَسْجِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ، وَمَعَنَا مَرْوَانُ، قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: سَمِعْتُ الصَّادِقَ المَصْدُوقَ يَقُولُ: هَلَكَةُ أُمَّتِي عَلَى يَدَيْ غِلْمَةٍ مِنْ قُرَيْشٍ فَقَالَ مَرْوَانُ: لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ غِلْمَةً. فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: لَوْ شِئْتُ أَنْ أَقُولَ: بَنِي فُلاَنٍ، وَبَنِي فُلاَنٍ، لَفَعَلْتُ

অর্থাৎ হযরত আমর বিন ইয়াহিয়া সাঈদ বিন আমর বিন সাঈদ তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি মদীনা শরীফে মসজিদে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে বসে ছিলাম, আর মারওয়ানও আমাদের সাথে ছিল। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি সত্যবাদী এবং সত্যয়নকারী নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করতে শুনেছি যে, আমার উম্মতের বিনাশ কুরাঈশ গোত্রের কতেক সন্তানের দ্বারা হবে। তখন মারওয়ান বলল, ঐসব যুবকদের উপর আল্লাহর লা’নত। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি যদি বলি সে বনু অমুক বনু অমুকের অন্তর্ভুক্ত তবে কি তুমি তা লা’নত বলবে? [৩]

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় “ফাতহুল বারীতে” আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজর আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন-

أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يَمْشِي فِي السُّوقِ وَيَقُولُ اللَّهُمَّ لَا تُدْرِكْنِي سَنَةُ سِتِّينَ وَلَا إِمَارَةُ الصِّبْيَانِ وَفِي هَذَا إِشَارَةٌ إِلَى أَنَّ أَوَّلَ الْأُغَيْلِمَةِ كَانَ فِي سَنَةِ سِتِّينَ وَهُوَ كَذَلِكَ فَإِنَّ يَزِيدَ بْنَ مُعَاوِيَةَ اسْتُخْلِفَ فِيهَا وَبَقِيَ إِلَى سَنَةِ أَرْبَعٍ وَسِتِّينَ فَمَاتَ

অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বাজারে হাটার সময়ও এই দু’আ করতেন যে, ৬০ হিজরী এবং যুবকদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা কর ! এই বর্ণনায় ঐ দিকেই ইঙ্গিত ছিল যে, ৬০ হিজরী সালে যে শাসক হবে সে যুবক সম্প্রদায়ের হবে এবং এমনই হল ৬০ হিজরী সনে ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া শাসক হিসেবে বসে এবং ৬৪ হিজরী পর্যন্ত বলবত থেকে মারা যায়। [৪]

সায়্যিদুশ শোহাদা ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের ঘটনায় মদীনাবাসী ইয়াযিদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন, তারা গাসলে মালাইকাহ হযরত হানযালাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র আব্দুল্লাহ বিন হানযালাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাতে বায়’আত গ্রহণ করেন। এ সংবাদ পেয়ে ইয়াযিদ এক বিশাল বাহিনী মদীনা শরীফের দিকে পাঠায়,যারা মদীনাবাসীর উপর হামলা করে, মদীনার পবিত্রতা নষ্ট করে,লুটপাট চালায়; এমন সময় হযরত আব্দুল্লাহ বিন হানযালাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এক হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য প্রদান করেন। যাতে তিনি ইয়াযিদের বিরুদ্ধে ইসলামের প্রতি বিরোধিতা ও শত্রুতার কথা উল্লেখ করেন ।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মদ বিন সা’দ তার বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ তাবকাতে কুবরায় উল্লেখ করেন-

أَجْمَعُوا عَلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حَنْظَلَةَ فَأَسْنَدُوا أَمْرَهُمْ إِلَيْهِ فَبَايَعَهُمْ عَلَى الْمَوْتِ وَقَالَ: يَا قَوْمُ اتَّقُوا اللَّهَ وَحْدَهُ لا شريك له. فو الله مَا خَرَجْنَا عَلَى يَزِيدَ حَتَّى خِفْنَا أَنْ نُرْمَى بِالْحِجَارَةِ مِنَ السَّمَاءِ. إِنَّ رَجُلا يَنْكِحُ الأُمَّهَاتِ وَالْبَنَاتَ وَالأَخَوَاتِ وَيَشْرَبُ الْخَمْرَ وَيَدَعُ الصَّلاةَ وَاللَّهِ لَوْ لَمْ يَكُنْ مَعِي أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ لأَبْلَيْتُ لِلَّهِ فِيهِ بَلاءً حَسَنًا  

অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ বিন হানযালাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মদীনাবাসী হতে আমৃত্যু লড়াইয়ের বায়’আত গ্রহণের পর তার বক্তৃতায় বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! এক আল্লাহকে ভয় কর, যিনি ব্যতীত কোন শরীক নেই। আল্লাহর শপথ! আমরা ইয়াযিদের আনুগত্য তখনই ছেড়ে দিয়েছি যখন আমাদের আশংকা হল যে, (তারই বদমায়েশীর কারণে) না জানি আমাদের উপর আসমান হতে পাথর বর্ষিত হয় কিনা। অবশ্যই লোকটি (ইয়াযিদ) মা-বোন ও কন্যাদের সাথে বিবাহে বৈধতা দেয়, প্রকাশ্যে মদ্যপান করতে থাকে এবং নামায ত্যাগ করে। আল্লাহর শপথ! যদি কেউই এই লোকের বিরুদ্ধে আমায় সঙ্গ না দেয়, তবুও আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তার বিরুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করতঃ যুদ্ধ করে যাব। [৫]

ইবনে আসীর তার তারিখে কামিলে হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন-

ابْنَهُ سِكِّيرًا خِمِّيرًا، يَلْبَسُ الْحَرِيرَ وَيَضْرِبُ بِالطَّنَابِيرِ

অর্থাৎ তিনি ইয়াযিদের ব্যাপারে বলেন, সে বড়ই নেশাখোর ছিল মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল, সেতারাও বাজাতো।[৬]

আল্লামা হাফেজ ইবনে কাসীর তার বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে উল্লেখ করেন-

وَكَانَ سَبَبُ وَقْعَةِ الحرَّة أنَّ وَفْدًا مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ قَدِمُوا عَلَى يَزِيدَ بْنِ مُعَاوِيَةَ بِدِمَشْقَ –  – –  فلمَّا رَجَعُوا ذَكَرُوا لِأَهْلِيهِمْ عَنْ يَزِيدَ مَا كَانَ يَقَعُ مِنْهُ مِنَ الْقَبَائِحِ فِي شُرْبِهِ الْخَمْرَ، وَمَا يَتْبَعُ ذَلِكَ مِنَ الْفَوَاحِشِ الَّتِي مِنْ أَكْبَرِهَا تَرْكُ الصَّلاة عَنْ وَقْتِهَا، بِسَبَبِ السِّكر، فَاجْتَمَعُوا عَلَى خَلْعِهِ، فَخَلَعُوهُ عِنْدَ الْمِنْبَرِ النَّبوي، فلمَّا بَلَغَهُ ذَلِكَ بَعَثَ إِلَيْهِمْ سَرِيَّةً، يَقْدُمُهَا رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ مُسْلِمُ بْنُ عُقْبَةَ، وإنَّما يُسَمِّيهِ السَّلف: مُسْرِفَ بْنَ عُقْبَةَ، فلمَّا وَرَدَ الْمَدِينَةَ اسْتَبَاحَهَا ثَلَاثَةَ أيام، فقتل في غضون هَذِهِ الْأَيَّامَ بَشَرًا كَثِيرًا

অর্থাৎ হাররার ঘটনার কারণ ছিল এই যে, মদীনা হতে একটি প্রতিনিধি দল ইয়াযিদের নিকট দামেশকে গিয়েছিল,তারা ফিরে এসে নিজেদের লোকদের ইয়াযিদের মদের নেশা ও অন্যান্য মন্দ ও নীচ স্বভাবের ব্যাপারে অবগত করে। তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্বভাব হল সে মদের নেশায় নামায ছেড়ে দিত, মদীনাবাসী ইয়াযিদের এসব অপকর্মের ব্যাপারে জানতে পেরে তার বায়’আত ছেড়ে দেয় এবং মিম্বারে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে সাহাবার হাতে বায়’আতের ঘোষণা দেয়। ইয়াযিদ এ সংবাদ পেয়ে মুসলিম বিন উকবার নেতৃত্বে মদীনাবাসীর বিরুদ্ধে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে। সালফে সালেহীন তাকে মুসরিফ(সীমালঙ্ঘনকারী) বিন উকবা বলে অবিহিত করেন। এই অভিশপ্ত সৈন্যদল মদিনা মুনাওয়ারাকে তিন দিনের জন্য সম্পূর্ণ মুবাহ ঘোষণা করে তিন দিন পর্যন্ত মদীনাবাসীর জান-মাল ও ইজ্জতের উপর হামলা চালায়। এই সময়ে বহু সাহাবা, তাবেঈ ও সাধারণ মুসলমান তাদের হাতে শহীদ হয়। [৭]

ইমাম বায়হাক্বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ তার দালায়িলুন নবুওয়াহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন-

عَنْ مُغِيرَةَ قَالَ: أَنْهَبَ مُسْرِفُ بْنُ عُقْبَةَ الْمَدِينَةَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَزَعَمَ الْمُغِيرَةُ أَنَّهُ افْتُضَّ فِيهَا أَلْفُ عَذْرَاءَ

হযরত মুগীরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসরিফ বিন উকবা তিন দিন পর্যন্ত পবিত্র মদীনায় লুঠপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং প্রায় এক হাজার পবিত্র দ্বীনদার মুসলিম রমনীদের ইজ্জত নষ্ট করে। [৮]

যেখানে মদীনাবাসীকে ভীত সন্ত্রস্ত করার কারণে হাদীস শরীফে কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ হয়েছে। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়-

عَنِ السَّائِبِ بْنِ خَلَّادٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ أَخَافَ أَهْلَ الْمَدِينَةِ أَخَافَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ وَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لَا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفًا وَلَا عَدْلًا

অর্থাৎ হযরত সায়িব বিন খাল্লাদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে মদীনাবাসীদের ভীত সন্ত্রস্ত করবে, আল্লাহ তা’আলা তকেও ভীত সন্ত্রস্ত করবেন । আর তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানবজাতির অভিসম্পাত। কিয়ামতের দিন তার না কোন ফরজ ইবাদত গ্রহণ করা হবে, না কোন নফল ইবাদত। [৯]

এ থেকেই সহজেই অনুমান করা যায় যে, ঐ ব্যক্তির পরিণাম কি হতে পারে, যে মদীনাবাসীকে শুধুই ভীত করেনি বরং মদীনা শরীফকে অপবিত্র করেছে, হত্যা,লুন্ঠন ইজ্জতহানী করেছে, মসজিদে নববীকে ঘোড়ার আস্তাবল বানিয়েছে ।

আকাঈদের প্রাথমিক মৌলিক গ্রন্থ শরহে আকাঈদে নাসাফিয়্যাহ তে উল্লেখ হয়-

وبعضهم أطلق اللعن عليه، لما أنَّه كفر حين أمر بقتل الحسين ، واتَّفقوا على جواز اللعن على من قتله، أو أمر به، أو أجازه، أو رضي به. والحقّ: إنَّ رضى يزيد بقتل الحسين واستبشاره بذلك، وإهانته أهل بيت رسول الله صلى الله عليه وسلم ممَّا تواتر معناه، وإن كانت تفاصيله آحاداً، فنحن لا نتوقَّف في شأنه، بل في إيمانه، لعنة الله عليه وعلى أنصاره وأعوانه

অর্থাৎ কতেক আলেম ইয়াযিদের প্রতি লা’নত দিয়েছেন। কারণ সে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে কুফরী কর্ম করেছে। উলামা কেরাম ঐ ব্যক্তিকে লানত দেয়া জায়েয হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, যে ব্যক্তি ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যা করেছে বা হত্যার নির্দেশ দিয়েছে কিংবা অনুমতি দিয়েছে এবং তাতে সন্তুষ্ট হয়েছে । সঠিক কথা হল, ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হত্যার ব্যাপারে ইয়াযিদের সন্তুষ্টি ছিল। (ফলে তার উপর লানত দেয়া যায়) তাঁর ( ইমাম পাকের) শাহাদাতের সংবাদ পেয়ে ইয়াযিদের আনন্দিত হওয়া এবং সরকারে দো আলম নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বংশধরগণের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা ও তাঁদের অপমান করার বিষয়ে এমন অনেক বর্ণনা আছে, যা অর্থের দিক থেকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌছেছে যদিও পৃথক পৃথকভাবে খবরে ওয়াহেদ। আমরা ইয়াযিদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করব না, বরং তার ঈমান সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করি। আল্লাহ তা’আলা ইয়াজিদ, তার সহযোগী ও দলবলের ওপর অভিসম্পাত বর্ষণ করুক। [১০]

উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ হতে বুঝা যায় যে, পাপীষ্ঠ ও বদবখত, ফাসিক-ফাজির, ফিতনাবাজ ও বিদ’আতী, সুন্নাতকে পরিবর্তনকারী, দ্বীনে বাঁধা প্রদানকারী, হারমাইন শরীফের পবিত্রতা বিনষ্টকারী, আহলে বাইত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি বিদ্বেষ ও অসৌজন্যতা প্রদর্শনকারী এমন একজন ব্যক্তির জন্য রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ও আমীরুল মু’মিনীন ব্যবহার এই উপাধি এবং দোয়াকে অপমান ও দুর্নাম করা হবে। এটি ইসলামী আমল ও আদবের বিপরীত। এরূপ কাজ গোমরাহী ও ভ্রষ্টতার নিদর্শন। এটি সুন্নাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেলাফ তথা পরিপন্থী।

হাদিস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে-

  عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ وَقَّرَ صَاحِبَ بِدْعَةٍ فَقَدْ أَعَانَ عَلَى هَدْمِ الْإِسْلَامِ

অর্থাৎ উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন বিদ’আতীকে সম্মান করল, সে ইসলামকে ধ্বংস করায় সহায়তা করল। [১১]

ইমাম বায়হাক্বীর শো’আবুল ঈমানে বর্ণিত হয়-

عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِذَا مُدِحَ الْفَاسِقُ غَضِبَ الرَّبُّ، وَاهْتَزَّ لَهُ الْعَرْشُ

অর্থাৎ হযরত আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন কোন ফাসিক ব্যক্তির প্রশংসা করা হয় তখন রাব্বুল আলামীন তাতে অসন্তুষ্ট হোন এবং তার আরশ কেঁপে উঠে। [১২]

ন্যয়পরায়ণ শাসক হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইয়াযিদকে আমীরুল মু’মিনীন বলা হলে শাস্তি প্রয়োগ করতেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার তারিখুল খুলাফা গ্রন্থে উল্লেখ করেন-

عَنْ نَوْفَلِ بْنِ أَبِي الْفُرَاتِ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ، فَذَكَرَ رَجُلٌ يَزِيدَ فَقَالَ: قَالَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ يَزِيدُ بْنُ مُعَاوِيَةَ، فَقَالَ: تَقُولُ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ! وَأَمَرَ بِهِ فَضُرِبَ عِشْرِينَ سَوْطًا

অর্থাৎ হযরত নওফল বিন আবি ফিরায়াত রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে, একবার তিনি খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের দরবারে বসেছিলেন; এমন সময় এক লোক ইয়াযিদকে ‘আমীরুল মু’মিনীন’ খেতাবে সম্বোধন করে। (এতে খলীফা রাগান্বিত হয়ে)তাকে বলেন, “তুমি এই ব্যক্তিকে ’আমীরুল মু’মিনীন’ বলছো?” অতঃপর তিনি ওই লোককে ২০টি দোররা মারার আদেশ দেন। [১৩]

তথ্যপঞ্জিঃ

=====

১. মুসনাদে আবু ইয়ালা ২:১৭৬ হাদীস-৮৭০,৮৭১ দারুল মামুন লিত তুরাস দামেশক [প্রকাশঃ ১৯৮৪], মুসনাদে বাযযার-১২৮৪, বায়হাক্বী দালায়িলুন নবুওয়াহ ৬:৪৬৭ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত ।

২. সওয়ায়িকুল মুহাররিকাহ ২:৬৩৩ মুয়াসসাতুর রিসালাহ লেবানন, ইবনে আসাকির তারিখে দামেশক ৬৫:২৫০ দারুল ফিকর, সিয়ারু আ’লামুন নুবলা ৩:২০০ দারুল হাদীস কায়রো ।

৩. সহীহ আল বুখারী, কিতাবুল ফিতন হাদীস নং-৭০৫৮/৬৬৪৯, মুসনাদে আহমদ-৮৪০৪ ।

৪. আসকালানী ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী ১৩:১০ হাদীস-৭০৫৮ দারুল মা’রেফাহ বৈরুত ।

৫. ইবনে সা’দ আত ত্ববকাতুল কুবরা ৫:৬৬ দারু সাদির বৈরুত, ৫:৪৯ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত।

৬. ইবনে আসীর তারিখে কামিল ৩:৮২ দারুল কিতাবুল আরাবী বৈরুত [প্রকাশঃ ১৯৯৭]

৭. ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,৬:২৬২ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত, ৬:২৩৩ দারুল ফিকর বৈরুত ।

৮. দালায়িলুন নবুওয়াহ ৬:৪৭৫ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত ।

৯. মুসনাদে আহমদ ২৭:৯৪ হাদীস-১৬৫৫৯ মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ [প্রকাশঃ ২০০১], সুয়ূতী জামেউল আহাদীস-৪৫৩৭৪ ।

১০.শরহু আকায়িদিন নাসাফিয়্যাহ ১০২/১১৭/১৩৭ পৃঃ ।

১১. তাবরানী আল মু’জামুল আওসাত ৭:৩৫ হাদীস-৬৭৭২ দারুল হারমাইন কায়রো ।

১২. বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান ৬:৫১১ হাদীস-৪৫৪৪ ।

১৩. সুয়ূতী তারিখুল খুলাফা ১৫৮ পৃঃ (ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া অধ্যায়), যাহাবী তারিখুল ইসলাম ৫:২৭৫ দারুল কুতুবিল আরাবী বৈরুত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *