সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > আদব ও শিষ্টাচার > মাদকাসক্তি ও আমাদের করণীয়

মাদকাসক্তি ও আমাদের করণীয়

আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আযহারী

[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু লা সাইয়্যিদিল মুরসালিন ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমাঈন,আম্মা বাদ]

মানবসভ্যতার প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টিকারী অন্যতম অভিশাপ মাদকাসক্তি। মাদকদ্রব্যের নেশার ছোবল এমনই ভয়ানক যে তা ব্যক্তিকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে না; তার সমগ্র জীবন ধ্বংস করে দেয়। মাদক কেবল সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে না; সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেও বিপন্ন করে।

কুরআনে মাদকদ্রব্যের আরবী শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘খামর’ বা ‘খিমার’ শব্দটি যার অর্থ আবৃত করা, আচ্ছাদিত করা বা ঢেকে ফেলা। হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “মদ হচ্ছে তাই,যা মানেুষর বিবেক বা বোধশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে বা বিবেককে ঢেকে দেয়” (বুখারী -৪৬১৯)।

আর বিবেক হচ্ছে সেই জিনিষ যা ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ধারণে সহায়তা করে। যখন একজন মানুষ মদ বা নেশা জাতিয় জিনিষ পান করে বা খায় তার মস্তিষ্ক প্রায় অচল হয়ে পড়ে। নেশার রাজ্যে রকমারি অপকর্ম করতে সে এতোই ব্যস্ত থাকে যে তার সাথে জাগ্রত মন- মেজাজের যোগাযোগ থাকেনা। ফলে ঠিক বা বেঠিকের পার্থক্য গোচরীভুত হয়না। এই সময়টার জন্য শয়তান অপেক্ষা করে, তখন শয়তান তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করিয়ে নিতে পারে।

অতএব মদ্যপানের ফলে বিবেক যখন আচ্ছন্ন হয়ে যায় তখন মানুষ যেকোন ধরনের অন্যায়, অশ্লীল ও মন্দ কাজ করতে পারে এবং এতে সে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিতবোধ করে না

মাদক কেবল একক অপরাধ নয়, মাদকাসক্তির সঙ্গে সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে মানুষের অন্তরে মাদকের ক্ষতির অনুভূতি জাগ্রত করে রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা মাদক ও নেশা থেকে দূরে থাক, কেননা এটা সব অপকর্ম ও অশ্লীলতার মূল। আর কোনো নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি ঈমানদার হতে পারে না।’ (মুসলিম)

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ব্যভিচারী যে সময় ব্যভিচার করে সে সময় সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ্যপান করে তখন সে মুমিন থাকে না। ’’

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ার শরাব পান করবে, সে পরকালে জান্নাতের শারাবান তহুরা থেকে বঞ্চিত থাকবে।’ (বুখারী, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজা)

মাদকদ্রব্য বলতে কেবলমাত্র মদ নামে প্রচলিত দ্রব্যাদিকে বুঝায় না। নেশা জাতীয় সকল দ্রব্য এর অধীন। পরিমাণে অল্প হোক আর বেশি হোক-পান বা অন্য কোনোভাবে গ্রহণ করা হোক, নেশা ও চিত্ত-বিভ্রমক হলেই তা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “সমস্ত নেশাকারী বস্তু মদ আর প্রত্যেক নেশাকারী বস্তু হারাম।” (মুসলিম হা/৩৭৩৩)

তিনি আরো বলেন, “যে সমস্ত পানীয় নেশাকারী তা হারাম।” (বুখারী হা/২৩৫, মুসলিম হা/৩৭২৭) তিনি আরো বলেনঃ “যার অধিক সেবন নেশা নিয়ে আসে তার অল্পও হারাম।” (আবু দাউদ হা/৩১৯৬ তিরমিযী হা/ ১৭৮৮ ইবনু মাজাহ্ হা/ ৩৩৮৪)

মানবজাতির ভাল বা মন্দ কিসে নিহিত আছে তা স্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা ভালভাবেই জানেন। তাই তিনি সকল মন্দ থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে বার বার সাবধান করে দিয়েছেন। বর্তমানে মাদকাসক্তি একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, যা সমাজ তথা গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সর্বনাশা নেশার কবলে পড়ে যে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

মাদকাসক্ত অবস্থায় এবং নেশার চাহিদা মেটাতে গিয়ে একজন মানুষ বিবেকশুন্য হয়ে যায়। তখন সে অতি সহজেই চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, জেনা ও ব্যভিচার সহ নানা রকম অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। ফলে একদিকে যেমন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে, তেমনি লাগামহীন অবৈধ সম্পর্ক এবং ‘এইডস্‌’ সহ নানা রকম সংক্রামক রোগের প্রকপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই এগুলোকে ঘৃন্যবস্তু ও শয়তানের কাজ বলা হয়েছে।

“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃন্যবস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায়, এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও নামাজে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত হবে না [সূরা মায়েদা:৯০-৯১]

এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,. ‘মদ পান করো না। কেননা তা সকল অপকর্মের চাবিকাঠি’। অন্য হাদীছে এসেছে, ‘তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক। কেননা তা অশ্লীল কাজের মূল’

মাদকের করাল গ্রাসে তরুণ সমাজ আজ সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল কাজে মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞার আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে না।উপরন্তু কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতসহ আল্লাহ তায়ালার বিধিবদ্ধ দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত থেকে দূরে রাখে এবং পাপাচারে লিপ্ত করে।

এ মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে পারসপরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়, তবু কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-৯১)

অতএব এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে মদ ও মদ্যপানকারীর আচরনের কুপ্রভাবে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈরিতা সৃষ্টি করে যার ফলে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা, কলহ-বিবাদ ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তাছাড়া আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায় যে সমাজের মধ্যে যে বড় বড় অপরাধগুলো যেমন খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ ইত্যাদি সংগঠিত হয়, তার সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তের সাথে জড়িত।

মদ্যপান ও মাদকদ্রব্য সেবন জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে যা আমাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তা’আলা হলেন আমাদের জীবনের মালিক এবং মানুষ হিসেবে আমদের জীবনকে ধবংসের দিকে ঠেলে দেয়াকে আল্লাহ তা’আলা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- “তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না” (সূরা বাকারা- ১৯৫)। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। (সুরা নিসা-২৯)।

মদের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অভিসম্পাত: শুধু মদ্যপায়ী ও বিক্রেতা নয়, বরং মদ ও মাদকদ্রব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ১০ (দশ) শ্রেণীর লোকের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ করেছেন।। তারা হলো-১. মদপানকারী, ২. মাদক প্রস্তুতকারক ৩. মাদক প্রস্তুতের উপদেষ্টা, ৪. মাদক বহনকারী, ৫. যার কাছে মাদক বহন করা হয় ৬. যে মাদক পান করায়, ৭. মাদকবিক্রেতা, ৮. মাদকের মূল্য গ্রহণকারী ৯. মাদক ক্রয়-বিক্রয়কারী, ১০. যার জন্য মাদক ক্রয় করা হয় (তিরমিজি)

এখানেই শেষ নয়, মাদকদ্রব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা তো চরম অপরাধ ও নিষিদ্ধই, এমনকি যে মজলিশে মাদক সেবন করা হয়, সে মজলিশে উপস্থিত থাকাও নিষিদ্ধ ও চরম ঘৃণ্য। এ ব্যাপারে রহমতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে, কঠোর হুঁশিয়ারি।

 

Part: 2

আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আযহারী

 

[বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা সাইয়্যিদিল মুরসালিন ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমাঈন,আম্মা বাদ]

পবিত্র বা হালাল বস্তু মানুষের দেহ ও মনকে সংকীর্ণতা থেকে বাচিয়ে রাখে, উদার ও মানব কল্যাণে কাজ করার সহায়ক ও অনুভূতিশীল করে তোলে। হারাম বস্তু মানুষকে বিপদগামী করে, স্বার্থপর করে তোলে। আর যা অকল্যাণকর তা বর্জন করতে হবে। মানুষের প্রয়োজন মেটানো ও উপকারার্থে প্রয়োজন এমন হালাল দ্রব্যকে ব্যবহারের অনুমতি এবং মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, পবিত্র, উত্তম ও উপাদেয় তা তিনি হালাল করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘তোমাদের যা দান করেছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর এবং এ বিষয়ে সীমালংঘন করো না।’’ (সুরা তাহা-৮১)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে রাসূল!) তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে তাদের জন্য কি হালাল করা হয়েছে? আপনি বলে দিন তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করা হয়েছে। (আল মায়েদাহঃ ৪)

মহান আল্লাহ নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “তিনি তাদেরকে ন্যায়ের আদেশ করেন এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করেন। এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং তাদের উপর খারাপ বস্তু হারাম করেন।” (আল্ আরাফঃ ১৫৭)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে রাসূল!) “আপনি বলে দিন, যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে তার মধ্যে কোন হারাম খাদ্য আমি পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্য, যা সে ভক্ষন করে; কিন্তু মৃত বা প্রবাহিত রক্ত অথবা শূকরের মাংস – কেননা এ সব অপবিত্র – অথবা যা অবৈধ আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে, তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে তোমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।(সূরা আনয়াম: ১৪৫)

মদ বা মাদকদ্রব্য ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়। মাদকাসক্তরা সমাজে নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত হয়ে থাকে। তাদের সুস্থ বিবেক থাকেনা, মানসিকতায় নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ইসলাম সুস্থ বিবেক ও মানসিক উৎকর্ষ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ করে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায়, অর্থের অপচয় হয়, স্বাভাবিক জীবন যাপনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এমন কোনো দ্রব্য গ্রহণ ইসলামের আদর্শবিরোধী।

মদ পান করলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও বিবেচনা শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। তার জন্য যে আর মদ পান করা উচিৎ নয়, এ বোধটুকুও মাদকাসক্ত ব্যক্তি হারিয়ে ফেলে। তার নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বিচার-বিবেচনা ছাড়াই সে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে থাকে। নিজের শরীর, সন্তান-সন্ততি, পরিবার, ভবিষ্যৎ বংশধর এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এজন্য চরম ক্ষতিকর মাদকদ্রব্যকে হারাম করেছেন।
তাই সূরা মায়েদাহ এর (০৫ : ৯০) নং আয়াতে এগুলোকে ঘৃন্যবস্তু ও শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। মাদক ও জুয়ার নেশার মন্দ স্বভাব থেকে দূরে থাকার সাথে সাথে এর ভয়ংকর প্রভাব থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য সর্বজ্ঞ আল্লাহতায়ালা ঐশীবাণী প্রেরণের মাধ্যমে বারবার সাবধান করে দিয়েছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘নিজের ক্ষতি করবে না, অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।’’ (আহমদ, ইবনে মাজাহ)

হালাল খাদ্য ছাড়া কোন কিছু পান করা বা খাওয়া ইসলামে হারাম করা হয়েছে। মুসলমানের জন্য যা ইচ্ছা তা খাওয়ার সুযোগ নেই। যে কোন কাজে অর্থ ব্যয় করার অধিকার নেই। নিজের ইচ্ছা মত কোন কিছু করারও উপায় নেই।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘অনুগ্রহের খোঁটাদানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং সদা মদ্যপানকারী জান্নাতে যাবে না।’’ (নসাঈ ও আহমদ)

এক ব্যক্তি ইয়ামন দেশ হতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কাছে আসলেন এবং ‘মিযর’ নামে এক মদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,‘‘তাতে কি নেশা হয়? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নেশা সৃষ্টিকারী এমন প্রত্যেক জিনিসই হারাম। আর নেশাকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ ‘তীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের গায়ের ঘাম অথবা রক্ত ও পুঁজ পান করাবেন।’’ (মুসলিম, মিশকাত/৩১৭)

  • মদ্যপের ৪০ দিনের নামাজ কবুল হয় না

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নেশাদার দ্রব্য পান করবে আল্লাহ তার ৪০ দিন নামাজ কবুল করবেন না। যদি এ অবস্থায় মারা যায় তাহ’লে জাহান্নামে যাবে। যদি তওবাহ করে তাহ’লে আল্লাহ তার তওবাহ কবুল করবেন।

  • মদপানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সর্বদা মদ পানকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৬, )

হজরত ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন – তিন শ্রেনীর লোকদের জন্য আল্লাহ্‌ বেহেশত হারাম করে দিয়েছেন। নিত্য মদপানকারী (মদ্যপায়ী), পিতা-মাতার নাফারমান-অবাধ্য লোক এবং দাইউস্‌ অর্থাৎ যে লোক তার পরিবারের কুকর্মকে স্বীকৃতি দেয় –( আহমাদ, নাসায়ী, মিশকাত)।

  • মদ্যপান করা আর মূর্তিপূজা করা এ দুইয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই

হজরত আবু মুসা আশ্‌আরী বলতেন, আমার নিকিট এ দু’য়ের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই, আমি মদ পান করব অথবা আল্লাহ্‌কে বাদ দিয়ে এ খুঁটির (দেবী-মূর্তির) পূজা করব (নাসায়ী,)।

  • ক্বিয়ামতের পূর্বে মদের ব্যাপকতা 

ক্বিয়ামতের পূর্বে মাদকতা এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে যে মদ পানকারীরা তা পান করাকে অপরাধ মনে করবে না। হাদীছে এসেছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, ‘ক্বিয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে রয়েছে, ইলম উঠে যাবে, মূর্খতা, ব্যভিচার ও মদ্যপান বেড়ে যাবে। পুরুষের সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং নারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। এমনকি পঞ্চাশ জন মহিলার পরিচালক হবে একজন পুরুষ’।(মিশকাত হা/৫৪৩৭, ‘ফিতান’)

শুধু তাই নয়; শেষ যামানায় মানুষ মদকে বিভিন্ন নামের ছদ্মাবরণে পান করবে বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।(ইবনু মাজাহ হা/৩৩৮৪, )

মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তো নিষিদ্ধই, যে মজলিসে মদপান করা হয় ওই মজলিসে উপস্থিত থাকাও নিষিদ্ধ। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে সে যেন ওই দস্তরখানে না বসে যাতে মদ পান করা হয়।’(দারিমি, মুসতাদরাক )

ওমর ইবনে আবদুল আজিয রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে শরাব পানকারী কিছু লোককে হাজির করা হলো। তিনি তাদের প্রহারের আদেশ দিলেন। বলা হল এদের মধ্যে একজন আছে, যে ‘সাইম’ (অর্থাৎ মজলিসে উপস্থিত থাকলেও সে মদ পান করেনি)। তিনি বললেন, ওকে দিয়েই শুরু কর। এরপর তার দিকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি কোরআনের এ আয়াত শোননি-তিনি তো কিতাবে তোমাদের প্রতি (এ বিধান) নাজিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং তার সঙ্গে বিদ্রুপ করা হচ্ছে তখন তাদের সঙ্গে বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো (গণ্য) হবে …(নিসা ৪ : ১৪০)

অতএব, সমস্ত মুসলিমের উপর ওয়াজিব হল, যাবতীয় নেশা জাতীয় বস্তু থেকে নিজে সতর্ক থাকা ও অপরকে তা থেকে সতর্ক করা এবং যে তাতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে তার কর্তব্য আল্লাহর নিকট তাওবাহ করা। বস্তুতঃ যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে তাওবাহ করে আল্লাহ তার তাওবাহ গ্রহণ করেন। এরশাদ হচ্ছেঃ “আর তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ কর হে মুমিনগণ! যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা আন্ নূরঃ ৩১)

মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনগণ আল্লাহর নিকট তোমরা তাওবাহ কর তবেই তোমরা সফলকাম হবে।” (সূরা নূরঃ ৩১) তিনি আরো বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধভাবে তাওবা কর।” (সূরা তাহরীমঃ ৮) তিনি আরো বলেনঃ “নিশ্চয় আমি ক্ষমাশীল ঐ ব্যক্তির জন্য যে তাওবাহ করে ,ঈমান আনে অতঃপর সঠিক পথে চলে।” (ত্বাহাঃ ৮২)

“অতঃপর যারা অজ্ঞতাবশত কোন গুনাহের কাজ করলো, এরপর (অন্যায় বুঝতে পেরে) তওবা করে নিল এবং নিজেদেরকে সংশোধনও করে নিল, তোমার মালিক অবশ্যই এরপর তাদের জন্য ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।“ (১৬ : ১১৯)

মুক্তির একমাত্র উপায় ইসলাম। যে সমাজে ইসলামের আলো প্রথম বিকশিত হয়েছিল, সে সমাজে মাদক ছিল জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাদক ছাড়া আরব্য আভিজাত্য ও সংস্কৃতির কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। অথচ ইসলামের কল্যাণে সেই সমাজ থেকে মাদক ও মাদকের ব্যবহার শুধু নির্মূলই হলো না, চরম ঘৃণিত ও অপবিত্র বস্তুতে পরিণত হলো। আর মাদকাসক্ত সমাজের চোখে চরম ঘৃণিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত ও দন্ডপ্রাপ্ত আসামির স্থানে নেমে এল। মাদকের বিষয়ে মদিনা সমাজের এই আমূল পরিবর্তন একমাত্র ইসলাম ও ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এরই অবদান।

 

Check Also

ইসলামে স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম

আল্লাহ তায়ালা আশরাফুল মাখলুকাত মানুষকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ একটি নেয়ামতের নাম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *