সাম্প্রতিক আপডেটঃ

মাওলা আলী রা.’র ভালোবাসার আড়ালে হজরত আমীরে মুয়াবিয়া রা.’র অসম্মানকারীদের উদ্দেশ্যে

শায়েখ ড. আল্লামা ফয়েজ আহমদ চিশতী 

অনুবাদঃ মাওলানা মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

হজরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মর্যাদা প্রকাশ ফজীলত বর্ণনা মানে এই নয় যে, তাঁকে হজরত মাওলা আলী মুশকিল কুশা শেরে খোদা খায়বার শেকান (খায়বার দুর্গকে চুর্নবিচুর্ন কারী) রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে শ্রেষ্ঠ, মর্যাদাপ্রাপ্ত, সম্মানিত বা বরাবর মনে করবে, অসম্ভব এটা কখনই নয়। আল্লাহ আয্‌যা ওয়া জাল্লাহ মাওলায়ে কায়েনাত সায়্যিদিনা আলী মুরতাজা কাররামাল্লাহু তা’আলা ওয়াজহাহুর সদকায় আমাদের ঈমান ও সুন্নীয়তকে হিফাজত করুন, সকল ফিতনা ফ্যাসাদ হতে নিরাপদ রাখুন, আমীন।

আকাঈদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের কিতাবাদিতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ হয় যে মুশাজারাতে সাহাবা কেরাম (পারস্পরিক মতবিরোধ) আলাইহিমুর রিদ্বওয়ানের ক্ষেত্রে নিরব থাকা চাই। এ প্রসঙ্গে আমাদের আকিদাও তাই যা আ’লা হজরত ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত ইমাম আহমদ রজা খান ফাজেলে বেরলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু উনার অবস্থান (মর্যাদার ক্রমে) উনাদের (আশরায়ে মুবাশ্‌শারাহ ও অন্যান্য আকাবীর) পরে। আর হজরত আলী মুরতাজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বুলন্দ অবস্থান, শ্রেষ্ঠত্ব, শান ও মর্যাদার সাথে তাঁর (মু’আবিয়া) পার্থক্য এতই বিশাল যে, হাজারো বিদ্যুৎগতির ঘোড়া যারা অবিরাম বাতাসের ন্যায় তীব্র গতিতে পথ অতিক্রম করে, এরাও সে পথ (মর্যাদার) অতিক্রম করতে ক্ষান্ত হবে ও পরাস্ত হবে। কিন্তু সাহাবিয়তের ফজীলত, সৌভাগ্য, মর্যাদা ও মাহাত্ম্য এটা আল্লাহর দান (যা মুসলমানগণ অগ্রাহ্য করতে পারবে না, বাড়াবাড়ি করতে পারবে না আর তাঁদের উপর অপবাদ অভিযোগ বা তাঁদের অমর্যাদা ও তাঁদের দোষত্রুটি অন্বেষণ সম্মানহানি কীভাবে করতে পারে, মুমিন তা সহ্য করতে পারে না।) [১]

এখানে আ’লা হজরত রাহমাতুল্লাহি আলাইহ মাওলায়ে কায়েনাত মাওলা আলী কাররামাল্লাহু তা’আলা ওয়াজহাহু ও আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মাঝে ফজীলত, মর্যাদা ও মরতবার যে বিশাল ফারাক তা বর্ণনা করেছেন। তিনি এই ফারাক এভাবে তুলে ধরেন যে, তীব্রগতি সম্পন্ন ঘোড়া যার গতি তুফান বা বিজলীর ন্যায়, সে হাজার বছর ধরে একই গতিতে দৌড়াতে থাকেলেও হজরত মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর উচ্চ অবস্থানে পৌছাতে সক্ষম হবে না। এক কথায় তিনি ফজীলতের দিক থেকে মাওলায়ে কায়েনাত হতে যোজন যোজন দূরে। কেননা সে সময়ে রাফেজীরা হজরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর নাম নিয়ে নানা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অপবাদ ও বহু বাজে কথা বলে বেড়াত, তো আমাদের উপর এখন আবশ্যক হয়ে যায় যে হজরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর যে বৈশিষ্ট, তাঁর ফজীলত কেমন তা তাঁর প্রশংসায় বর্ণনা করা। এমনকি যে-ই সাহাবীর মর্যাদায় আঘাত আসবে সেই সাহাবীর বৈশিষ্টাবলি, তাঁর মর্যাদা ও অবস্থান কেমন তা তুলে ধরা। আর তাঁদের মর্যাদা ও মরতবায় পার্থক্য তেমনই যেমনটি আ’লা হজরত ইমাম আহমদ রজা খান ক্বাদেরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ আপন মহিমায় বর্ণনা করেন:

فرق مراتب بے شمار                      اور حق بدست حیدر کرار

مگر معاویہ بھی ہمارے سردار                    طعن ان پر بھی کار فجار

মর্যাদা ও মাহাত্ম্যে পার্থক্য ঢের, আর হক সেতো হায়দারে কাররারের হাতেই।

তবে মু’আবিয়াও আমাদের সরদার, একমাত্র ফাসিক ফাজিরই তাঁর নামে অপবাদ দেয়।

যে ব্যক্তি হজরত মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর পক্ষাবলম্বন ও প্রশংসা করতে গিয়ে (আল্লাহ মাফ করুন) হজরত আলী আসাদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর প্রাধান্য, শেষ্ঠত্ব, অগ্রগামিতা, সম্মান ও কামালিয়ত হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা উপেক্ষা করে সে ‘নাসেবী’ ইয়াযিদী। আর যে হজরত আলী আসাদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মুহাব্বতে বা মুহাব্বত প্রদর্শন করতে গিয়ে আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সাহাবীয়ত, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার দরবারে তাঁর অবস্থান, হুজুরের সহচর্যকে উপেক্ষা করে সে যায়দী শিয়া। এটাই আদবের প্রকৃতি, এটাই প্রকৃত শিষ্টাচার। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা মধ্যমপন্থা (উক্ত দুই ধারার নই) ও ন্যায়সঙ্গত ধারা অবলম্বনকারী তা থেকে বিচ্ছিন্ন। [২]

আ’লা হজরত রাহমাতুল্লাহি আলাইহ ফরমান, মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হজরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মধ্যকার ফজীলত ও মরতবার ফারাক সীমাহীন, চিন্তাতীত। এখন কেউ যদি আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর পক্ষালম্বন করতে গিয়ে, তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে মাওলা আলী কাররামাল্লাহু তা’আলা ওয়াজহাহুর শান-মান উপেক্ষা করে, তাঁর সম্মানহানি করে সে নিশ্চিত নাসেবী ইয়াযিদী। অপরদিকে কেউ মাওলা আলী মুশকিল কুশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর মুহাব্বতের আড়ালে হজরত আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সমালোচনা ও সম্মানহানি করে সে মূলত শিয়া। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা মাসলাকে আহলে সুন্নাত আর আহলে সুন্নাতের মাসলাক হলো ন্যায়পরায়ণতার, সমন্বয়ের যেখানে প্রত্যেক মর্যাদাবান ব্যক্তিকে অপরের বিষেদগার ও সম্মানহানি ব্যতিত মান্য করা হয়। আজ এই জাহিল লোকেরা মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর ভালোবাসার জন্য হজরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর বিদ্বেষকে শর্ত বানিয়ে নিল। আল্লাহ আমাদের আহলে বাইত ও আসহাবে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমের ভালোবাসায় মৃত্যু নসীব করুন, আমীন।

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, হজরত আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মুজতাহিদ ছিলেন। সাহাবা কেরামের মধ্যকার পারস্পরিক মতবিরোধ ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের মাঝে সংঘটিত পারস্পরিক মতবিরোধের ব্যাপারে চুপ থাকা চাই এবং তাঁদের ফজীলত বর্ণনা করতে হবে। এমন নয় যেমন কতেক মুর্খ এটা বুঝেছে যে ফজীলত বর্ণনার সময় নিরব থাকতে হবে। আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁদের বিষয়াবলি আল্লাহর জিম্মায় সোপর্দ, আসুন এবার উলামায়ে আহলে সুন্নাত আলাইহিমুর রাহমাহ কী বলেন তা একটু দেখি।

ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা আবুল হাসান আল আশ’আরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ (ওফাত: ৩২৪ হিজরি) ফরমান:

হজরত মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হজরত মা আয়িশা সিদ্দীকা, হজরত যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমার মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা ইজতিহাদ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হয়েছিল। হজরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ইমাম ছলেন, আর ইনারা সকলে মুজতাহিদ ছিলেন। তাঁদের জন্য হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ ও সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। সুতরাং এটা প্রমাণ করে যে সকলে আপন ইজতিহাদে হক ছিলেন। এমনিভাবে যে যুদ্ধ হজরত মাওলা আলী ও আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমার মাঝে সংঘটিত হয় সেটাও অনুরূপ ছিল, সেটাও তাঁদের বিশ্লেষণ ও ইজতিহাদের দলীল বহন করে। আর সকল সাহাবা ইমাম ও পথিকৃৎ, বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ, দ্বীনে তাঁদের উপর কোনও অভিযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সকলের প্রশংসা করেছেন। আমাদের উপর আবশ্যক যে আমরা তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করব এবং যারা তাঁদের অমর্যাদা করবে, সমালোচনা করবে, নিন্দামন্দ করবে তাদের থেকে নিরাপদ ও বিচ্ছিন্ন থাকা। [৩]

কাজী আবু বকর আল বাক্বিল্লানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ (ওফাত: ৩০৪ হিজরি) ফরমান:

এটা জেনে রাখা আবশ্যক যে, হুজুর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবা কেরাম আলাইহিমুর রিদ্বওয়ানের মধ্যকার পারস্পরিক যে মতবিরোধ দেখা দেয় সে ব্যাপারে নিরব থাকা চাই, মুখ সংযত রাখা চাই। আর তাঁদের সকলের জন্য রহমতের দু’আ করা, প্রত্যেকের প্রশংসা করা, আর আল্লাহর নিকট তাঁদের জন্য নৈকট্য, সন্তুষ্টি, নিরাপত্তা ও জান্নাতের দু’আ করবে। আর এ ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে হজরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এক্ষেত্রে (ইজতিহাদে) সাওয়াবের অধিকারী, তিনি সঠিক তাই এসব ঘটনায় তাঁর জন্য রয়েছে দুটি সাওয়াব। আর সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে যা প্রকাশ পায় তাঁদের ইজতিহাদের দরুন, সুতরাং তাঁদের জন্য একটি সাওয়াব। তাঁদের না ফাসিক বলা যাবে না বিদ’আতি ও পথভ্রষ্ট। আর এর দলীল হলো আল্লাহ পাক কুরআনে ফরমান: (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ) “আল্লাহ তাঁদের উপর রাজী তাঁরাও আল্লাহর উপর।” [৪] আরও ইরশাদ ফরমান:

لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا

নিঃসন্দেহে আল্লাহর সন্তুষ্টি ঐসকল ঈমানদারদের প্রতি, যখন তাঁরা এই গাছের ছায়ায় আপনার হাতে বায়’আত গ্রহণ করে। অতঃপর যা তাঁদের অন্তরে রয়েছে সে সম্পর্কে আল্লাহ অবগত, সুতরাং আল্লাহ তাঁদের উপর আপন করুনা ও প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাঁদেরকে শীঘ্র আগমণকারী বিজয়ের পুরস্কার প্রদান করেছেন। [৫] আর হুজুর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِذَا اجْتَهَدَ الْحَاكِمُ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا اجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ

শাসক বা বিচারক (মুজতাহিদ) যখন ইজতিহাদ করে আর তাঁর নির্নয় যদি সঠিক হয় তবে তাঁর জন্য দুটি সাওয়াব। আর মুজতাহিদ বা শাসক, বিচারক যদি স্বীয় ইজতিহাদে ভুল করে, তবে তাঁর জন্য একটি সাওয়াব। [৬] সুতরাং তাঁদের ইজতিহাদ নিয়ে চিন্তা ধারণার অবতারণা করার কী প্রয়োজন যাদের ব্যাপারে আল্লাহ ফরমান-  رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ

হুজুর সায়্যিদিনা গাউছে আজম শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ (ওফাত: ৫৬১ হিজরি) ফরমান:

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত সাহাবা কেরাম আলাইহিমুর রিদ্বওয়ানের পারস্পরিক মতবিরোধ সম্পর্কে নিরব থাকতে, মুখ বন্ধ রাখার ব্যাপারে, তাঁদের দোষত্রুটি বর্ণনা থেকে বিরত থাকতে আর তাঁদের ফজীলত মর্যাদা প্রকাশ করতে, আর যে মতবিরোধ হজরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হজরত মা আয়িশা, যুবাইর ও আমীর মু’আবিরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল তাঁদের ব্যাপারেও উল্লিখিত নীতি অনুসারে আপন আপন অবস্থান ও মর্যাদা অনুসারে ফজীলত প্রদানের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রদান করেছে। [৮]

সুন্নী মুসলমানদের প্রতি আবেদন, আপনাদের চিন্তিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। হজরত আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে ভালোবাসা, তাঁর পরিচয় তুলে ধরা, তাঁর প্রশংসা করাই আহলে সুন্নাতের আকিদা। এটাই মুতাকাল্লিমীন (কালাম শাস্ত্রবিদ), ফুকাহা ও আকাবির সূফী আলাইহিমুর রাহমাহর আকিদা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনুসৃত পথ।

নিরবতা বিষয়ক ধোঁকা ও বিব্রান্তির জবাব

কাফফে লিসান তথা জবান সংযত রাখা বা নিরব থাকা কেবল সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের (মুশাজারাত) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ফজীলত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে নয়। যদি ফজীলত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কাফফে লিসান তথা নিরবতা অবলম্বনের হুকুম থাকতো তাহলে তো সাহাবা কেরাম আলাইহিমুর রিদ্বওয়ান থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর ফজীলত বর্ণনা করতেন না। যেখানে সাহাবা, তাবেঈ, তাবে তাবেঈন, ফুকাহা ও মুতাকাল্লিমীন, মুজাদ্দিদগণ, আউলিয়া ও সালেহীন এবং হক্কানী উলামা কেরা আলাইহিমুর রাহমাহ তাঁর ফজীলত বর্ণনা করেছেন। তাঁর শান বর্ণনা করে স্বতন্ত্র কিতাবাদি রচিত হয়েছে, আর বিভিন্ন কিতাবে অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে।

‘মিনহাজুল কুরআন’ এর মান্যবর মুফতি আব্দুল কাইয়্যুম খান কাদেরী সাহেব লিখেন: হজরত আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একজন প্রখ্যাত সম্মানিত সাহাবী, কাতিবে ওহী (ওহী লেখক) আর উম্মতের মামা। তাঁর শানে কোনো মুসলমান গোস্তাখি করতে পারে না। নাসেবীরা হজরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর শানে এবং রাফেজীরা হজরত আমী মু’আবিয়া ও অপরাপর সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের শানে বেআদবি করে, মূলত উভয়ই ভ্রান্ত। [৯] মিনহাজের পর্দার অন্তরালে আবৃত কতেক সুন্নী রুপী রাফেজীদের সামনে মিনহাজুল কুরআনের মুফতির ফাতওয়া তুলে ধরা হলো।

এমন কোন সুন্নী আছে যে হজরত সায়্যিদিনা মাওলা আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীমের উচ্চ মর্যাদা সম্বন্ধে অবগত নয়…. আসল ব্যাপার এটাই যে, কতেক লোক সুন্নীদের মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর নামে ব্ল্যাকমেইল করতে চায়, ভীত করতে চায়। যেমনিভাবে কতেক লোক নিজেদের পরিসরে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও অভিশপ্ত পাপিষ্ঠ ইয়াযিদের নামে ব্ল্যাকমেইল করে থাকে। এদের মূল উদ্দেশ্য কেবল সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমের স্মরণ থেকে নিবৃত করা, বাধ সাধা আর সিহাহ সিত্তাহর হাদীস: لَا تَذْكُرُوا مُعَاوِيَةَ إِلَّا بِخَيْرٍ (মু’আবিয়াকে ভালোভাবে স্মরণ কর।) [১০] এর বিরোধিতা করা, বাধ্য করে হলেও।

আপত্তি ও সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্যে নিবেদন যে ইমাম নাবহানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ কৃত ‘আল আসালিবুল বাদী’আহ’ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করুক, যাতে তাদের উদ্ভাবিত দৃষ্টিভঙ্গি যথার্থ হয়ে যায়। আর এটা জেনে নিতে পারে যে উম্মাতের আলিমগণ কেবল কাফির ও ফাসিক আখ্যায়িত করতে বারণ করেনি, আরও কিছু উল্লেখ করেছে।

মিনহাজুল কুরআনের শায়খুল ইসলাম জনাব ড. মুহাম্মদ তাহেরুল কাদেরি সাহেব বলেন, সাহাবা ও আহলে বাইত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের স্মরণ ও আলোচনা হলে যে/যাদের কপাল কুঞ্চিত হয়, চেহারা বেঁকে যায়, সুতরাং এটা হলো ঐ পথভ্রষ্ট লোকদের নিদর্শন যারা ন্যায়পরায়ণতা ও মধ্যপন্থা ত্যাগ করেছে। [১১]

ড. তাহেরুল কাদেরি আরও বলেন: সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি রূপকার্থে, ইশারা ইঙ্গিতে হলেও কুফরি সম্পৃক্তকারী, অপবাদ লেপনকারী, গালিদাতা, নিন্দামন্দকারী ব্যক্তি মুসলমান নয়, সে ইসলামের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। [১২]

এরপর তিনি আরও বলেন: হজরত মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ফরমান, সাবধান আমার ব্যাপারে দুটি দল ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, একদল মুহাব্বতে আমার মরতবা বৃদ্ধিকারী, অপরটি আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী দল। [১৩]

তিনি আরও বলেন: আমাদের দাবী হলো গোস্তাখে রসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং গোস্তাখে সাহাবা ও আহলে বাইত আলাইহিমুর রিদ্বওয়ানকে ফাঁসিতে ঝুলানো হোক, এমন অভিশপ্ত ব্যক্তির বাঁচার অধিকার নেই। [১৪]

এখন মিনহাজুল কুরআনের শায়খুল ইসলাম ড. তাহেরুল কাদেরির বক্তব্য অনুসারে আমাদের দাবী এটাই, সাহাবা ও আহলে বাইত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের শানে গোস্তাখি প্রদর্শনকারী, তাঁদের নিন্দামন্দকারী এদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হোক, ফাঁসিতে ঝোলানো হোক। সাথে তাহের কাদেরি ও অনুসারী বা অনুসারী দাবীকারিদের কাছে প্রশ্ন এখন আপনারা কী বলবেন? আপনাদের সংগঠনের মুফতি সাহেব হজরত আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে একজন সম্মানিত সাহাবী বলেছেন কিনা? মানেন কিনা?

তথ্যসূত্র:

১. ফাতাওয়ায়ে রজভীয়াহ, ২৯/৩৭০ পৃষ্ঠা, রজা ফাউণ্ডেশন, লাহোর।

২. প্রাগুপ্ত, ১০/১৯৯ পৃষ্ঠা।

৩. আল ইবানাহ আন উসূলিদ দিয়ানাহ, ২৬০ পৃষ্ঠা, দারুল আনসার, কায়রো।

৪. সুরা মায়িদাহ: ১১৯, সুরা তাওবাহ: ১০০, সুরা মুজাদালাহ: ২২, সুরা বায়্যিনাহ: ৮।

৫. সুরা ফাতহ: ১৮।

৬. ইমাম আইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ কৃত উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী, ২/১৭১ পৃষ্ঠা, দারু ইহইয়াউত তুরাছিল আরাবী, বৈরুত।

৭. আল ইনসাফ ফী মা ইয়াজিবু ই’তিক্বাদাহু ওয়ালা ইয়াজুযুল জাহলা বিহি, ৬৪ পৃষ্ঠা।

৮. আল গুনিয়্যাতু লিত্বালিবী ত্বারীক্বিল হক্ব, ১/১৬৩ পৃষ্ঠা, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত।

৯. মাহনামাহ (মাসিক) মিনহাজুল কুরআন, জানুয়ারি, ২০১৩।

১০. জামে আত তিরমিযী, আবওয়াবুল মানাক্বিব, ২/২২৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং-৩৮৪৩।

১১. ফালসাফা শাহাদাত, ২৬৩ পৃষ্ঠা।

১২. প্রাগুপ্ত, ২৭০ পৃষ্ঠা।

১৩. প্রাগুপ্ত, ২৬২ পৃষ্ঠা।

১৪. প্রাগুপ্ত, ২৭২ পৃষ্ঠা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *