সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > রোযা ও রমযান সংশ্লিষ্ট > তারাবীহর নামায আট রাকা’ত নয়, বিশ রাকা’ত সুন্নাত

তারাবীহর নামায আট রাকা’ত নয়, বিশ রাকা’ত সুন্নাত

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

পবিত্র রমযান মাসে এশার নামাযের পর বিতরের পূর্বে তারাবীহর নামায আদায় করা হয়, যার সংখ্যা বিশ রাকা’ত । হুযুর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ও তাবেয়ী-তাবে তাবেয়ী আলাইহিমুর রাহমাহর তারাবীহ আদায়ের পদ্ধতি এটাই ছিল । হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তারাবীহ জামাতে আদায়ের পদ্ধতি প্রচলন করেন আর এতে সকলের ইজমাও হয় । হানাফী মাযহাবের মতও বিশ রাকা’ত তারাবীহর প্রতি । কিন্তু লা মাযহাবী গায়রে মুকাল্লিদপন্থীগণ আট রাকা’ত তারাবীহ আদায় করে এবং বিশ রাকা’তকে সুন্নাতের পরিপন্থী বলে প্রচার করে । যখনই এ পবিত্র মাসের আগমণ ঘটে তারা এ সংক্রান্ত ভ্রান্ত প্রোপাগান্ডার প্রচার চালাতে শুরু করে দেয় । তাদের খন্ডনে নিম্নে বিশ রাকা’ত তারাবীহ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হল ।

তারাবীহর সংজ্ঞাঃ

(আরবি শব্দ) তারাবীহ (التَّرَاوِيحُ) যা তারবীহাতুন ( ترويحة) এর বহুবচন, এর অর্থ আরাম করা, বিশ্রাম করা, বিরাম,অবসর ইত্যাদি । কেননা তারাবীহ নামাযের প্রতি চার রাকা’তের পর কিছু সময় আরাম করা হয় তাই একে তারাবীহ বলা হয় ।

সৌদি মুফতি শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল জিবরীন বলেন-

وهذا يفيد السلام من كل ركعتين، وهكذا المنقول عن الصحابة والأئمة في صلاة التراويح ولكنهم كانوا يطيلون القيام والأركان فيستريحون بعد كل أربع ركعات؛ ولذلك سموا هذه الصلاة بالتراويح
এই হাদীস হতে প্রমাণ হয় যে, তারাবীহতে প্রতি দু’রাকা’ত নামাযের পর সালাম ফিরাতে হবে আর সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ও আয়িম্মায়ে কেরাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম হতে তারাবীহ নামাযের এই পদ্ধতিই বর্ণিত হয় । কিন্তু তারা নামাযে দীর্ঘ সময় দন্ডায়মান থাকতেন, তাই তারা প্রতি চার রাকা’ত পর কিছু সময় আরাম করতেন এজন্যই তারা এ নামাযকে তারাবীহ নাম দেন ।[১]

ফাতওয়া উলামায়ে হাদিসে তারাবীহর সংজ্ঞায় বলা হয়-

পবিত্র রমযান মাসের রজনীতে এশার নামাযের পর জামাত সহকারে যে নামায আদায় হয় তাই তারাবীহ । এই নামাযের নাম তারাবীহ এজন্য রাখা হয় , মানুষ এ নামায আদায়ের সময় প্রতি চার রাকাত পর আরাম করে । কেননা তারাবীহ তারবিয়াহ এর বহুবচন আর তারবিয়াহ এর অর্থ হল একবার বিশ্রাম নেয়া ।২ 

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে –
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ 

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে বিতর ব্যতীত বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন ।[৩]

عَنْ يَزِيدَ بْنِ رُومَانَ أَنَّهُ قَالَ:كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي رَمَضَانَ بِثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَةً

হযরত ইয়াযিদ ইবনে রুমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর জামানায় রমজান মাসে লোকজন বিশ এবং তিন রাকাত অর্থাৎ তারাবীহ ও বিতর সহ ২৩ রাকাত নামায পড়তেন ।[৪]

عَنْ يَزِيدَ بْنِ رُومَانَ، قَالَ: كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَنِ عُمَرَ فِي رَمَضَانَ بِثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَةً. وَعَنْ عَلِيٍّ، أَنَّهُ أَمَرَ رَجُلًا يُصَلِّي بِهِمْ فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً. وَهَذَا كَالْإِجْمَاعِ
হযরত ইয়াযিদ ইবনে রুমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর জামানায় রমজান মাসে লোকজন বিশ এবং তিন রাকাত অর্থাৎ তারাবীহ ও বিতর সহ ২৩ রাকাত নামায পড়তেন । আর হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে রেওয়ায়াত আছে তিনি এক ব্যক্তিকে লোকদেরকে বিশ রাক’আত পড়াতে নির্দেশ দিলেন আর উম্মতের ইজমা এর উপরই হয়। [৫]

عَنِ ابْنِ أَبِي الْحَسْنَاءِ، أَنَّ عَلِيًّا أَمَرَ رَجُلًا يُصَلِّي بِهِمْ فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً
ইবনে আবীল হাসনাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম একজন সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ইমাম নিযুক্ত করে বিশ রাকা’ত তারাবীহ পড়ানোর নির্দেশ দিলেন ।[৬]

ইমাম বায়হাক্বীর বর্ণনায় উক্ত হাদিসে (خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ) অর্থাৎ পাঁচ তারবীয়াহ কথা এসেছে । অর্থাৎ পাঁচ তারবীয়াহর সাথে বিশ রাকা’ত নামায আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আমল এর উপরই ।

عَنْ مَالِكٍ، عَنْ دَاوُدَ بْنِ الْحُصَيْنِ، أَنَّهُ سَمِعَ الْأَعْرَجَ يَقُولُ:مَا أَدْرَكْتُ النَّاسَ إِلَّا وَهُمْ يَلْعَنُونَ الْكَفَرَةَ فِي رَمَضَانَ قَالَ:وَكَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ سُورَةَ الْبَقَرَةِ فِي ثَمَانِ رَكَعَاتٍ فَإِذَا قَامَ بِهَا فِي اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً رَأَى النَّاسُ أَنَّهُ قَدْ خَفَّفَ
হযরত মালিক দাউদ বিন হুসাইন হতে তিনি আ’রাজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে শুনেছেন তিনি বলেন, আমি লোকেদের ঐ অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা রমযান মাসে কাফিরদের উপর লা’নত দিতেন [দু’আ কুনুতে] । আর তিনি বলেন, ক্বারী (ইমাম) তারাবীর নামাযে আট রাকা’তে সুরা বাক্বারাহ সম্পূর্ণ শেষ করতেন আর যখন বার রাকা’তে তা পাঠ করা হত লোকেরা মনে করত যে তারা হালকা সংক্ষিপ্ত নামায আদায় করল।[৭]

হাদীসটি মুসান্নাফে আব্দির রাযযাকে নিম্নোক্ত সনদে বর্ণিত হয় –
عَنْ مَالِكٍ، عَنْ دَاوُدَ بْنِ الْحُصَيْنِ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ هُرْمُزٍ [৮]

عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ رُفَيْعٍ قَالَ: كَانَ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ يُصَلِّي بِالنَّاسِ فِي رَمَضَانَ بِالْمَدِينَةِ عِشْرِينَ رَكْعَةً، وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ

তাবেঈ আব্দুল আযীয বিন রুফাই হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মদীনা শরীফে রমযান মাসে বিশ রাকা’ত তারাবীহ পড়াতেন এবং বিতর পড়াতেন তিন রাকা’ত ।[৯]

عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: ” كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً ” قَالَ: ” وَكَانُوا يَقْرَءُونَ بِالْمَئِينِ، وَكَانُوا يَتَوَكَّئُونَ عَلَى عِصِيِّهِمْ فِي عَهْدِ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ مِنْ شِدَّةِ الْقِيَامِ
হযরত সায়িব ইবনে ইয়াযিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে রমযান মাসে লোকেরা (সাহাবা ও তাবেয়ীন) বিশ রাকা’ত তারাবীহ আদায় করত। তিনি আরো বলেছেন যে, তারা নামাযে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ বা দুইশত আয়াত পড়তেন এবং উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর যুগে দীর্ঘ নামাযের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।[১০]

عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: كُنَّا نَقُومُ فِي زَمَنِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرِ، قَالَ النَّوَوِيُّ فِي الْخُلَاصَةِ: إِسْنَادُهُ صَحِيحٌ
হযরত সায়িব ইবনে ইয়াযিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে রমযান মাসে আমরা বিশ রাকা’ত তারাবীহ আদায় করতাম এবং বিতর পড়তাম । ইমাম নববী (র) খুলাসা কিতাবে বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ । [১১]

وروى الْحَارِث بن عبد الرَّحْمَن بن أبي ذُبَاب عَن السَّائِب بن يزِيد، قَالَ: كَانَ الْقيام على عهد عمر بِثَلَاث وَعشْرين رَكْعَة. قَالَ ابْن عبد الْبر: هَذَا مَحْمُول على أَن الثَّلَاث للوتر
হযরত সায়িব ইবনে ইয়াযিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে রমযান মাসে লোকেরা তেইশ রাকা’ত [২০ রাকা’ত তারাবীহ ও তিন রাকা’ত বিতর] নামায আদায় করত । ইবনুল বার (র) বলেন এতে বুঝা যায় বিতর ছিল তিন রাকা’ত ।[১২]

عَنْ عَطَاءٍ، قَالَ: أَدْرَكْتُ النَّاسَ وَهُمْ يُصَلُّونَ ثَلَاثًا وَعِشْرِينَ رَكْعَةً بِالْوِتْرِ
তাবেঈ আতা ইবনে আবী রাবাহ (র) হতে বর্ণিত, আমি লোকদের (সাহাব ও তাবেঈন)এরূপ অবস্থায় পেয়েছি যে, উনারা বিতরসহ তেইশ রাকায়াত তারাবীহ নামায পড়েন ।[১৩]

ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ রাকাত তারাবীহঃ

মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম নববী (র) বলেন-
اعلم أن صلاة التراويح سُنّة باتفاق العلماء، وهي عشرون ركعة، يُسَلِّم من كل ركعتين
জেনে রাখ, তারাবীহর নামায সুন্নাত, আর উলামা কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা বিশ রাকা’ত যার প্রতি দু’রাকাতে একবার সালাম ফেরাতে হয় । [১৪]

বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (র) বলেন-

وَرَوَى مَالِكٌ مِنْ طَرِيقِ يَزِيدَ بْنِ خُصَيْفَةَ عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ عِشْرِينَ رَكْعَةً
সায়িব বিন ইয়াযিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তারাবীহর নামায বিশ রাকা’ত । [১৫]

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (র) বলেন-
التراويح وهي عشرون ركعة وكيفيتها مشهورة وهي سنة مؤكدة
তারাবীহর নামায বিশ রাকা’ত, এর পদ্ধতি প্রসিদ্ধ আর এটা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ।[১৬]

ইমাম মালিক (র) এর মতে-
فَاخْتَارَ مَالِكٌ فِي أَحَدِ قَوْلَيْهِ، وَأَبُو حَنِيفَةَ، وَالشَّافِعِيُّ، وَأَحْمَدُ، وَداود: الْقِيَامَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً سِوَى الْوِتْرِ
ইমাম মালিক (র) তার এক বর্ণনায়, ইমাম আ’জম আবু হানীফা,ইমাম শাফেয়ী,ইমাম আহমদ ও ইমাম দাউদ জাহেরী (র) বিতর ব্যতীত বিশ রাকা’ত তারাবীহর পক্ষে মত দেন । [১৭]

ইমাম শাফেয়ী (র) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল উম্ম’ এ বলেন –

وَرَأَيْتهمْ بِالْمَدِينَةِ يَقُومُونَ بِتِسْعٍ وَثَلَاثِينَ، وَأَحَبُّ إلَيَّ عِشْرُونَ؛ لِأَنَّهُ رُوِيَ عَنْ عُمَرَ وَكَذَلِكَ يَقُومُونَ بِمَكَّةَ وَيُوتِرُونَ بِثَلَاثٍ
ইমাম শাফেয়ী (র) বলেন, আমি মদিনাবাসীদের দেখেছি যে, তারা মাহে রমজানে ৩৯ রাকা’ত তারাবীহ আদায় করত । আর আমার নিকট বিশ রাকা’ত তারাবীহ পছন্দনীয় । কেননা তা হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মত, আর এমনিভাবে মক্কাবাসীরা বিশ রাকা’ত তারাবীহ আদায় করতেন এবং তিন রাকা’ত বিতর করতেন ।[১৮]

ইমাম তিরমিযি (র) তাঁর সুনানে বলেন-

وَأَكْثَرُ أَهْلِ العِلْمِ عَلَى مَا رُوِيَ عَنْ عُمَرَ، وَعَلِيٍّ، وَغَيْرِهِمَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِشْرِينَ رَكْعَةً، وَهُوَ قَوْلُ الثَّوْرِيِّ، وَابْنِ المُبَارَكِ، وَالشَّافِعِيِّ ” وقَالَ الشَّافِعِيُّ: وَهَكَذَا أَدْرَكْتُ بِبَلَدِنَا بِمَكَّةَ يُصَلُّونَ عِشْرِينَ رَكْعَةً
আহলে ইলমের আমল এটার উপর, যা হযরত আলী, উমর ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত আছে অর্থাৎ বিশ রাকাত। এটাই হযরত সুফিয়ান সাওরী, ইবনে মুবারক ও ইমাম শাফেঈর (র) অভিমত। ইমাম শাফেঈ (র) স্বীয় শহর পবিত্র মক্কায় এরই অনুশীলন দেখতে পান অর্থাৎ মুসলমানেরা বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন।[১৯]

ইবনে কুদামা হাম্বলী (র) বলেন-
وَالْمُخْتَارُ عِنْدَ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ، رَحِمَهُ اللَّهُ، فِيهَا عِشْرُونَ رَكْعَ
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আহমদ বিন হাম্বল (র) এর নিকট বিশ রাকা’ত তারাবীহ গ্রহণযোগ্য ছিল । [২০]

বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (র) বর্ণনা করেন-
انَ عبد الله بن مَسْعُود يُصَلِّي لنا فِي شهر رَمَضَان فَيَنْصَرِف وَعَلِيهِ ليل، قَالَ الْأَعْمَش: كَانَ يُصَلِّي عشْرين رَكْعَة ويوتر بِثَلَاث
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রমযান মাসে তারাবীহ পড়াতেন, আর যখন তারাবীহ শেষ হত তখন রাতের একাংশ বাকী থাকত। আ’মাশ (র) বলেন, তার তারাবীহ ছিল বিশ রাকা’ত আর বিতর ছিল তিন রাকা’ত । ২১

وَاحْتج أَصْحَابنَا وَالشَّافِعِيَّة والحنابلة بِمَا رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ بِإِسْنَاد صَحِيح عَن السَّائِب بن يزِيد الصَّحَابِيّ، قَالَ: كَانُوا يقومُونَ على عهد عمر، رَضِي الله تَعَالَى عَنهُ، بِعشْرين رَكْعَة، وعَلى عهد عُثْمَان وَعلي، رَضِي الله تَعَالَى عَنْهُمَا، مثله
হানাফী,শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের ইমামগণ সুনানে বায়হাক্বীতে সহীহ সনদে বর্ণিত এই হাদীস হতে দলীল গ্রহণ করেছেন, হযরত সায়িব বিন ইয়াযিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমরা (সাহাবা ও তাবেয়ী) হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে বিশ রাকা’ত তারাবীহ আদায় করতাম এবং হযরত উসমান ও আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার শাসনামলেও অনুরূপ করতাম । [২২]

وَقَالَ ابْن عبد الْبر: وَهُوَ قَول جُمْهُور الْعلمَاء، وَبِه قَالَ الْكُوفِيُّونَ وَالشَّافِعِيّ وَأكْثر الْفُقَهَاء، وَهُوَ الصَّحِيح عَن أبي بن كَعْب من غير خلاف من الصَّحَابَة
ইবনু আব্দিল বার (র) বলেন, বিশ রাক’আত তারাবীহ জমহুরের অভিমত। এটাই কুফাবাসীগণ, ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও অধিকাংশ ফকীহ বলেছেন। এবং এটাই সহীহ তথা বিশুদ্ধ যা উবাই ইবনে কা’ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। এ ব্যাপারে সাহাবা কেরামের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই ।[২৩]

ইলমে হাদীসের সনদ বিশ্লেষক,মুহাদ্দিস ও ফকীহ আল্লামা ইবনুল বার (র) তারাবীহ সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনার পর লিখেছেন-
وَهَذَا كُلُّهُ يَشْهَدُ بِأَنَّ الرِّوَايَةَ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً وَهْمٌ وَغَلَطٌ وَأَنَّ الصَّحِيحَ ثَلَاثٌ وَعِشْرُونَ وَإِحْدَى وَعِشْرُونَ رَكْعَةً وَاللَّهُ أَعْلَمُ
এ কথা প্রমাণ করে যে, তারাবীহর নামায এগারো রাকা’তের (আট রাকা’ত তারাবীহ+তিন রাকা’ত বিতর) সকল বর্ণনা দুর্বল ও অশুদ্ধ । তবে ২৩ রাকা’ত ও ২১ রাকা’তের বর্ণনাই বিশুদ্ধ ।
وَقَالَ الثَّوْرِيُّ وَأَبُو حَنِيفَةَ وَالشَّافِعِيُّ وَأَحْمَدُ بْنُ دَاوُدَ قِيَامُ رَمَضَانَ عِشْرُونَ رَكْعَةً سِوَى الْوِتْرِ لَا يُقَامُ بِأَكْثَرَ مِنْهَا اسْتِحْبَابًا
আর ইমাম সুফিয়ান সাওরী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে দাউদ (র) বলেছেন, বিতর ব্যতীত তারাবীহ বিশ রাকা’ত । [২৪]

হযরত ইবরাহীম নখয়ী (র) বলেন-
عَنْ إِبْرَاهِيمَ، أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ
লোকেরা রমযান মাসে পাঁচ তারবীয়াহ অথা বিশ রাকা’ত নামায আদায় করত ।২৫

শুতাইর বিন শেকাল (র) যিনি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথী ছিলেন বর্ণনা করেন-
عَنْ شُتَيْرِ بْنِ شَكَلٍ: أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرَ
নিশ্চই তিনি [হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] রমযান মাসে বিশ রাক’আত তারাবীহ ও বিতর পড়াতেন ।[২৬]

হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শিষ্য আবুল খসীব (র) বলেন-
أنبأ أَبُو الْخَصِيبِ قَالَ: كَانَ يَؤُمُّنَا سُوَيْدُ بْنُ غَفَلَةَ فِي رَمَضَانَ فَيُصَلِّي خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ عِشْرِينَ رَكْعَةً
আবুল খসীব বলেন, তাবেঈ সুওয়াইদ বিন গাফলাহ রমজান শরীফে আমাদের সামনে ইমামতি করতেন, আমাদের বিশ রাকা’ত তারাবীহ পড়াতেন । [২৭] নাফি’ বিন উমর (র) হতে বর্ণিত –

عَنْ نَافِعِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ: كَانَ ابْنُ أَبِي مُلَيْكَةَ يُصَلِّي بِنَا فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً
হযরত আবী মালাইকাহ আমাদের রমযান মাসে বিশ রাকা’ত তারাবী পড়াতেন । [২৮]

হাদীসটি সহীহ। হাদীসে ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ ও আবী মালাইকাহ (র) এর মাঝখানে দু’জন রাবী আছেন এবং তারা উভয়ই নির্ভরযোগ্য ।[২৯]

হযরত হারেস (র) যিনি হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শিষ্য ছিলেন তিনি বলেন-
عَنِ الْحَارِثِ: أَنَّهُ كَانَ يَؤُمُّ النَّاسَ فِي رَمَضَانَ بِاللَّيْلِ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً، وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ
নিশ্চই তিনি রমযান মাসে রাতে বিশ রাকা’ত তারাবীহ ও তিন রাকা’ত বিতর আদায় করতেন । [৩০]

হযরত আবুল বুখতারী (র) হতে বর্ণিত-
عَنْ أَبِي الْبَخْتَرِيِّ: أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ، وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ
নিশ্চই তিনি রমযান মাসে পাঁচ তারবিয়াহ সহকারে তারাবীহ পড়তেন এবং তিন রাকা’ত বিতর পড়তেন । [৩১]

তাবে তাবেঈ সাঈদ ইবনে উবায়দ (র) বলেন –
عَنْ سَعِيدِ بْنِ عُبَيْدٍ، أَنَّ عَلِيَّ بْنَ رَبِيعَةَ كَانَ يُصَلِّي بِهِمْ فِي رَمَضَانَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ، وَيُوتِرُ بِثَلَاثٍ
নিশ্চয়ই হযরত আলী ইবনে রাবী’আহ (র) পবিত্র রমজান মাসে লোকদের নিয়ে পাঁচ তারাবীহ তথা বিশ রাকা’ত তারাবীহ ও তিন রাকা’ত বিতর নামায পড়েন। [৩২]

আহলে হাদীস ওয়হাবীদের ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন-
فَإِنَّهُ قَدْ ثَبَتَ أَنَّ أبي بْنَ كَعْبٍ كَانَ يَقُومُ بِالنَّاسِ عِشْرِينَ رَكْعَةً فِي قِيَامِ رَمَضَانَ وَيُوتِرُ بِثَلَاثِ. فَرَأَى كَثِيرٌ مِنْ الْعُلَمَاءِ أَنَّ ذَلِكَ هُوَ السُّنَّةُ؛ لِأَنَّهُ أَقَامَهُ بَيْن الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ
এ বিষয়টি প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রমযানের তারাবীতে মুসল্লিদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। আর এ ব্যাপারে অসংখ্য উলামা কেরাম মত দিয়েছেন যে, নিশ্চই এটা সুন্নাত। কেননা তা মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ।
বিশ রাকাত তারাবীহ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন-

لِمَا ثَبَتَ مِنْ سُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ وَعَمَلِ الْمُسْلِمِينَ
খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ এবং মুসলিম জাতির সম্মিলিত কর্ম দ্বারা এটি প্রমাণিত ।[৩৩]

বিশিষ্ট গায়রে মুকাল্লিদ আলিম আব্দুর রহমান মুবারকপুরী বলেন-
قَدِ ادَّعَى بَعْضُ النَّاسِ أَنَّهُ قَدْ وَقَعَ الْإِجْمَاعُ عَلَى عِشْرِينَ رَكْعَةً فِي عَهْدِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ
কারো কারো দাবী এই যে, হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে বিশ রাকা’ত তারাবীহর উপর ইজমা হয়েছে । [৩৪]

  • গায়রে মুকাল্লিদরা যে হাদীস দ্বারা আট রাকাত তারাবীহ দায় করে এবং বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করে-

سَأَلَ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، كَيْفَ كَانَتْ صَلاَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَمَضَانَ؟ فَقَالَتْ: مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُصَلِّي أَرْبَعًا
হযরত আবু সালমা বিন আব্দুর রহমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এর কাছে জানতে চান নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর রাতের নামায কেমন ‎হত রমযান মাসে? তিনি বললেন,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান ও রমযান ব্যতিত রাতে ১১ রাকাত থেকে বেশি পড়তেন না। [৩৫] এ হাদীস সম্পর্কিত জবাবসমূহঃ

 

একঃ এই হাদীসের উপর গায়রে মুকাল্লিদদেরই আমল নেই। কেননা হাদীসে সারা বছরের নামাযের কথা বলা হয়েছে আর তারাবীহ কেবল রমযান মাসে পড়া হয় অন্য মাসে নয় । তাদের উচিত হবে তারা যেন এর উপর আমল করে সারা বছর তারাবীহ পড়ে নচেৎ এই হাদীসকে তারাবীহর দলীল হিসেবে উপস্থাপন করা ছেড়ে দেয় ।
দুইঃ এই হাদীসে তারাবীহর উল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি অপরদিকে আমাদের উপস্থাপিত দলীলসমূহে তারাবীহ শব্দের উল্লেখ ছিল ।
তিনঃ এই হাদীসের উপর আমল করতে হলে গায়রে মুকাল্লিদদের এক রাকা’ত বিতর পড়া ত্যাগ করতে হবে । কেননা তারাবীহ আট রাকা’ত হলে বিতর থাকে তিন রাকা’ত অথবা বিতর এক রাকা’ত হলে তারাবীহ দশ রাকা’ত । সুতরাং তাদের আট রাকা’তের দাবী ভিত্তিহীন ।
চারঃ তারাবীহর নামায নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবা কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের সামনে আদায় করেছেন আর এ ব্যাপারে প্রশ্ন আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার নিকট করা হল । প্রশ্নকারীর তার নিকট হতে প্রশ্ন করার কারণ হল তিনি তার থেকে কেবল ঐ নামাযের সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন যা হুযুর পাক সারকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সামনে আদায় করেছেন, আর তা হল তাহাজ্জুদ । আর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল ছিল বিতর তাহাজ্জুদের সাথে আদায় করা ।
পাঁচঃ কুরআন মাজীদে ৫৪০ রুকূ আছে যা হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর যুগে লাগানো হয়েছিল । সে সময় নামাযে যে স্থানে রুকূ করা হয় সেখানেই রুকূর চিহ্ন দেয়া হয় । এখন প্রত্যহ বিশ রুকূ তিলাওয়াত করতঃ তেইশ রমযানে কুরআন পাক খতম করা হলে পূর্ণ ৫৪০ রুকূ তিলাওয়াত হয় আর আট রুকু করে তিলাওয়াত হলে ২১৬ রুকূ তিলাওয়াত হয় ।
ছয়ঃ তারাবীহ (التَّرَاوِيحُ) যা তারবীহাতুন ( ترويحة) এর বহুবচন, আর তারবীয়াহ বলা হয় প্রতি চার রাকা’তের পর একবার বিশ্রাম নেয়াকে । আর আরবী ভাষায় বহুবচন তিন ও এর অধিককে ধরা হয় । সুতরাং আট রাকা’তে তারবিয়াহ হয় দু’টি যা তারাবীহ হসেবে গণ্য হয়না । তারাবীহ হতে হলে অন্তত তিন তারবিয়াহ আদায় করতে হবে আর এক্ষেত্রে তাদের আট রাকা’তের দলীল গ্রহণযোগ্যতা হারায় । এখন তারা যদি আট রাকা’ত-ই আদায় করতে চায় তাহলে এই নামাযকে তারাবীহ বলা যাবেনা কেননা তারাবীহ হতে হলে তা তিনের অধিক হতে হবে ।
এভাবে যখন তারা তাদের আক্বিদা প্রমাণে ব্যর্থ হয় তখন তারা এ কথা বলে যে, ইমাম বুখারী (র) আলোচ্য হাদিসটিকে তারাবীহ অধ্যায়ে সংকলন করেন।

এর জবাবে বলা যায়, তারা কি ইমাম বুখারী (র) এর অনুসারী যে, তার বিন্যাসকৃত হাদীসের বাবের তথা অধ্যায় অনুসরণ করবে ? আর ইমাম বুখারী (র) হাদিসটিকে কয়েকটি অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন । লক্ষ্য করুন-
১. [بَابُ قِيَامِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِاللَّيْلِ فِي رَمَضَانَ وَغَيْرِهِ] রমযান ও অন্যান্য সময়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাত জেগে ইবাদত ।
২. [بَابُ فَضْلِ مَنْ قَامَ رَمَضَانَ] কিয়ামে রমযানের ফযীলত ।
৩. [بَابُ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَنَامُ عَيْنُهُ وَلاَ يَنَامُ قَلْبُهُ] নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ বন্ধ থাকত কিন্তু তাঁর অন্তর থাকত বিনিদ্র অধ্যায় ।
যারা ইমাম বুখারী (র) এর হাদীসের অধ্যায় বিন্যাস সম্বন্ধে কিছু জানেনা তারা হাদীস সম্বন্ধে কিইবা জানতে পারে ? গায়রে মুকাল্লিদরা নিজেদের আহলে হাদীস না বলে আহলে বুখারী বলতে পারে কেননা হাদীসের সাথে তাদের কোন সম্বন্ধই ত নেই ।
এরপরও যখন তারা তাদের মত প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা এই বলে বেড়ায় যে, মূলত এটি তাহাজ্জুদের হাদীস যা রমযান ব্যতীত অন্য মাসের আর রমযান মাসে এটি তারাবীহ হবে ।

এটি গায়রে মুক্কাল্লিদদের একটি দাবী আর দাবী মুখের কথায় প্রমাণ হয়না দলীলেরও প্রয়োজন । কেবল ভিত্তিহীন কিয়াস দ্বারা তা প্রমাণ হয়না আর গায়রে মুকাল্লিদরা ত ক্বিয়াস মানতেই নারাজ । তা সত্ত্বেও নিজেদের মতবাদ প্রমাণের জন্য নিজেদের লাভের জন্য ক্বিয়াসের ব্যবহার করছে তেমনি যেমন তাদের জ্ঞান । কেবল মুখের কথায় তারা দলীল বানিয়ে দিচ্ছে ।
গায়রে মুকাল্লিদ ওহাবীরা! নিজেদের বিবেক বুদ্ধিহীনতাকে ক্বিয়াসের জন্য ব্যবহার করার কি প্রয়োজন । এমনটা করে নিজেদের বুদ্ধিহীনতা জাহির না করলেও চলে । তাহাজ্জুদকে তারাবীহ বলা এরই নামান্তর নয়কি ?
প্রথমতঃ তাহাজ্জুদ নামায সারা বছর পড়া হয় আর তারাবীহ কেবল রমযান মাসে পড়া হয় । তাহাজ্জুদের সময় হল রাতের শেষভাগ অর্থাৎ ফজরের আগে । আর রাতের প্রথমভাগে তাহাজ্জুদ হয়না ।
দ্বিতীয়তঃ রোজা দ্বিতীয় হিজরীতে ফরজ হয় আর তাহাজ্জুদের নামাযের বিধান দ্বিতীয় হিজরীর আগে হয় । তাহাজ্জুদের হুকুম আগে হয়েছে আর তারাবীহ পরে । আগের হুকুমকে পরের জন্য নির্ধারণ করা মূর্খতা ছাড়া আর কি ?
তৃতীয়তঃ তাহাজ্জুদ নামাযের রাকা’ত সংখ্যা নির্ধারিত নয় অন্যদিকে তারাবীহর সংখ্যা নির্ধারিত । নির্ধারিত নামাযকে অনির্ধারিত নামায দ্বারা ক্বিয়াস করা বোকামী নয়কি ? গায়রে মুকাল্লিদ ওহাবীরা এই দাবীও করে যে, আট রাকা’ত তারাবিহ নামাযে লম্বা সময় ধরে ক্বিরাত পড়া হত আর পরবর্তীতে ক্বিরাত সংক্ষিপ্ত করে রাকা’ত সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হয় । সৌদি মুফতি শায়খ জিবরীনের ফতোয়া হতে তারা এরূপ দাবী করে । আট রাকা’ত তারাবীহর ফলে ক্বিরাত লম্বা হয় । এর স্বপক্ষেও তাদের কোন দলীল নেই কেননা বিশ রাকা’ত তারাবীহ সাহাবা কেরামের ইজমার মাধ্যমে প্রমাণিত আর এতে কুরআন মাজীদ পূর্ণ তিলাওয়াত হত । হযরত উসমান যিন নূরাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে কুরআনে রুকূ প্রদান করা হয় আর তা তারাবীহ নামাযে রুকূ হতেই দেয়া হয় । তারাবীহ নামাযে যে আয়াতে রুকূ করা হত সে আয়াতেই রুকূ প্রদান করা হত । এটাই খুলাফা, সাহাবা, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ ও উলামায়ে আহলে সুন্নাতের মত ও পথ । ইরশাদ হচ্ছে – الْمَهْدِيِّينَ عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ
তোমাদের জন্য আমার সুন্নাত ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত পালনীয় ।[৩৬]

তথ্যসূত্রঃ
১. ফাতওয়া আস সিয়াম ৮৭ পৃষ্ঠা ১৬৩ নং প্রশ্ন, দারুস সালাম হতে প্রকাশিত ।
২. ফাতওয়া এ উলামায়ে হাদীস ৬:২৪১ ।
৩. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, ২:১৬৪ হাদীস নং- ৭৬৯২ মাকাতাবাতুর রুশদ রিয়াদ, তাবরানী আল মু’জামুল কবীর ১১:৩৯৩ হাদীস নং-১২১০২ মাকতাবা ইবনে তায়্যিমাহ কায়রো ।
৪. মুয়াত্তা ইমাম মালিক ১:১১৫ [ بَابُ مَا جَاءَ فِي قِيَامِ رَمَضَانَ] হাদীস নং- ২৫১/২৫২ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত, বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান ৪:৫৫০ হাদীস নং- ৩০০০,আস সুনানুল কুবরা ২:৬৯৯ হাদীস-৪২৮৯ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত ।
৫. ইবনে কুদামাহ আল মুগনী ২:১২৩ মাকতাবা কায়রো, ১:৪৫৬ দারুল ফিকর বৈরুত ।
৬. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২:১৬৩ (كَمْ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ مِنْ رَكْعَةٍ) হাদীস নং-৭৬৮১, মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ , বায়হাক্বী আস সুনানুল কুবরা ২:৬৯৯,৭০০ হাদীস নং- ৪২৯২ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত, কানযুল উম্মাল-২৩৪৭৪ ।
৭. মুয়াত্তা ইমাম মালিক ১:১১৫ [ بَابُ مَا جَاءَ فِي قِيَامِ رَمَضَانَ] হাদীস নং- ২৫২/২৫৩ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত, বায়হাক্বী সুনানুল কুবরা ২:৭০১ হাদীস নং-৪২৯৬ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত, শো’আবুল ঈমান ৪:৫৫০ হাদীস- ৩০০১
৮. মুসান্নাফে আব্দির রাযযাক ৪:২৬১ হাদীস নং-৭৭৩৪ মাকতাবাতুল ইসলামী বৈরুত ।
৯. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২:১৬৩ (كَمْ يُصَلِّي فِي رَمَضَانَ مِنْ رَكْعَةٍ) হাদীস নং-৭৬৮১, মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
১০. বায়হাক্বী আস সুনানুল কুবরা, (بَابُ مَا رُوِيَ فِي عَدَدِ رَكَعَاتِ الْقِيَامِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ) ২:৬৯৮ হাদীস নং-৪২৮৮ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত, ফাজায়িলুল আওকাত-১২৭ ।
১১. মোল্লা আলী ক্বারী মিরক্বাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ ৩:৯৭২ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১২. আইনী উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী ১১:১২৭ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত ।
১৩. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, ২:১৬৩ হাদীস-৭৬৮৮, মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
১৪. নববী আল আযকার (بابُ أذكارِ صَلاة التَّراويْح ) ১৪৬পৃষ্ঠা দারুল কুতুবিল আরাবী, ১৮৩ পৃষ্ঠা দারুল ফিকর বৈরুত হতে প্রকাশিত ।
১৫. আসকালানী ফাতহুল বারী ৪:২৫৩ দারুল মা’রেফাহ বৈরুত ।
১৬. ইহয়ায়ু উলুমিদ দ্বীন ১:২০১,২০২ দারুল মা’রেফাহ বৈরুত ।
১৭. বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাছিদ, ১:২১৯, দারুল হাদীস কায়রো ।
১৮. ইমাম শাফেঈ আল উম্ম, ১:১৪২/১:১৬৭ দারুল মা’রেফাহ বৈরুত ।
১৯.সুনানে তিরমিযি (بَابُ مَا جَاءَ فِي قِيَامِ شَهْرِ رَمَضَانَ ) ৩:১৭০ হাদীস নং-৮০৬ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত ।
২০. ইবনে কুদামাহ আল মুগনী ২:১২৩ মাকতাবা কায়রো, ১:৪৫৬ দারুল ফিকর বৈরুত ।
২১. আইনী উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী ১১:১২৭ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত ।
২২. আইনী উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী ৫:২৬৭ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত ।
২৩. আইনী উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী ১১:১২৭ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত ।
২৪. ইবনুল বার আল ইসতিযকার ২:৬৯,৭০ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত ।
২৫. ইমাম আবু ইউসুফ কিতাবুল আছার, ৪১ পৃষ্ঠা হাদীস নং-২১১ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত।
২৬. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২:১৬৩ হাদীস নং-৭৬৮০ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
২৭. বায়হাক্বী আস সুনানুল কুবরা, (بَابُ مَا رُوِيَ فِي عَدَدِ رَكَعَاتِ الْقِيَامِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ) ২:৬৯৮ হাদীস নং-৪২৯০।
২৮. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২:১৬৩ হাদীস নং-৭৬৮৩ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
২৯. আব্দুর রহমান তামিমী আল জরহ ওয়াৎ তা’দীল ৮:৪৫৬, ১:২২৬ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত ।
৩০.মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২:১৬৩ হাদীস নং-৭৬৮৫ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
৩১.মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ ২:১৬৩ হাদীস নং-৭৬৮৬ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
৩২. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, ২:১৬৩ হাদীস-৭৬৯০, মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ ।
৩৩. ইবনে তাইমিয়্যাহ মাজমাউল ফাতাওয়া, ২৩:১১২,১১৩ ।
৩৪. মুবারকপুরী তুহফাতুল আওযাহী শরহে তিরমিযি ৩:৪৪৭ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত ।
৩৫. সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ ২:৫৩ হাদীস নং-১১৪৭/১০৯৬ ।
৩৬. সুনানে তিরমিযি-২৬৭৬, সুনানে আবু দাউদ-৪৬০৭, সুনানে ইবনে মাজাহ-৪২,৪৩ ।

Check Also

রোজার শারিরিক ও মানসিক উপকারীতা

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান অনেক মুসলমানই  স্বাস্থ্যজনিত কারণ দেখিয়ে রোজা রাখেন না,অথচ কুরআনে কারীমে রোজা রাখার ব্যাপারে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *