সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > নামাজ বিষয়ক > গায়েবানা জানাযা জায়েয কি না !

গায়েবানা জানাযা জায়েয কি না !

 মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আযহারী

মানুষ মারা গেলে তাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য জমায়েত এবং তার মাগফিরাতের জন্য যে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় এবং তাতে যে বিশেষ পদ্ধতিতে নামায পড়া হয়, তার নাম জানাযা। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও অনাড়ম্বর পরিবেশে এই জানাযার নামায আদায় করা হয়ে থাকে। মৃতের মাগফিরাত কামনায় এই জানাযার নামায আদায় করা জীবিতদের জন্য শরয়ী দায়িত্ব। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

حَقُّ الْـمُسْلِمِ عَلَى الْـمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْـمَرِيْضِ، وَاتِّبَاعُ الْـجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ

একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে, সালামের উত্তর দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ-খবর নেয়া, জানাযায় অংশ গ্রহণ করা, দাওয়াত কবুল করা এবং হাঁচির জবাব দেওয়া। [আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারুতওকিন নাজাত, খ. ২, পৃ. ৭১, হাদীস: ১২৪০]

অপর এক হাদীসে রয়েছে, হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন,

خَمْسٌ مَنْ عَمِلَهُنَّ فِي يَوْمٍ كَتَبَهُ اللهُ مِنْ أَهْلِ الْـجَنَّةِ: مَنْ عَادَ مَرِيْضًا، وَشَهِدَ جَنَازَةً، وَصَامَ يَوْمًا، وَرَاحَ يَوْمَ الْـجُمُعَةِ، وَأَعْتَقَ رَقَبَةً

পাঁচটি আমল এমন আছে, যে ব্যক্তি যে কোনো দিন ওই আমলগুলো করে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতবাসীদের অর্ন্তভুক্ত করে দেবেন; যে রোগীর খোঁজ-খবর নেবে, জানাযায় অংশগ্রহণ করবে, যে কোন দিন রোযা রাখবে, জুমুআর নামাযের জন্য প্রত্যুষে রওয়ানা করবে এবং একটি গোলাম আযাদ করবে। [ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, মুআস্সিসাতুর রিসালা, বৈরুত,লেবানন, খ. ৭, পৃ. ৬, হাদীস: ২৭৭১]

আরেক হাদীসে আছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: ্রمَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا فَلَهُ قِيْرَاطٌ، وَمَنْ شَهِدَهَا حَتَّىٰ تُدْفَنَ فَلَهُ قِيرَاطَانِগ্ধ قِيْلَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَا الْقِيْرَاطَانِ؟ قَالَ: ্রمِثْلُ جَبَلَيْنِ عَظِيْمَيْنِ

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের জানাযায় অংশগ্রহণ করে জানাযার নামায আদায় করে তার জন্য রয়েছে এক কিরাত সাওয়াব। আর যে ব্যক্তি জানাযায় শরিক হয়ে দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য রয়েছে দুই কিরাত সমপরিমাণ সাওয়াব। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!) দুই কিরাত বলতে কী বোঝানো হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুটি বৃহৎ পাহাড়ের সমপরিমাণ সাওয়াব। [আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ৭, পৃ. ৩৪৭, হাদীস: ৩০৭৮]

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:

“مَا مِنْ رَجُلٍ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَيَقُومُ عَلَى جَنَازَتِهِ أَرْبَعُونَ رَجُلا لا يُشْرِكُونَ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلا شَفَّعَهُمُ اللَّهُ فِيهِ ”

“যদি কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করে, আর তার জানাযায় এমন চল্লিশ জন লোক উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে না, আল্লাহ মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করবেন”। [মুসলিম ২০৭২]

তাই আলেমগণ বলেছেন, মুসল্লি যত বেশী হবে ততই মৃতের জন্যে কল্যাণ হবে, কারণ এতে সে অধিক মানুষের দু’আ পাবে। শরিয়তের দৃষ্টিতে জানাযার নামায আদায় করা ফরজে কিফায়া। কোনো এলাকায় যদি কাউকে জানাযার নামায ছাড়া দাফন করে দেওয়া হয় তাহলে ওই এলাকার সবাই গুনাহগার হবে। জানাযার নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন:

১. মৃত ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। কেননা কোনো অমুসলিম, কাফের, নাস্তিক-মুরতাদের জানাযার নামায পড়া জায়েয নয়।
২. ওই ব্যক্তিকে জীবিত জন্মগ্রহণ করতে হবে। কেননা মৃত নবজাতক বা মৃত ভ্রুণের জানাযার নামায পড়ার প্রয়োজন নেই।
৩. মৃত ব্যক্তির শরীর ও কাপড় প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরণের নাপাকি থেকে পবিত্র হতে হবে। সে পবিত্রতা গোসলের দ্বারা হোক বা তায়াম্মুমের দ্বারা হোক। সুতরাং কোনো মৃত ব্যক্তির স্বাভাবিকভাবে গোসল ও অপারগতাবশত তায়াম্মুম করানো ছাড়া জানাযার নামায পড়ালে তা শুদ্ধ হবে না। পবিত্র করানোর পর পুনরায় নামায পড়াতে হবে।
৪. মৃতের সতর আবৃত থাকতে হবে। অন্যথায় জানাযার নামায সহিহ হবে না। সুতরাং পুরুষ ও মহিলার জীবিতাবস্থায় যে পরিমাণ তার সতর হিসেবে গণ্য, সে পরিমাণ সতর ঢেকে রাখতে হবে। অন্যথায় তার জানাযার নামায শুদ্ধ হবে না।
৫. মৃতের লাশ ইমাম ও মুক্তাদিগণের সামনে থাকতে হবে। পাশে বা পিছনে থাকলে বা একেবারে অনুপস্থিত থাকলে জানাযা শুদ্ধ হবে না।
৬. মৃতের লাশ মাটিতে বা খাটিয়ার ওপর রাখতে হবে। কোনো ওজর ছাড়া মৃতের লাশ যানবাহনের ওপর বা মানুষের কাঁধের ওপর রেখে জানাযার নামায আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে না।
৭. মৃতের লাশ অবশ্যই জানাযা স্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা অর্থাৎ গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয়।
সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে যারা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে বা সহিংসতায় মারা যান, কর্মসূচি দিয়ে তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়। যেহেতু একজায়গায় একত্রিত হয়ে সবাই মিলে তার জানাযার নামায পড়া সম্ভব নয় সে কারণেই মৃত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার গায়েবানা জানাযা পড়া হয়ে থাকে। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায় বড় কোনো নেতা বা ব্যক্তি মারা গেলে তার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান থাকার কারণে তার জানাযার নামায পড়তে আগ্রহ বোধ করে। এসব ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণত গায়েবানা জানাযার আশ্রয় নিয়ে থাকে। কিন্তু গায়েবানা জানাযা জায়েয কিনা এ বিষয়টিকে কেউ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেন না। যেহেতু জানাযার নামায একটি ইবাদত ও ধর্মীয় বিষয় তাই ধর্মীয় শর্তাবলী ও বিধি-বিধান মেনেই তা পালন করা উচিত। দুঃখের বিষয় হলো, সম্প্রতি জানাযার বিধি-বিধানকে চরম উপেক্ষা করে এই মহান ইবাদতটিকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেয়া হয়েছে, যা কিছুতেই কাম্য নয়।

হানাফী, মালিকী মাযহাবের সকল ফকিহ ও হাম্বলী মাযহাবের ফকিহদের একাংশের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, লাশ অনুপস্থিত রেখে গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। কেননা সাহাবায়ে কেরামের যুগের দিকে ল করলে দেখা যায় যে, সে যুগে গায়েবানা জানাযা পড়ার কোনো প্রচলন ছিল না। অথচ সে যুগেও বড় বড় সাহাবি দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছিলেন; কিন্তু তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। যেমন বীরে-মাউনার ঘটনায় সত্তরজন কারী আলেম সাহাবির শাহাদাতের খবর জেনেও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবানা জানাযা পড়েননি। এমনকি স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পরও কোথাও কোনো সাহাবি এমনকি মক্কা শরিফ যা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান সেখানেও কোনো গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কাজ ব্যাপকভাবে বর্জন করা তা বর্জনীয় হওয়ার প্রমাণ।

হানাফী, মালেকী ও হাম্বলী ঊলামায়ে কেরামদের মতে জানাযার নামাযে মৃত ব্যাক্তির সামনে থাকা জরুরি নতুবা গায়েবানা জানাযা পড়া যাবেনা আর গায়েবানা জানাযা সুন্নাহসম্মত নয়। [বাহরুর রায়েক; ফতোয়ায়ে শামী; আহকামুল মাইয়েত; যাদুল মা’আদ- বাবে সলাতুল জানায়েয; আল মাজমূ’-৫/২৫৩; আল মুগনী ২/৩৮৬; যারকানী ২/১০; ইলাউস সুনান ২/২৩৪; ফয়দুল বারী ২/৪৬৯; মুগনী মুহতাজ ১/১৬৫; কাশফুল কান্না ২/১২৬; শরহুছ ছগীর ১/৫৬৯] হাম্বলী মাযহাবের অন্যতম দাবীদার ইবনুল কায়্যিম বলেন,

وَلَـمْ يَكُنْ مِنْ هَدْيِهِ وَسُنَّتِهِ الصَّلَاةُ عَلَىٰ كُلِّ مَيِّتٍ غَائِبٍ فَقَدْ مَاتَ خَلْقٌ كَثِيْرٌ مِنَ الْـمُسْلِمِيْنَ وَهُمْ غُيَّبٌ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِمْ.

“গায়েবানা জানাযা পড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত পরিপন্থি। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় দূর-দূরান্তে বহু সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেছেন; কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাযা পড়েননি।’’ [(ক) আল-আযীমাবাদী, আওনুল মা’বুদ শরহু সুনানি আবী দাউদ, দারু আল-কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, লেবানন (দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৪১৫ হি. = ১৯৯৪ খ্রি.), খ. ৯, পৃ. ৮; (খ)) ইবনে কাইয়িম আল-জওযিয়া, যাদুল মা‘আদ ফী হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, মুআস্সিসা আর-রিসালা, বৈরুত, লেবানন (সপ্তদশ সংস্করণ: ১৪১৫ হি. = ১৯৯৪ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫০০]

হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠতম ভাষ্যকার আল্লামা ইবনুল হুমাম রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন,

وَشَرْطُ صِحَّتِهَا إسْلَامُ الْـمَيِّتِ وَطَهَارَتُهُ وَوَضْعُهُ أَمَامِ الْـمُصَلِّيْ، فَلِهَذَا الْقَيْدِ لَا تَجُوزُ عَلَىٰ غَائِبٍ وَلَا حَاضِرٍ مَحْمُوْلٍ عَلَىٰ دَابَّةٍ أَوْ غَيْرِهَا، وَلَا مَوْضُوْعٍ مُّتَقَدِّمٍ عَلَيْهِ الْـمُصَلِّيْ، وَهُوَ كَالْإِمَامِ مِنْ وَجْهٍ.

‘জানাযা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মৃতকে মুসলমান হতে হবে, পবিত্র হতে হবে এবং লাশ মুসল্লিদের সামনে রাখতে হবে। কাজেই অনুপস্থিত লাশের ওপর গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। [ইবনুল হুমাম, ফতহুল কদীর শরহুল হিদায়া, দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন, খ. ২, পৃ. ১১৭]

এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, লাশ ছাড়া জানাযা তথা গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয়। ফাতহুল কদীরেরই অন্য জায়গায় তিনি আরও বলেন,

ثُمَّ دَلِيْلُ الْـخُصُوْصِيَّةِ أَنَّهُ لَـمْ يُصَلِّ عَلَىٰ غَائِبٍ إلَّا عَلَىٰ هَؤُلَاءِ وَمَنْ سِوَى النَّجَاشِيِّ صَرَّحَ فِيْهِ بِأَنَّهُ رُفِعَ لَهُ وَكَانَ بِمَرْأًى مِنْهُ مَعَ أَنَّهُ قَدْ تُوُفِّيَ خَلْقٌ مِنْهُمْ غَيْبًا فِي الْأَسْفَارِ كَأَرْضِ الْـحَبَشَةِ وَالْغَزَوَاتِ وَمِنْ أَعَزِّ النَّاسِ عَلَيْهِ كَانَ الْقُرَّاءُ، وَلَـمْ يُؤْثَرْ قَطُّ عَنْهُ بِأَنَّهُ صَلَّىٰ عَلَيْهِمْ وَكَانَ عَلَى الصَّلَاةِ عَلَىٰ كُلِّ مَنْ تُوُفِّيَ مِنْ أَصْحَابِهِ حَرِيْصًا حَتَّىٰ قَالَ: ্রلَا يَمُوتَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إلَّا آذَنْتُمُوْنِيْ بِهِ، فَإِنَّ صَلَاتِيْ عَلَيْهِ رَحْمَةٌ لَهُ عَلَىٰ مَا سَنَذْكُرُ

‘বহু সাহাবায়ে কেরাম এমন রয়েছেন, যারা বিভিন্ন সফরে মদিনার বাইরে ইন্তেকাল করেন। যেমন সিরিয়া বা বিভিন্ন যুদ্ধেেত্র। এক বীরে মাউনার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডেই শহীদ হয়েছেন সত্তরজন সাহাবী। যারা ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র; কিন্তু তিনি তাদের কারো গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বলে একটি বর্ণনাও পাওয়া যায় না। অথচ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের জানাযায় শরীক হতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। যে কারণে তিনি বলে রাখতেন, তোমাদের মধ্যে কারো ইন্তেকাল হলে আমাকে সংবাদ দেবে। যাতে আমি তার জানাযা পড়তে পারি। কারণ আমি যার জানাযায় শরীক হবো তা তার জন্য রহমতের কারণ হবে। [ইবনুল হুমাম, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১১৮]

আল্লামা কাসানী (রহ.) বলেন,

وَعَلَىٰ هَذَا قَالَ أَصْحَابُنَا: لَا يُصَلَّىْ عَلَىٰ مَيِّتٍ غَائِبٍ

“এজন্যই আমাদের ওলামাগণ বলেছেন, অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা তথা গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে না। [আল-কাসানী, বাদায়িউস সানাই ফী তারতীবিশ শারায়ি,দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, লেবানন, খ. ১, পৃ. ৩১২]

বিখ্যাত ফাতওয়া গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতারে বলা হয়েছে,

حُضُوْرُهُ (وَوَضْعُهُ) وَكَوْنُهُ هُوَ أَوْ أَكْثَرُهُ (أَمَامَ الْـمُصَلِّيْ) وَكَوْنُهُ لِلْقِبْلَةِ فَلَا تَصِحُّ عَلَىٰ غَائِبٍ.

জানাযা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মৃতের লাশ মুসল্লিদের সম্মুখে উপস্থিত থাকা। কাজেই গায়েব বা অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা জায়েয নয়। [আল-হাসকফী, আদ-দুররুল মুখতার তানওয়ীরুল আবসার ওয়া জামিউল বিহার, দারুল ফিকর, বয়রুত, লেবনান, খ. ২, পৃ. ২০৯]

মোটকথা হানাফী ও মালিকী মাযহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত এবং হাম্বলী মাযহাবের অধিকাংশ ইমামের অভিমত হলো, গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। জানাযা পড়তে হলে অবশ্যই লাশ মুসল্লিদের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে।

কেউ কেউ গায়েবানা জানাযা জায়েয বলতে চান। তারা দলিল হিসেবে ইথিওপিয়ার মুসলিম বাদশাহ হজরত নাজ্জাসীর ঘটনা এবং মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ঘটনা পেশ করেন।

নাজ্জাসীর জানাযার ঘটনা

গায়েবানা জানাযার জন্য হাবশার (আবিসিনিয়া) বাদশাহ আছহামা নাজ্জাশীর জানাযা আদায়ের ঘটনাই হ’ল একমাত্র দলীল, যিনি ৯ম হিজরিতে মারা যান। নাজ্জাশী খ্রিস্টানদের বাদশাহ ছিলেন। কিন্তু নিজে মুসলমান ছিলেন। সেকারণে তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে জামা‘আত সহকারে জানাযা আদায় করেন এবং ইরশাদ করেন,

صَلُّوْا عَلَى أَخٍ لَّكُمْ مَاتَ بِغَيْرِ أَرْضِكُمْ

‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জানাযা পড়। যিনি তোমাদের দেশ ব্যতীত অন্য দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন’।

নাজ্জাসীর জানাযার ঘটনাটি সহীহ ইবনে হিব্বানে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، قَالَ: أَنْبَأَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، أَنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ، فَقُومُوْا فَصَلُّوْا عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَصَفُّوْا خَلْفَهُ، وَكَبَّرَ أَرْبَعًا وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إِلَّا أَنَّ جَنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ

ইমরান ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাশী ইন্তিকাল করেছেন। চলো তাঁর জানাযার নামায পড়ি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে বাইরে এলেন। সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে কাতারবন্দি হলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার তাকবীরের সাথে নামায পড়ালেন। সাহাবায়ে কেরামের ধারণা নাজ্জাশীর জানাযা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা ছিলো। [ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, দারু ইয়াহইয়ায়িল কুতুব আল-আরাবিয়া, বয়রুত, লেবনান, খ. ১, পৃ. ৪৯১, হাদীস: ১৫৩৭]

সহিহ আল-বুখারীতে ঘটনার বিবরণ এভাবে রয়েছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: ্রنَعَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِلَىٰ أَصْحَابِهِ النَّجَاشِيَّ، ثُمَّ تَقَدَّمَ، فَصَفُّوْا خَلْفَهُ، فَكَبَّرَ أَرْبَعًا

হজরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের কাছে উপস্থিত হয়ে নাজ্জাসীর মৃত্যুসংবাদ শোনালেন এবং জানাযার নামায পড়ার জন্য সামনে অগ্রসর হলেন। সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার তাকবীর দিলেন। [আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ২, পৃ. ৮৬, হাদীস: ১৩১৮]

সহীহ আল-বুখারীর অন্য বর্ণনায় হজরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে,

عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم حِيْنَ مَاتَ النَّجَاشِيُّ: ্রمَاتَ اليَوْمَ رَجُلٌ صَالِحٌ، فَقُوْمُوْا فَصَلُّوْا عَلَىٰ أَخِيكُمْ أَصْحَمَةَ

একদিন নবী করীম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাবশার অধিবাসী একজন নেককার লোক মারা গেছেন। তোমরা তোমাদের ভাই ‘আছমাহা’(নাজ্জাসী) এর জানাযা পড়ার জন্য প্রস্তুত হও। [আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, খ. ৫, পৃ. ৫১, হাদীস: ৩৮৭৭]

ইবনে মাজাহ শরীফে ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ أَسِيْدٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ بِهِمْ فَقَال :صَلُّوْا عَلَىٰ أَخٍ لَكُمْ مَاتَ بِغَيْرِ أَرْضِكُمْ قَالُوْا: مَنْ هُوَ؟ قَالَ: النَّجَاشِيُّ

হুযায়ফা ইবনে আসীদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বের হলেন। তিনি বললেন, তোমরা অমুসলিম দেশে ইন্তিকালকারী তোমাদের এক ভাইয়ের জানাযা পড়। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি নাজ্জাসী। [ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, দারু ইয়াহইয়ায়িল কুতুব আল-আরাবিয়া, বয়রুত, লেবনান, খ. ১, পৃ. ৪৯১, হাদীস: ১৫৩৭]

উপর্যুক্ত হাদীসসমূহসহ সিহাহ সিত্তায় বর্ণিত অন্যান্য হাদীস দ্বারা বোঝা যায় হাবশার অধিপতি নাজ্জাসী স্বদেশে ইন্তিকাল করেছেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বস্থানে সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে জানাযার নামায পড়েছেন। গায়েবানা জানাযার পক্ষে কেউ কেউ এ ঘটনাকে দলিল হিসাবে পেশ করেন।


মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর গায়েবানা জানাযার ঘটনা:

হযরত মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর গায়েবানা জানাযার ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম তাবারানী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তার আল-মুজামুল কাবীর গ্রন্থে হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ نَزَلَ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ! مَاتَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْـمُزَنِيُّ، أَتُحِبُّ أَنْ تُصَلِّيَ عَلَيْهِ؟ قَالَ: نَعَمْ ، فَضَرَبَ بِجَنَاحَيْهِ فَلَمْ تَبْقَ شَجَرَةٌ، وَلَا أَكَمَةٌ إِلَّا تَضَعْضَعَتْ، وَرَفَعَ لَهُ سَرِيْرَهُ حَتَّىٰ نَظَرَ إِلَيْهِ، فَصَلَّىٰ عَلَيْهِ وَخَلْفَهُ صَفَّانِ مِنَ الْـمَلَائِكَةِ فِيْ كُلِّ صَفٍّ سَبْعُوْنَ أَلْفًا، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لِـجِبْرِيْلَ: يَا جِبْرِيْلُ! مَا بَلَّغَ هَذَا هَذِهِ الْـمَنْزِلَةَ مِنَ اللهِ؟ قَالَ: بِحُبِّهِ “قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ” وَقِرَاءَتِهِ إِيَّاهَا جَائِيًا وَذَاهِبًا وَقَائِمًا وَقَاعِدًا وَعَلَىٰ كُلِّ حَالٍ

হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, একদিন জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহ তাআলার রাসুল! মুআবিয় ইবনে মুআবিয়া আল-মুযানী ইন্তেকাল করেছেন। আপনি তার নামাযে জানাযা পড়তে আগ্রহী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। তখন জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম তার উভয় ডানা দ্বারা জমিনে আঘাত করলেন। ফলে জমিনের সকল গাছ-পালা টিলা-টুম্বর সমান হয়ে গেল। অতঃপর মুআবিয়ার লাশ সামনে আনা হলো। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামায পড়ালেন। পেছনে দু’কাতার ফেরেশতা দাঁড়ালেন। প্রতি কাতারে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা ছিল। নামায শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন। কোন আমলের বরকতে মুআবিয়া এই মর্যাদা লাভ করল। উত্তরে হযরত জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম বললেন, মুআবিয়া সুরা ইখলাসকে খুবই মুহাব্বত করতেন এবং চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সর্বাবস্থায় তিনি সুরা আল-ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। [আত-তাবারানী, আল-মু’জামুল কবীর, মাকতাবাতু ইবনে তায়মিয়া, কায়রো, মিসর, খ. ১৯, পৃ. ৪২৮, হাদীস: ১০৪০]

এই ঘটনা দ্বারাও অনেকে বুঝাতে চান যে, গায়েবানা জানাযা পড়া বৈধ।

নাজ্জাসীর জানাযা সম্পর্কে উত্তর

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাসীর গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বলে যে দাবি করা হয়েছে তা এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায় না; বরং হাদীস দ্বারা যেটা বোঝা যায় সেটা হলো, নাজ্জাসীর লাশ মুজিযা-স্বরূপ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামও এই মনে করে জানাযার নামায পড়েছেন যে, লাশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আছে। যেমন সহীহ সনদে মুসনদে আহমদ ইবনে হাম্বলে বর্ণিত হয়েছে,

حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، حَدَّثَنَا حَرْبٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَىٰ، أَنَّ أَبَا قِلَابَةَ حَدَّثَهُ، أَنَّ أَبَا الْـمُهَلَّبِ حَدَّثَهُ، أَنَّ عِمْرَانَ بْنَ حُصَيْنٍ حَدَّثَهُ، أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ:إِنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ فَصَلُّوْا عَلَيْهِ، قَالَ: فَصَفَّ رَسُوْلُ اللَهِ صلى الله عليه وسلم، وَصَفَفْنَا خَلْفَهُ فَصَلَّىٰ عَلَيْهِ، وَمَا نَحْسِبُ الْـجِنَازَةَ إِلَّا مَوْضُوْعَةً بَيْنَ يَدَيْهِ.)إسناده صحيح علىٰ شرط مسلم رجاله ثقات رجال الشيخين غير أبي المهلب الجرمي فمن رجال مسلم.

হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের ভাই নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেছেন। সুতরাং তোমরা তার জানাযা পড়।’ বর্ণনাকরী বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতার সোজা করে দাঁড়ালেন। আমরাও তার পেছনে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের ধারণা হচ্ছিল লাশটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছিল। [আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনদ, মুআস্সিসাতুর রিসালা, বৈরুত, লেবানন, খ. ৩৩, পৃ. ২০৯, হাদীস: ২০০০৫]

বিষয়টি সহীহ ইবনে হিব্বানেও সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে,

عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، قَالَ:أَنْبَأَنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، أَنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ، فَقُوْمُوْا فَصَلُّوْا عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَصَفُّوا خَلْفَهُ، وَكَبَّرَ أَرْبَعًا وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إِلَّا أَنَّ جَنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ

সাহাবায়ে কেরাম প্রবলভাবে ধারণা করেন যে, লাশটি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছে। [ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, মুআস্সিসাতুর রিসালা, বয়রুত, লেবনান, খ. ৭, পৃ. ৩৬৯, হাদীস: ৩১০২]

عن ابن عباس قال : ( كشف للنبي صلى الله عليه وآله وسلم عن سرير النجاشي حتى رآه وصلى عليه -) سنن الترمذي كتاب الجنائز عن رسول الله صلى الله عليه وسلم  باب ما جاء في صلاة النبي صلى الله عليه وسلم على النجاشي 

হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, নাজ্জাসীর খাটিয়াকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছিল। ফলে তিনি তাকে দেখে দেখে জানাযা আদায় করেছিলেন। [তুহফাতুল আহওয়াযী-১০৩৯]

বিষয়টি নাসবুর রায়া গ্রন্থেও বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানে তা হুবহু উল্লেখ করা হলো:


النَّوْعُ الْـحَادِي وَالْأَرْبَعِيْنَ، مِنْ الْقِسْمِ الْـخَامِسِ، مِنْ حَدِيْثِ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: إِنَّ أَخَاكُمْ النَّجَاشِيَّ تُوُفِّيَ، فَقُوْمُوْا صَلُّوْا عَلَيْهِ، فَقَامَ رَسُوْلُ اللَهِ صلى الله عليه وسلم، وَصَفُّوْا خَلْفَهُ، فَكَبَّرَ أَرْبَعًا، وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إلَّا أَنَّ جِنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ

الثَّانِيْ: أَنَّهُ مِنْ بَابِ الضَّرُورَةِ لِأَنَّهُ مَاتَ بِأَرْضٍ لَّـمْ يُقَمْ فِيْهَا عَلَيْهِ فَرِيْضَةُ الصَّلَاةِ، فَتَعَيَّنَ فَرْضُ الصَّلَاةِ عَلَيْهِ لِعَدَمِ مَنْ يُصَلِّيْ عَلَيْهِ ثَمَّ، وَيَدُلُّ عَلَىٰ ذَلِكَ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم لَـمْ يُصَلِّ عَلَىٰ غَائِبٍ غَيْرِهِ، وَقَدْ مَاتَ مِنْ الصَّحَابَةِ خَلْقٌ كَثِيْرٌ، وَهُمْ غَائِبُوْنَ عَنْهُ، وَسَمِعَ بِهِمْ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِمْ، إلَّا غَائِبًا وَاحِدًا وَرَدَ أَنَّهُ طُوِيَتْ لَهُ الْأَرْضُ حَتَّىٰ حَضَرَهُ، وَهُوَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْـمُزَنِيّ، رَوَى حَدِيْثَهُ الطَّبَرَانِيُّ فِيْ مُعْجَمِهِ الْوَسَطِ. وَكِتَابِ مُسْنَدِ الشَّامِيِّينَ حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ سَعِيدٍ الرَّازِيُّ ثَنَا نُوحُ بْنُ عَمْرِو بْنِ حُوَيٍّ السَّكْسَكُ ثَنَا بَقِيَّةُ بْنُ الْوَلِيدِ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ زِيَادٍ الْأَلْـهَانِيِّ عَنْ أَبِيْ أُمَامَةَ، قَالَ: كُنَّا مَعَ رَسُوْلِ اللَهِ صلى الله عليه وسلم بِتَبُوْكَ، فنزل عليه جبرئيل، فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! إنَّ مُعَاوِيَةَ بْنَ مُعَاوِيَةَ الْـمُزَنِيّ

[আয-যায়লায়ী, নসবুর রায়া লি আহাদীসিল হিদায়া, দারুর রাইয়ান লিত-তাবাআতি ওয়ান নশর, বয়রুত, লেবনান ও দারুল কিবলা লিস-সাকাফাতিল ইসলামিয়া, জিদ্দা, সাঊদী আরব (প্রথম সংস্করণ: ১৪১৮ হি. = ১৯৯৭ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ২৮৩]

আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারীতে ইয়াহইয়া ইবনে কসীরের বর্ণনা উল্লেখ করার পর লিখেন, আমরা নাজ্জাসীর জানাযা পড়েছি এই অবস্থায় যে, তার মৃতদেহ আমাদের সামনে উপস্থিত ছিল।’

وَلِابْنِ حِبَّانَ مِنْ حَدِيْثِ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ، فَقَامَ وَصَفُّوْا خَلْفَهُ وَهُمْ لَا يَظُنُّوْنَ إِلَّا أَنَّ جِنَازَتَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ أَخْرَجَهُ مِنْ طَرِيْقِ الْأَوْزَاعِيِّ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِيْ كَثِيْرٍ، عَنْ أَبِيْ قِلَابَةَ، عَنْ أَبِي الْـمُهَلَّبِ عَنْهُ وَلِأَبِيْ عَوَانَةَ مِنْ طَرِيْقِ أَبَانَ وَغَيْرِهِ، عَنْ يَحْيَىٰ فَصَلَّيْنَا خَلْفَهُ وَنَحْنُ لَا نَرَى إِلَّا أَنَّ الْـجِنَازَةَ قُدَّامَنَا وَمِنَ الِاعْتِذَارَاتِ أَيْضًا أَنَّ ذَلِكَ خَاصٌّ بِالنَّجَاشِيِّ، لِأَنَّهُ لَـمْ يَثْبُتْ أَنَّهُ صلى الله عليه وسلم صَلَّىٰ عَلَىٰ مَيِّتٍ غَائِبٍ غَيْرِهِ، قَالَ الْـمُهَلَّبُ وَكَأَنَّهُ لَـمْ يَثْبُتْ عِنْدَهُ قِصَّةُ مُعَاوِيَةَ اللَّيْثِيِّ.

উপর্যুক্ত বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় যে, নাজ্জাসীর নামাযে জানাযা গায়েবানা ছিল না, বরং নাজ্জাসীর লাশ মদীনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পেশ করা হয়েছিল। তা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা তাঁর নির্দেশ ছাড়া উম্মতের জন্য আমল করা বা শরিয়তের বিধান হিসেবে নির্ধারণ করা যায় না। [ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী শরহু সহীহ আল-বুখারী, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, লেবানন (১৩৭৯ হি. = ১৯৫৯ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১৮৮]

তাই এটা কোন গায়েবানা জানাযা ছিলো না। কারণ, নাজাসীর ঘটনাসম্বলিত হাদীসমূহে বলা হয়েছে–

১. হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন– وَمَا نَحْسِبُ الْجِنَازَةَ إِلَّا مَوْضُوعَةً بَيْنَ يَدَيْهِ “আমরা জানাযার ব্যাপারে এটাই অনুধাবন করছিলাম যে, তা আমাদের সামনে রাখা আছে।” [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নম্বর-২০০০৫] ২. হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন– وَهُمْ لَا يَظُنُّونَ إِلَّا أَنَّ جَنَازَتَهُ بَيْنَ يديه “সাহাবায়ে কেরামের বিশ্বাস এটাই ছিল যে, জানাযা হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপস্থিত। [সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নম্বর ৩১০২] ৩. হযরত আবান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সূত্রে হযরত ইমরান ইবনে হাছীন থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাতে তিনি বলেন যে, “যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে জানাযা পড়েছি, তখন নাজাসীর লাশকে আমাদের সামনে উপস্থিত দেখতে পেয়েছি।” [উমদাতুল কারী শরহুল বুখারী- ৭/৩৩, মাকতাবায়ে তাওফীকিয়া, মিসর; ফাতহুল বারী- ৩/২৪৩ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ]

উপরিউক্ত সকল বর্ণনার দিকে তাকালে পরিস্কার হয়ে যায়, নাজ্জাসীর জানাযার নামাযটি গায়েবানা জানাযা নয়। বরং উপস্থিত ব্যক্তির জানাযা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজেযা স্বরূপ নাজাশীর লাশকে তাঁর সামনে উপস্থিত করে দেয়া হয়েছিল। আর সেই লাশ সামনে নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযা পড়িয়েছেন।

কেননা আমার নূর নবীজি একবারই গায়েবানা জানাজা আদায় করেছেন কিন্তু আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ওই লাশ গায়েব ছিল না সেটা ছিল হাজের, কেননা আমার নবীজির নিকট গায়েব বলতে কিছু নেই তিনি সব গায়েবের খবর জানেন। আর নবীজির নামের সাথে গায়েবানা শব্দ বাবহার করে কেউ যদি বলে নবীজি গায়েবানা নামাজ আদায় করেছেন যা আমার দয়োল নবীজির শানের সম্পূর্ণ খেলাফ।

তিনি মৃতকে সামনে দেখে জানাজা পড়তেন। যদিও সেই মৃত বহু দূরে, সুদূর আফ্রিকার এক রাজা! সেই দেখার জন্য তাঁর সেখানে থাকা না থাকার প্রশ্ন উঠত না। তিনি তাঁর আগমনের পঞ্চাশ দিন আগে হস্তী বাহিনীর কাহিনীও দেখেছেন, তিনি আসহাবে কাহাফের কোনদিক দিয়ে সূর্য উঠে কোনদিকে অস্ত যেত তাও দেখেছেন আগমনের হাজারো বছর আগে, তিনি বহু আগে বিলুপ্ত মানুষের জাতির সাথে আল্লাহ কী করেছেন তাও দেখেছেন এবং তিনি মানুষকে রুহের জগতে কী ওয়াদা করানো হয়েছিল তাও দেখেছেন। এসবই কুরআনের কথা।

আল্লাহ তাআলার জন্য কোন কিছুই অসম্ভব নয়। নবীদের মুজেজা আর ওলীদের কারামত সত্য। এটাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের আকিদা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আল্লাহ তাআলা অনেক মুজেজা প্রকাশিত করেছেন। এর মাঝে এটাও ছিল যে, দূরের বস্তুকে কাছ থেকে দেখা। বেশ কিছু মুজেজাপূর্ণ ঘটনায় দূরের বস্তু কাছে দেখেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যেমন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ছিলেন। তুমুল যুদ্ধ চলছিল তখন মুতা প্রান্তরে। সাহাবাগণ জীবন বাজি রেখে দ্বীনের জন্য লড়াই করে যাচ্ছিলেন। মদীনায় বসে শত শত মাইল দূরের মুতা প্রান্তরের বর্ণনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, “জায়েদ ঝান্ডা নিয়েছে এবং শহীদ হয়ে গেছে। তারপর ঝান্ডা জাফর নিয়েছে সেও শহীদ হয়ে গেছে। তারপর ঝান্ডা আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা নিয়েছে সেও শহীদ হয়ে গেছে।” এ পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেঁদে দিলেন। বলতে লাগলেন-“এবার ঝান্ডা খালিদ বিন ওয়ালিদ নিয়েছে আর বিজয়ী হয়ে গেছে।”। [সহীহ বুখারী-১/১৬৭]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় এমন বহু মুজিযা সংঘটিত হয়েছে। তিনি যখন মিরাজ সম্পন্ন করে ফিরে আসেন, মক্কার কাফের সম্প্রদায় তা অস্বীকার করে বসে এবং তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলে। তারা প্রশ্ন করে, আপনি যদি সত্যিই বাইতুল মাকদিস হয়ে উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে বলুন তো, বাইতুল মাকদিসের দরজা ও জানালা কয়টি? স্বাভাবিকভাবে এসব অযৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দরকার নেই, তারপরও ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য আল্লাহ তাআলা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বায়তুল মাকদিসের দৃশ্য হাজির করে দেন। তিনি তা দেখে দেখে জবাব দেন। [বুখারী-১/৫৪৮]

মক্কায় অবস্থান করা অবস্থায় হাজার মাইল দূরের বাইতুল মাকদিসের পূর্ণ হালাত দেখে দেখে কাফেরদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। হাবশা, মুতা আর বাইতুল মাকদিসতো দূনিয়ার স্থান। আমাদের নবীতো মদীনায় বসে থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছেন। [বুখারী-১/৭৭,১০৩,১২৬,১৪৪,১৬৪]

উক্ত ঘটনাগুলোতে দেখা যায়, দূরের কোনো জিনিস রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির করার ঘটনা একাধিক এবং এগুলো তার মুজিযা। এসব মুজিযা দ্বারা শরীয়তের কোনো বিধান প্রমাণ করা যায় না। যতণ তিনি সেটাকে উম্মতের আমলের জন্য শরিয়তের বিধান হিসেবে প্রমাণিত না করেন।

নাজ্জাসীর জানাযা বিষয়ক হাদিস শরীফ বর্ণনাকারীদের ভূমিকা

আমাদের দেখতে হবে উক্ত হাদীসটি কোন কোন রাবী বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারীগণ নাজ্জাসীর জানাযা সংশ্লিষ্ট হাদীস থেকে গায়েবানা জানাযা জায়েজ হবার দলীল হিসেবেই বুঝেছেন না ভিন্ন কিছু?

উক্ত হাদীসের প্রসিদ্ধতম রাবী রয়েছেন তিনজন- ১. হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, ২. হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, ৩. হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। বাদশা নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেছেন নবম হিজরীর রজব মাসে। [হাশিয়ায়ে মুয়াত্তা মালিক-২০৮]

আর হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ইন্তেকাল করেছেন ৫৯ হিজরিতে। অর্থাৎ উক্ত ঘটনার পর হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু প্রায় ৫০ বছর জীবিত ছিলেন। হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ইন্তেকাল করেছেন ৭৯ হিজরিতে। সেই হিসেবে তিনি উক্ত ঘটনার পর ৭০ বছর জীবিত ছিলেন। আর হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু উক্ত ঘটনার পর জীবিত ছিলেন প্রায় ৪৩ বছর।

কিন্তু হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এ ৫০ বছরের মাঝে, হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পুরো ৭০ বছরের মাঝে এবং হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তার জীবনের এই ৪৩ বছরের মাঝে কোনদিন কারো গায়েবানা জানাযা পড়েছেন, কিংবা গায়েবানা জানাযা পড়তে বলেছেন কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবে?

এত দীর্ঘ বেঁচে থাকার পরও উক্ত ঘটনা থেকে এ সকল সাহাবা যদি গায়েবানা জানাযা জায়েজের প্রমাণই বুঝে থাকতেন, তাহলে তাদের জমানায় ইন্তেকাল হওয়া অসংখ্য সাহাবী গায়েবানা জানাযা তাদের পড়ার কথা। কিন্তু একজনের গায়েবানা জানাযা পড়ানোর কোন প্রমাণ না কোন হাদীস গ্রন্থে আছে না কোন ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায়। যা পরিষ্কার প্রমাণ করছে যে, উক্ত ঘটনা দ্বারা কোন সাহাবী গায়েবানা জানাযা জায়েজ বুঝেননি। বরং বিষয় ছিল ভিন্ন। আসলে কি হয়েছিল তখন? আমরা যদি উক্ত ঘটনার বর্ণনা সম্বলিত সকল হাদীসকে সামনে রাখি, তাহলে আমাদের কাছে উক্ত বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং এর দ্বারা গায়েবানা জানাযা জায়েয প্রমাণিত হয় না। এ জন্যই সেই জানাযায় উপস্থিত বা উক্ত হাদীস বর্ণনাকারী কোন সাহাবী জীবনে কখনও কারো গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বা পড়িয়েছেন বলে কোন প্রমাণ নেই।

এমনিভাবে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এর আমলে কত কারী সাহাবীকে মুসাইলামা কাজ্জাব শহীদ করে দিয়েছে। আরো কত সাহাবী জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়েছেন কিন্তু হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এবং অন্যান্য সাহাবীগণ কেউই গায়েবানা জানাযা আদায় করেননি। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুএর আমলে কত জিহাদ সংঘঠিত হয়েছে। কত হাজার হাজার সাহাবা জিহাদের ময়দানে মদীনা শরীফ থেকে বহু দূরে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোন একজনেরও গায়েবানা জানাযা হযরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছে মর্মে কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না। পারবে না হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আমলের কোন উদাহরণ পেশ করতে। অথচ হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আমলেও কত হাজার হাজার সাহাবা ও তাবেয়ীগণ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোন সাহাবীই গায়েবানা জানাযার ইলান করেছেন বা নিজে গায়েবানা জানাযার নামায পড়েছেন মর্মে কোন প্রমাণ না হাদীস থেকে দিতে পারবে, না ইতিহাস থেকে পেশ করতে পারবে।

দ্বিতীয় উত্তর: তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাসীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন, তারপরও তার দ্বারা ব্যাপকভাবে গায়েবানা জানাযা বৈধ হওয়া প্রমাণিত হয় না। কেননা এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা। যা তাঁর জন্যই খাস ছিল। যেমন চারের অধিক বিয়ে করা তাঁর জন্য খাস। অনুরূপ ঘুমালে অযু না ভাঙ্গা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাস। এসব বিশেষ বিধান দ্বারা উম্মতের জন্য ব্যাপকভাবে কোনো বিধান প্রমাণ করা যায় না। উল্লিখিত ঘটনা যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত তার বড় প্রমাণ হলো, কুরুনে সালাসা তথা শ্রেষ্ঠতম তিন যুগে অর্থাৎ সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনের যুগে কখনো গায়েবানা জানাযা হয়নি। কাজেই নাজ্জাসীর ঘটনাকে যেভাবে বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, এর দ্বারা গায়েবানা জানাযা জায়েয প্রমাণিত হয় না।

মুয়াবিয়া ইবনে মুয়াবিয়া আল-মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঘটনার জবাব

মুয়াবিয়া বিন মুয়াবিয়া আল মুযানি রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর হাদীসের ব্যাপারে প্রথম কথা হলো অনেক মুহাদ্দিসের নিকট হাদীসটি দুর্বল। তদুপরি এই হাদীস দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণিত হয় না। কেননা হাদীসের বর্ণনা দ্বারাই স্পষ্ট যে, সব পর্দা ও প্রতিবন্ধকতা উঠিয়ে দিয়ে তার লাশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এনে দেয়া হয়েছিল।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: نَزَلَ جِبْرِيْلُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: مَاتَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مُعَاوِيَةَ اللَّيْثِيُّ، فُتُحِبُّ أَنْ تُصَلِّيَ عَلَيْهِ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: ضَرَبَ بِجَنَاحِهِ الْأَرْضَ فَلَمْ يَبْقَ شَجَرَةٌ وَلَا أَكَمَةٌ إِلَّا تَضَعْضَعَتْ، فَرَفَعَ سَرِيرَهُ، فَنَظَرَ إِلَيْهِ فَكَبَّرَ عَلَيْهِ وَخَلْفَهُ صَفَّانِ مِنَ الْـمَلَائِكَةِ، فِيْ كُلِّ صَفٍّ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: يَا جِبْرِيْلُ، بِمَ نَالَ هَذِهِ الْمَنْزِلَةَ مِنَ اللهِ؟ قَالَ: بِحُبِّهِ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ، وَقِرَاءَتِهِ إِيَّاهَا ذَاهِبًا وَجَائِيًا، وَقَائِمًا وَقَاعِدًا، وَعَلَىٰ كُلِّ حَالٍ.

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, একদিন জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহ তাআলার রাসুল! মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া আল-মুযানী ইন্তেকাল করেছেন। আপনি তাঁর নামাযে জানাযা পড়তে আগ্রহী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। তখন জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম তাঁর উভয় ডানা দ্বারা জমিনে আঘাত করলেন। ফলে জমিনের সকল গাছ-পালা টিলা-টুম্বর সমান হয়ে গেল। অতঃপর মুআবিয়ার লাশ উঠানো হলো। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামায পড়ালেন। পেছনে দু’কাতার ফেরেশতা দাঁড়ালেন। প্রতি কাতারে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা ছিল। নামায শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন। কোন আমলের বরকতে মুআবিয়া এই মর্যাদা লাভ করল। উত্তরে হযরত জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম বললেন, মুআবিয়া সুরা আল-ইখলাসকে খুবই মুহাব্বত করতেন এবং চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সর্বাবস্থায় তিনি সুরা আল-ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। [আবু ইয়া’লা আল-মুসিলী, আল-মুসনদ, দারুল মামূন লিত-তুরাস, দামেস্ক, সিরিয়া [প্রথম সংস্করণ: ১৪০৪ হি. = ১৯৮৪ খ্রি., খ. ৭, পৃ. ২৫৮, হাদীস: ৪২৬৮]

উক্ত হাদীসের বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, হজরত মুয়াবিয়া আল-মুযানীর জানাযা গায়েবানা জানাযা ছিল না। তাঁর মৃতদেহ উপস্থিত করেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযা পড়েছেন। এই বর্ণনা দ্বারা এই বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, গায়েবানা জানাযা জায়েয নেই। কেননা যদি গায়েবানা জানাযা জায়েযই হত তাহলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে কেন এত অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাঁর লাশ হাজির করা হলো। বরং স্বাভাবিকভাবেই তিনি গায়েবানা জানাযা পড়ে নিতেন।

আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফায়যুল বারীতে লিখেন,

أما الصلاة على الغائب فلم يثبت فيها إلا واقعة النجاشي وأما واقعة معاوية الليثي فاختلفوا فيها والظاهر أنه منكر فاذا لـم يثبت تلك الصلاة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم مع أن كثيرا من الـمسلمين في دار عزابة في عهده صلى الله عليه وسلم فانسب أن نختم بعهده صلى الله عليه وسلم سيما اذا لـم تجري عليها توارث الأمة أيضا بخلاف الصلاة على القبر فإن بعضهم عملوا بها فيما بعد.

অনুপস্থিত মৃতদেহের ওপর জানাযা পড়া নাজ্জাসীর ঘটনা ছাড়া আর কোনো ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় না। ইবনে মুয়াবিয়ার যে কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে সে সম্পর্কে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। সহীহ বর্ণনা হলো, ইবনে মুয়াবিয়ার এই ঘটনা ভিত্তিহীন। ইবনু আব্দিল বার্র ও ইবনু হাজার প্রমুখ বলেন যে, হাদীছটি ‘সহীহ’ নয়। অতএব গায়েবানা জানাযার আর কোনো ঘটনা যেহেতু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ঘটেনি, অথচ বহু সাহাবী দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছেন। কাজেই নাজ্জাসীর এই ঘটনাটিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা গণ্য করা উচিত। বিশেষ করে যখন যুগ পরম্পরায় গায়েবানা জানাযার প্রচলন ছিল না, তাই তা একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহণ করে যে, এটি ব্যতিক্রমধর্মী বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।’ [কাশ্মীরী, ফয়যুল বারী শরহু সহীহ আল-বুখারী, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, লেবানন (১৪২৬ হি. = ২০০৫ খ্রি.), খ. ৪, পৃ. ৪৬৭]

ইবনে তাইমিয়া এক্ষেত্রে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি নাজ্জাসীর ঘটনা দ্বারা গায়েবানা জানাযার দলিল পেশ করা হয় তাহলে গায়েবানা জানাযা ওই সব মুসলমানের ওপর পড়া যাবে যাদের ওপর কোনো মুসলমান না থাকার কারণে সরাসরি জানাযা পড়ানো সম্ভব হয় না। নাজ্জাসীর ওপর এ জন্য জানাযা পড়া হয়েছিল, যেহেতু ইথিওপিয়ায় তখন কোনো মুসলমান না থাকার কারণে সরাসরি তাঁর ওপর জানাযা পড়া সম্ভব হয়নি। এ কারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় সাহাবীদের নিয়ে তার জানাযার নামায সম্পন্ন করেছিলেন। যদি গায়েবানা জানাযা পড়া যদি জায়েযই হত তাহলে এইভাবে সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা উঠিয়ে দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল?

আর ইমাম আবু দাঊদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নাজ্জাশী বিষয়ক হাদীছের বর্ণনায় অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন এভাবে, باب في الصلاة على المسلم يموت في بلاد الشرك ‘মুশরিক দেশে মৃত্যুবরণকারী মুসলিমের জানাযা’ অনুচ্ছেদ। এতে বুঝা যায় যে, মুশরিক বা অমুসলিম দেশে মুত্যু হওয়ার কারণে যদি কোন মুসলমানের জানাযা হয়নি বলে নিশ্চিত ধারণা হয়, তাহ’লে সেক্ষেত্রে ঐ মুসলমান ভাই বা বোনের জন্য গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে।

আর বুখারী শরীফে হাদীসটির উত্তর হলো, যেহেতু ওই সাহাবী মুয়াবিয়া আল মুযানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু মসজিদে নববীর ঝাড়ু দিতেন, তাই তার বিশেষ প্রতিদান হিসেবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করেছেন। তা ছাড়া দ্বিতীয় জানাযা কেবল ওই ক্ষেত্রে পড়া যায় যেখানে প্রথম জানাযা অলীর অনুমতি ছাড়া পড়া হয়। সে মতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মুমিনের সবচেয়ে বড় অভিভাবক। তাই তিনি ওই সাহাবী অথবা সাহাবিয়ার জানাযা পুনরায় পড়েছিলেন।

হজরত হামযা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বদরী সাহাবী ছিলেন। একাধিক জানাযাসহ ভিন্ন পদ্ধতিতে তথা চারের অধিক তাকবীরের সাথে জানাযা পড়া বদরী সাহাবিদের বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল।

أَخْبَرَنَا أَبُو جَنَابٍ الْكَلْبِيُّ قَالَ: سَمِعْتُ عُمَيْرَ بْنَ سَعِيدٍ يَقُوْلُ: صَلَّى عَلِيٌّ عَلَىٰ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ فَكَبَّرَ عَلَيْهِ خَمْسًا، فَقَالُوْا: مَا هَذَا التَّكْبِيْرُ؟ فَقَالَ: هَذَا سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ مِنْ أَهْلِ بَدْرٍ، وَلِأَهْلِ بَدْرٍ فَضْلٌ عَلَىٰ غَيْرِهِمْ، فَأَرَدْتُ أَنْ أُعْلِمَكُمْ فَضْلَهُمْ” وَاحِدٌ.

‘যেমন হযরত উমায়ের ইবনে সাঈদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, (হযরত সাহল ইবনে হুযায়ফ রাযি. ইন্তেকাল করলে) হজরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং এতে পাঁচ তাকবীর বলেন। ফলে লোকেরা বলেন, এই অতিরিক্ত তাকবীর কিসের? তিনি বললেন, ইনি সাহল ইবনে হুযায়ফ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। তিনি বদরী সাহাবী। আর বদরী সাহাবীদের অন্যান্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।’ [ইবনে সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৩৬৬ হি. = ১৯৬৮ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ৪৭৩]

মোটকথা গায়েবানা জানাযার পে যেসব দলীল পেশ করা হয়ে থাকে, সেগুলোর কোনোটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাস, কোনোটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা, আবার কোনোটি এমন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে কোনো কারণবশত মুসলামানগণ জানাযার নামায পড়তে পারেননি। কোনটা দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণ করা যায় না।

উল্লিখিত সকল বর্ণনার দিকে তাকালে পরিস্কার হয়ে যাবে, নাজ্জাসীর জানাযা বর্ণনাকারী সাহাবীগণ কেন উক্ত ঘটনা দ্বারা গায়েবানা জানাযা জায়েজের দলীল মনে করেননি। নাজ্জাসীর জানাযার বর্ণনা করলেও জীবনে কোনদিন তারা গায়েবানা জানাযা পড়েননি। কারণ তারা পরিষ্কার বুঝেছিলেন নাজ্জাসীর জানাযার নামাযটি গায়েবানা জানাযা নয়। বরং উপস্থিত ব্যক্তির জানাযা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুজেযাস্বরূপ নাজাশীকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে উপস্থিত করে দেয়া হয়েছিল। আর সেই জানাযা সামনে নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযা পড়িয়েছেন। আর সামনে নিয়ে জানাযা পড়ার নাম উপস্থিত ব্যক্তির জানাযা গায়েবানা জানাযা নয়। সাহাবাগণ এ ভেদ জানার কারণে কোন সাহাবী জীবনে কোনদিন গায়েবানা জানাজা পড়েননি। কিংবা গায়েবানা জানাযা পড়ার দাবিও করেননি, কিংবা গায়েবানা জানাযার পে উক্ত হাদীসের দলিলও পেশ করেননি। কারণ তারা জানতেন আসলে উক্ত ঘটনা একটি মুজেজা। যাতে নাজ্জাসী গায়েব ছিল না, আল্লাহর কুদরতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুজেজা স্বরূপ উপস্থিত ছিলেন।

ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, মুসলমানদের মাঝে অনেক এমন ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছেন যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দূরে তথা গায়েব ছিলেন। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কারোরই গায়েবানা জানাযা পড়েননি। [যাদুল মাআদ, ১/৫১৯]

সুতরাং শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন কাজের প্রচলন ঘটানো যা শরিয়ত দ্বারা প্রমাণিত নয় তা সম্পূর্ণ বিদআত ও পরিত্যাজ্য। মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করতে হলে, তার রূহের মাগফিরাত কামনায় শরিয়ত অনুমোদিত পন্থায় যাবতীয় শর্ত-শরায়েত মেনেই করতে হবে।

মাজহাব অনুসরণের ক্ষেত্রে যে কোন একটি অনুসরণ করতে হবে। সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়ে জগাখিচুরি পাকালে হবেনা। সুতরাং আমাদের দেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই গায়েবানা জানাজা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এটি এখন রাজনৈতিক একটি কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বুঝার তওফিক দান করুন। আমীন।

প্রবন্ধ সূত্রঃ মাসিক তরজুমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *