সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > ইসলামের ইতিহাস > ‘খিলাফত আন্দোলন’ ও ইমামে আহলে সুন্নাত ইমাম আহমদ রেযা বেরলভী

‘খিলাফত আন্দোলন’ ও ইমামে আহলে সুন্নাত ইমাম আহমদ রেযা বেরলভী

আল্লামা শায়খ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান

পাক-ভারত উপমহাদেশে ১৯১৯ ইংরেজিতে পরপর কয়েকটা ‘আন্দোলন’ হয়েছিলো। আর ওইগুলোর মধ্যে ‘খিলাফত আন্দোলন’, ‘অসহযোগ আন্দোলন’ ও ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য আন্দোলন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাসিক ‘সাওয়াদ-ই আযম’, মুরাদাবাদ এর “জুমাদাল উখ্‌রা” ১৩৩৯ হিজরী ‘সংখ্যায় এ সব ক’টি আন্দোলন সম্পর্কে হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী,(সম্পাদক মাসিক ‘সাওয়াদ-ই আযম’) ঐতিহাসিক প্রমাণাদির আলোকে যে পর্যালোচনা করেছেন, তা এ প্রসঙ্গে সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তাঁর আলোচনার ভিত্তিতে এ নিবন্ধে ‘খিলাফত আন্দোলন’ সম্পর্কে ইমামে আহলে সুন্নাত আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খাঁ ফাযেলে বেরলভী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তথা সুন্নী ওলামা-মাশাইখের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি-

  • খিলাফত আন্দোলন

ঐতিহাসিক ‘খিলাফত আন্দোলন’ ‘খিলাফত’ ও ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর সংরক্ষণের নামে আরম্ভ হয়েছিলো। এ সম্পর্কে মূল আলোচনার পূর্বে “খিলাফত আন্দোলন” সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার।
“খিলাফত” ইসলামের এক অনস্বীকার্য প্রতিষ্ঠান। ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে সদা সজীব রাখা ও ইসলামের ইতিহাস সৃষ্টির ক্ষেত্রে খিলাফতের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বনবী হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত শরীফের পরবর্তী ত্রিশ বছর “খোলাফা-ই রাশেদীনে”র শাসনামল হিসেবে প্রসিদ্ধ। রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ত্যাগী অনুসারী ও সহচর হিসেবে প্রথম চারজন খলীফা নিঃসন্দেহে সর্বোৎকৃষ্ট। তাঁরা আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের নির্দেশিত পথে ইসলামের ভূ-খণ্ডসমূহ শাসন করতেন।

ভারতীয় উপমহাদেশেও মুসলমানদের নিকট খিলাফতের গুরুত্ব ছিলো অত্যধিক। এখানে ব্রিটিশরাজও মুসলমানদের এ অনুভূতি সম্পর্কে অবগত ছিলো। ওইদিকে তুরস্কের মুসলিম শাসকগণও তাঁদের উপাধি ‘খলীফা’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের পুণ্যভূমি আরবের মক্কা এবং মদীনা শরীফও তাঁদের খিলাফতাধীন ছিলো। সুতরাং তুরস্কের খিলাফত ছিলো মুসলমানদের নিকট পরম শ্রদ্ধার বস্তু। এ খিলাফতের প্রতি আনুগত্য ছিলো মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বলকান যুদ্ধের বিক্ষোভ ও প্রথম মহাযুদ্ধকালে তুরস্কের প্রতি ভারতের মুসলমানদের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিলো মূলত ‘খিলাফত’-এর প্রতি তাদের সম্মান ও আনুগত্যের পরিচায়ক। তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তারা ভারতীয় মুসলমানদের মনে এক কঠিন ও সুতীব্র আঘাত দিয়েছিলো। ভারতীয় মুসলমানদের শান্ত রাখার জন্য ব্রিটিশ সরকার বলেছিলো, তারা বাধ্য হয়ে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাদের যুদ্ধ নিছক তুর্কী সরকারের বিরুদ্ধে; ‘খলীফাতুল মুসলিমীন’ -এর বিরুদ্ধে নয়। তারা আরো প্রতিশ্রুতি দিলো যে, তারা ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর কোন ক্ষতি করবে না এবং সেগুলোর মর্যাদা পূর্ণমাত্রায় রক্ষা করবে। কিন্তু যুদ্ধাবসানের সাথে সাথে ব্রিটিশ সরকার তাদের পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিলো। সুতরাং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নতুন শক্তি নিয়ে দাঁড়ানোর কথা বলে ভারতে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য মুসলমানদের মধ্যে পূর্ণ উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। ইত্যবসরে অর্থাৎ ১৯১৯ সালের শেষার্ধে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলী (আলী ভ্রাতৃদ্বয়) কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করলেন এবং খিলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে লাগলেন। আর ক্রমশ এ আন্দোলন দেশব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী এক দুর্বার আন্দোলনের রূপ নেয়। উপমহাদেশের ইতিহাসে এটা ‘খিলাফত’আন্দোলন’ নামে প্রসিদ্ধ। [সূত্র: বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নয়ন, কৃত. ড. মুহাম্মদ আবদুল অদুদ ভূঁইয়া]

এদিকে এমতাবস্থায় সুন্নী ওলামা-মাশাইখ, বিশেষ করে ইমামে আহলে সুন্নাত আ’লা হযরত ফাযেলে বেরলভীর দৃষ্টিভঙ্গি, দিক-নির্দেশনা ও অবস্থান ছিলো অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

উল্লেখ্য, খিলাফত আন্দোলনে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিরোধী লোকেরা এগিয়ে গিয়ে নেতৃত্ব হাতে নিয়ে নেন। কিছু সংখ্যক সুন্নী আলেমও এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, যদিও তাদের সংখ্যা ছিলো সুন্নী বিরোধীদের তুলনায় অতি নগণ্য। এ উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে আন্দোলনে নেতৃত্বদাতারা আ’লা হযরত ও সুন্নী ওলামা প্রমুখের সাথে আদর্শ বা আক্বীদাগত বিরোধ বশত, তাঁদেরকে এড়িয়ে চলে, আন্দোলনকে নিজেদের গতিতে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো, এদিকে একই কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত, বিশেষত আ’লা হযরত বেরলভীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপবাদ ছড়িয়ে দিলো যে, তাঁরা ‘খিলাফত’ ও ইসলামের পবিত্র স্থান ও নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের বিরোধী। এটা ওহাবীদের একটি সুন্নী বিরোধী চাল ছিলো বললেও অত্যুক্তি হবেনা। অথচ বাস্তবাবস্থা তেমনি ছিলো না। মৌলিক আন্দোলনের তাঁরা মোটেই বিরোধী ছিলেন না, বরং পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁদের বিরোধ ছিলো। আ’লা হযরত তাঁর আপন ‘ফাতাওয়া’য় একথার বিবরণ সুস্পষ্ট ভাষায় দিয়েছেন। বিরোধী মোর্চা থেকে আ’লা হযরতের বিপক্ষে প্রচারিত অপবাদের খণ্ডন করেছেন। আ’লা হযরতেরই খলীফা তাজুল ওলামা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হির রাহমাহ্। তিনি লিখেছেন, “একথা ভাবতেও আশ্চর্যবোধ হয় যে, দ্বীন-ইসলাম ও শরীয়তের সংরক্ষককে ‘ইসলামী সালতানাৎ’ (খিলাফত) ও ‘পবিত্র স্থানগুলোর সংরক্ষণের’ বিরোধী মনে করা হচ্ছে, আর ওই সব লোককে, যাদের মতে তারা ছাড়া গোটা দুনিয়া মুশরিক, গম্বুজ নির্মাণ বিদ’আত-নাজায়েয ও ভেঙ্গে ফেলা জায়েয, এগুলোর রক্ষাকারী ও মদদদাতা মনে করা হচ্ছে! লা-হাওলা ওয়ালা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! ”
[মাসিক সাওয়াদ-ই আযম, শাওয়াল, ১৩৩৮হি. সংখ্যা, মুরাদাবাদ, ভারত দ্রষ্টব্য]

বস্তুত ‘খিলাফত আন্দোলন’ তথা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে, তাদের ওয়াদাভঙ্গ ও মুসলমান খলিফা (তুর্কী)’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও তাঁদেরকে বিপর্যস্ত করার বিরুদ্ধে জিহাদ-আন্দোলন করা অপরিহার্য ছিলো। কিন্তু যারা ওইসময় যেভাবে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো তাদের দ্বিমুখী ভূমিকা ও যথার্থ প্রস্তুতিবিহীন জিহাদের নামে উত্তেজনা সৃষ্টি ছিলো সন্দেহজনক ও মুসলমানদেরকে ধ্বংস করে ফেলার শামিল। সুতরাং আ’লা হযরত তথা সুন্নী মোর্চা থেকে আন্দোলনের ধরনাকে আরো সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত করার প্রতি পরামর্শ দেওয়া হয়েছিলো। সেজন্য আ’লা হযরতের খলীফা তাজুল ওলামা মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হির রাহমাহ্ মুসলমানদের প্রতি এই জ্বালাময়ী আপীল (আহ্বান) জানিয়েছিলেন-
“মুসলমান ভাইয়েরা সাবধান! নিজেদের দ্বীনকে হিফাজত করার চেষ্টা করুন! সরল-সঠিক পথে (সিরাতুল মুস্তাক্বীম) অটল থাকুন! ইসলামী রাষ্ট্রে যেসব আলিম সম-আক্বীদা ও সমমনা আছেন তাঁদের অনুসরণ করুন! ইসলামের উপরই দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকুন! যাতে কোন ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা ও কোন তুফানের ঝাঁকুনি আপনাদেরকে আপন আপন অবস্থান থেকে হেলাতে না পারে বন্ধুবেশে আগত শত্রু, সমবেদনা ও ভালবাসার বুলি আওড়িয়ে আকৃষ্টকারী রক্তপিপাসু ধোঁকা দিয়ে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে না পারে।

স্মরণ রাখবেন, রাজনৈতিক ময়দানে যখন কোন আন্দোলন চলে এবং উস্কানীদাতারা তাতে উস্কানী দেয়, তখন আন্দোলনের উত্তেজনায় সাধারণ লোকদের বিবেকবুদ্ধি দূরীভূত হয়ে যায়। আবেগের পাকড়াও মজবুত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় নিজে বুঝা তো দূরের কথা, অন্য কেউ বুঝালেও বুঝে আসে না। ঠিক এমনই অবস্থা ‘খিলাফত আন্দোলন’-এর সময়ও হয়েছিলো। একদিকে ঢাল-তলোয়ার ব্যতীত জিহাদের প্রস্তুতি, অন্যদিকে নেতাদের ভ্রমণ-বিলাসিতা এবং কথা ও কাজে গরমিল আন্তরিকভাবে অবস্থা পর্যবেক্ষণকারীদের মনে এ আন্দোলন কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক করেছিলো। আর ভবিষ্যৎ স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলো যে, তাঁদের ওই সন্দেহ সঠিক ছিলো।”
হযরত তাজুল ওলামা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী রাহমাতুল্লাহি তা’আলা আলায়হি খেলাফত আন্দোলনে যারা সোচ্চার ছিলেন তাদের কথা ও কাজের অমিল কোথায় ছিলো সে সম্পর্কে আরো বলেন,
“কে বলছে জিহাদ ফরয নয়? কিন্তু জিহাদের জন্য নিজেদের শক্তির দিকে দেখাও পূর্বশর্ত। আমরা হাতিয়ার তো স্বপ্নেও দেখিনি। এও জানা নেই যে, বন্দুক কোন দিক থেকে চালানো হয়। আমাদের ঐক্যের অবস্থাও এমন যে, দু’জন লোক ও সমমনা এবং এক দৃষ্টিভঙ্গিতে একাত্মতা পোষণ করার নেই।”

বস্তুত যুদ্ধের কল্পনা করা যায় তখনই, যখন জাতি বা সম্প্রদায় একমত ও ঐক্যবদ্ধ হয়, তাদের সামাজিক অবস্থাও ঠিক থাকে, যুদ্ধ বিদ্যায়ও তাদের দক্ষতা থাকে এবং যুদ্ধের হাতিয়ারও প্রস্তুত থাকে। এগুলো ব্যতীত যুদ্ধ করা মানে মৃত্যুকে দাওয়াত দেওয়া। ‘খিলাফত আন্দোলন’-এর সময় না এসব উপকরণ মওজুদ ছিলো, না এমন অবস্থা ছিলো। সাধারণ তো সাধারণ, কিছু কিছু বিশেষ ব্যক্তি ও কিছু সংখ্যক সুবিধাবাদী রাজনীতিকের চাল-চাতুরীর শিকার হয়ে গিয়েছিলেন। এ স্ববিরোধিতা দেখে সদরুল আফাযিল হযরত সৈয়্যদ নঈমী উদ্দীন মুরাদাবাদী রাহমাতুল্লাহি আলায়হিও ওইসব বিরোধী লোককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ওইসব লোকের অন্তরগুলোতে কি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি আন্তরিকতা আছে? না তারাও নড়বড়ে ও অস্থির? তারা একদিকে জনসাধারণকে জিহাদের কথা বলছিল, অন্যদিকে খেলা-তামাশা ও আনন্দ-আহলাদের সভা-মাহফিলও সুসজ্জিত হচ্ছিলো।”

  • ইমাম আহমদ রেযার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপবাদ রচনা

যখন আহলে সুন্নাতের আলিমগণ, বিশেষ করে আ’লা হযরত বেরলভী, সদরুল আফাযিল আল্লামা নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী ও তাজুল ওলামা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হির রাহমাহ্ এসব গোপন বিষয়াদি সম্পর্কে মুসলমানদেরকে অবগত করলেন, তখন উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক আন্দোলন পরিচালিত হলো, আর একথা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলো যে, আলিমদের এ অংশটি ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিপক্ষে, বরং ইংরেজদের ভাতা ও বেতনভুক্ত। (নাউযুবিল্লাহ)

  • মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী কর্তৃক খণ্ডন

এ ভিত্তিহীন অপবাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে তাজুল ওলামা মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হির রাহমাহ্ ‘মাসিক সাওয়াদ-ই আযম’, ১৩৩৯ হিজরীর এক সংখ্যায় লিখেছেন-
“এমন কোন বিষয় আছে, যার কারণে ইসলামের এমন দক্ষ ও বিজ্ঞ আলিমদেরকে ব্রিটিশ সরকারের বেতনভুক্ত মনে করা হচ্ছে? ইসলামের নিদর্শনগুলো নিশ্চিহ্ন‎ হওয়ায় রাজি না থাকা, মুসলমানদেরকে শির্কী প্রথাগুলোতে মগ্ন হওয়ায় বাধা সৃষ্টি করা কি ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ কোন কাজ? না এতদ্ব্যতীত তাঁরা ব্রিটিশ সরকারকে কোন বিষয়ে সাহায্য সহযোগিতা করছেন?” বরং প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে- স্বার্থপর লোকেরা ভালভাবে জানে যে, আলিমগণ কখনো বক্রতা ও পথভ্রষ্টতাকে সহায়তা করেন না। এ কারণে তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সরল প্রাণ জনসাধারণকে আলিমদের প্রতি সন্দিহান ও মন্দ ধারণা বিশিষ্ট করে তোলাকে জরুরী মনে করে থাকে। যখন বিজ্ঞ আলিমদের কথা জনসাধারণ পর্যন্ত পৌঁছবে না এবং তাঁদেরকে অহেতুক ব্রিটিশ সরকারের লোক মনে করে তাঁদের তারা কথায় কান দেবে না, তখন মি. গান্ধীসহ গান্ধীর সমমনা নেতাদের যাদুমন্ত্র কার্যকর হওয়া অসম্ভবই হবে না। এর অর্থ এও হতে পারে যে, মুসলমানগণ তাঁদের ধর্মের মৌলিক নিদর্শন ও বিধানাবলী সম্পর্কে উদাসীন হয়ে হিন্দুদের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকবে। যেমনটি তাঁরা ধারণাও করেছিলেন।

‘আখবারুল ফক্বীহ্’ (অমৃতস্বর)-এর মে, ১৯৩১ ইংরেজী সংখ্যার বরাতে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছিলো। তাতে বলা হয়েছিলো যে, ‘এক নও মুসলিমকে মুরতাদ বানানোর জন্য হিন্দুদের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হলে, তার বিরুদ্ধে আহলে সুন্নাতের আলিমগণ তীব্রভাবে রুখে দাঁড়িয়েছেন ইত্যাদি।’ এ সংবাদের দিকে ইঙ্গিত করে সদরুল আফাযিল হযরত মাওলানা সৈয়্যদ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী (খলীফা-ই আ’লা হযরত) লিখেছেন-
“এসব ঘটনা কি শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য যথেষ্ট নয়? কখনো কি ইসলামের শত্রুদের ধবংস করা ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ কোন উদ্দেশ্য ছিলো, যার কারণে ইসলামের আলিমদের এবং দ্বীনের কর্ণধারদেরকে সরকারের লোক বলে অপবাদ দেয়া হচ্ছে? শত্রুদের এসব রাজনৈতিক চালের কথা উল্লেখ করার পর তাজুল ওলামা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হি রাহমাহ্ এ বলে ভারতের মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন-
“মুসলমান, সাবধান! ইসলামরূপী সম্পদের সংরক্ষণ করো! নিজেদের দ্বীন ও মিল্লাতকে রক্ষা করো! নিজেদের অস্তিত্ব নিজেদের হাতে ধবংস করোনা! হে মহান রব! মুসলমানদের প্রতি দয়া করো! হে আরবের মুকুটধারী নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম! উম্মতের এমন অসহায়ত্বের প্রতি কৃপাদৃষ্টি দিন! আল্লাহ্ করুন! আমাদের দেশের নেতাগণ ধর্মপরায়ণ হোন! তাঁরা যেন পবিত্র শরীয়তের পুণ্যভূমি ও সীমারেখার সংরক্ষণকে নিজেদের সৌভাগ্য মনে করেন!”

তাদের অপবাদের প্লাবণ আ’লা হযরতের দিকেও ধাবিত হয়েছিলো। তারা পরিকল্পিতভাবে তাঁর প্রতি একটি/দু’টি নয় বরং কয়েকটা অপবাদ দিয়েছিলো। সেগুলো হচ্ছে- আ’লা হযরত নাকি
১. ইসলামী সালতানাৎ (খিলাফত) -এর বিরোধী,
২. ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর সংরক্ষণকে জরুরী মনে করে না।
৩. নিনিতালে গিয়ে লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
৪. ব্রিটিশ সরকারকে খুশী করার জন্য তাদের ইচ্ছানুসারে ফাত্ওয়া আরোপ করেছেন।
৫. সরকার থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন এবং
৬. কানপুরে অনুষ্ঠিত আন্তঃপ্রদেশ ‘হানাফী-সুন্নী’ জলসায় শত অনুরোধ সত্ত্বেও যোগদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
তখনকার সময়ে মাওলানা আহমদ মোখতার সিদ্দীক্বী মিরাঠী রাহমাতুল্লাহ্ আলায়হি উক্ত সব অপবাদের জবাব আপন মুর্শিদ ও উস্তাদ আ’লা হযরত ফাযিলে বেরলভী আলায়হির রাহমাহ্ থেকে চেয়েছিলেন। খোদ্ আ’লা হযরতও ওই অপবাদগুলোর নিম্নলিখিত জবাব লিখে পাঠিয়েছিলেন-

প্রথমতঃ ইসলামী সালতানাত(সাম্রাজ্য) যদিও মন্দ আমল ও ভ্রান্ত আক্বীদাসম্পন্ন হয়। তবে যদি তাদের ভ্রান্ত ধারণা কুফরের সীমা পর্যন্ত না পৌঁছে যদি কাফিরদের সাথে তাদের যুদ্ধ বাধে, তবে মুসলমানদের উপর তাদের নিজেদের সামর্থ্যানুসারে সাহায্য করা ফরয; সাধ্যের অতিরিক্ত নয়।

দ্বিতীয়তঃ অনুরূপ পবিত্র স্থানগুলোও ইসলামের সমস্ত নিদর্শনের সংরক্ষণ করাও সাধ্যানুসারে করা ফরয।

তৃতীয়তঃ ল্যাফটেন্যান্ট গভর্ণরের সাথে সাক্ষাৎ, ব্রিটিশ সরকারের খেয়ালখুশী অনুসারে ফাত্ওয়া আরোপ করা ও ইংরেজদের নিকট থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করার যে অভিযোগ তারা এনেছে সে সম্পর্কে আমার নিকট এর চেয়ে উত্তম জবাব আর কি হতে পারে- لَعَنَةُ اللّهِ عَلى الْكَاذِبِيْنَ (লা’নতুল্লাহি আলাল কাযেবীন) অর্থাৎ মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত অবধারিত। তাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তাঁর রসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর নেক্‌কার বান্দাদের অভিসম্পাত বর্তাবে।

চতুর্থতঃ মৌলভী নেসার আহমদ সাহেব কানপুরী ‘আন্তঃপ্রদেশ জমিয়তুল ওলামার দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন। আমি তাদের উদ্দেশ্যাবলী, হিন্দুদের সাথে ঐক্য, দেওবন্দী-ওহাবীদের অংশগ্রহণ ও তাদের সদস্যপদপ্রাপ্তি ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাবে বললেন, “আমরা খাঁটি আহলে সুন্নাতের জলসা করবো। আমি বললাম, করুন! আমিও খাঁটি আহলে সুন্নাতের একজন খিদমতগার হিসেবে আমার লিখিত বক্তব্য পাঠিয়ে দেবো, যা জলসায় পড়ে শুনিয়ে দিন! আমি শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার কারণে হাযির হতে পারবো না।”
[সূত্র: ‘তাহরীক-ই আযাদী-ই হিন্দ’ ও ‘সাওয়াদ-ই আযম’, পৃ. ২০৫, লেখক, ড. মাসঊদ আহমদ]

এতে সন্দেহ নেই যে, ‘খিলাফত আন্দোলন’ ও তার উদ্দেশ্যাবলীর সাথে আ’লা হযরতের মৌলিক কোন বিরোধ ছিলোনা; কিন্তু আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট বিরোধ ছিলো। বিরুদ্ধবাদীদের অভিযোগ-অপবাদের খণ্ডনে তাজুল ওলামা মাওলানা মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হির রাহমাহ্ লিখেছেন-
“এ কথা কতোই আশ্চর্যের যে, দ্বীন-ইসলাম ও শরীয়তের সংরক্ষককে ইসলামী সালতানাত ও পবিত্র স্থানগুলোর বিরোধী মনে করা হচ্ছে, আর ওহাবীগণ, যারা নিজেদের ব্যতীত গোটা দুনিয়াকে মুশরিক মনে করে, যাদের মনে গম্বুজ বানানো নাজায়েয ও ধবংস করা জায়েয, তাদেরকে সেগুলোর সমর্থক ও মদদগার মনে করা হচ্ছে !…নাঊযুবিল্লাহ!”
[সূত্র: ‘সাওয়াদ-ই আ’যম’ জুমাদাল উখরা, ১৩৩৯হি. সংখ্যা পৃ.২৩-২৪]

আধুনিক রাজনীতিতে উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয়, উপকরণাদির প্রতি নয়; কিন্তু শরীয়তভিত্তিক রাজনীতিতে উদ্দেশ্য ও উপকরণাদি উভয়ের দিক দৃকপাত করা জরুরী। এ কারণে শেষোক্ত রাজনীতি প্রথমোক্ত রাজনীতি অপেক্ষা অধিকতর স্পর্শকাতর (নাজুক)। সুতরাং আ’লা হযরত ‘খেলাফত আন্দোলন’-এর ক্ষেত্রে উপকরণাদির বিষয়াদি খুব যাচাই-বাছাই করে নিম্নলিখিত আপত্তি (প্রশ্ন)গুলো আরোপ করেছিলেন, যদি অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো এবং ন্যায়পরায়ণতা ও ইসলামী অহমিকা সহকারে (আ’লা হযরতের) ওই আপত্তিগুলোকে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে সেগুলোকে অতিমাত্রায় বাস্তব বলে মনে হয়। আর এর বিপরীতে তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন মনে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, খিলাফত আন্দোলনের সময় নিম্নলিখিত বিষয়াদি শরীয়তের সম্পূর্ণ বিরোধীস্বরূপ, তাতে
১. মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব ও ঐক্য স্থাপন করা হয়েছিলো,
২. তাদেরকে চুক্তিবদ্ধ ও বন্ধুপক্ষ করা হয়েছে,
৩. তাদেরকে অন্তরঙ্গ ও কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপকারী সাব্যস্ত করা হয়েছে,
৪. তাদেরকে নিজেদের বন্ধু, মদদগার, হিতাকাকাংখী ও শোক-দুঃখের সাথী বানানো হয়েছে,
৫. তাদেরকে নেতা বানানো হয়েছে,
৬. কোরআন-হাদীসের পূর্ণ বয়সকে মূর্তি পূজারী কিংবা মূর্তি পূজার বেদীতে উৎসর্গ করা হয়েছে,
৭. তাদের (হিন্দুগণ) প্রতি খুব সম্মান দেখানো হয়,
৮. তাদের প্রশংসার জঘন্য সীমালঙ্ঘন করে গীত গাওয়া হয়েছে,
৯. তাদেরকে মসজিদে নিয়ে মুসলমানদের ওয়াইয (নসীহতকারী) করা হয়েছে এবং
১০. তাদের খুশী করার জন্য ইসলামী শ্লোকাদি মুছে ফেলা হয়েছে ইত্যাদি এবং
১১. তখন এমন একটি ধর্ম বানানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছিল, যাতে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য উঠে যায়।
মুসলমানদের দিক থেকে এমন অদূরদর্শিতা প্রদর্শনের কারণে হিন্দুগণ এ দুঃসাহস দেখিয়েছিলো যে, তারা গাভী যবেহ ও গাভীর গোশ্‌ত খাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবী তুলে ছিলো। সুতরাং ‘হামদম’, দিল্লী’র ১৫ জানুয়ারী ১৯২০ ইংরেজী সংখ্যায় একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছিলেন, যাতে বিজ্ঞাপনদাতার পক্ষ থেকে এমন একজন লেকচারার চাওয়া হয়েছে, যে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে গিয়ে মীলাদ খানি করবে এবং এরপর গোশ্‌ত ভোজন বর্জনের পক্ষে দরস দেবে। একই পত্রিকার ১৪ জুন ১৯২৭ ইংরেজী সংখ্যায় আল্লামা গোলাম ভেক নায়রঙ্গী (খলীফা-ই সাইয়্যেদুনা আশরাফী মিঞা আলাইহির রাহমাহ্) আম্বালা থেকে খবর দিয়েছেন যে, ‘নালাগড়’ রাজ্যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গাভী যবেহ, নির্দেশ জারী করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
১২. মুসলমান তাদের মাথায় চন্দন লাগিয়েছে। (২২ জানুয়ারী, ১৯২০ ইংরেজী তারিখে মিরাঠে মি. গান্ধীর আগমন উপলক্ষে মুসলমানগণ কপালে চন্দন লাগিয়েছিলো),
১৩. ‘হিন্দুগণ এবং গাভী-মাতার জয়’ শ্লোগান দেয়া হয়,
১৪. কোরবানীর গাভীর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে, বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে গো-শালায় পৌঁছিয়ে দেয়া হয় এবং
১৫. মুশরিকদের লাশ বহনের সময় কাঁধ লাগিয়ে শশ্মানে নিয়ে যায়।

(১। মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গী মহল্লী মি. গান্ধীর নেতৃত্বকে নিয়ে গর্ব করেছেন। মৌলভী মুহাম্মদ আলী জওহার কংগ্রেসের সভায় পণ্ডিত মনমোহন মালভিয়াহর কদমের উপর মাথা রেখে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, মৌলভী শওকত আলী তাকে পাখা করে ছিলেন। এরা উভয়ে ছিলেন খিলাফত আন্দোলনের বড় বড় নেতা।
[সূত্র. হামদম পত্রিকা, ৪ জানুয়ারী, ১৯২৮ ইং, সংখ্যা।]এমনকি কংগ্রেসী মৌলভী যোফরুল মুল্ক ও মৌলভী ইসহাক্ব আলী মি. গান্ধীর প্রসঙ্গে এ পর্যন্ত বলে ফেলেছিলেন- (নাঊযুবিল্লাহ) যদি নবূয়তের ধারা শেষ না হতো, তবে মহাত্মা গান্ধী নবী হতেন।
[সূত্র: ‘মাসিক সাওয়াদ-ই আযম’ শা’বান ১৩৩৯ হিঃ সংখ্যা, পৃ. ৪, এবং ‘দাবদাবাহ্-ই সেকান্দরী’ রামপুর, ১ নভেম্বর ১৯৯২ইংরেজী]

২। ১৯১৯ ইংরেজীর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ‘মুসলিম লীগ’ এর দ্বাদশ সভায় সভাপতির বক্তব্যে হাকীম আফজাল খান মরহুম মুসলমানদেরকে হিদায়ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা যেন হিন্দুদের সন্তুষ্টির জন্য গাভী কোরবানী বর্জন করেন। এর বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ থেকে বিশেষতঃ সুন্নী আলিমদের পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
[সাওয়াদ-ই আ’যম ১৩৩৮হি. সংখ্যা] )

হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ ওমর নঈমী আলায়হির রাহমাহ্ বলেন, এমতাবস্থায় একজন ইসলামী অহমিকাপূর্ণ আলিম আ’লা হযরত বেরলভী যদি এমন আন্দোলন থেকে নিজেকে পৃথক রেখে খাঁটি মুসলমানদেরকে নিজেদের পৃথক মোর্চা থেকে আন্দোলনের ডাক দেন, তাহলে তো তিনি কোন গুনাহ্ করেননি; বরং উপরিউক্ত তালিকায় এমন কিছু বাস্তবতাও আছে, যেগুলো ঐ বিগত যুগের মুসলমান মাত্রই কারো সমীচীন হতে পারে না। এসব পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার কথা উল্লেখ না করে শুধু একথা প্রচার করে মিথ্যাচার করা হয়েছে যে, আ’লা হযরত ফাযেলে বেরলভী ‘খিলাফত আন্দোলন’-এর বিরোধী ছিলেন। শুধু তা নয়, বরং তিনি নাকি ইংরেজদের এজেন্ট ছিলেন। এটা তাদের অধার্মিকতা ও অবিশ্বস্ততাই ছিলো। এমন ইতিহাসবিদদের ব্যাপারে খবর নেয়া দরকার।

মোটকথা, ‘খিলাফত আন্দোলন’কে কেন্দ্র করে ওহাবী-হিন্দু নেতারা মিলে তাদের কর্মপন্থার বিরোধীদের, বিশেষ করে আ’লা হযরত ও তাঁর পরিবারের ওলামা ও আহলে সুন্নাতের আলিমদের বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র করেছিলো। আ’লা হযরতের ওফাত শরীফের পরে তাদের শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র আরো বৃদ্ধি পেয়েছিলো; কিন্তু আ’লা হযরত তাঁর জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর সাহেবজাদা ও খলীফাগণ তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্লাবনের বিরুদ্ধে অতি সাহকিতার সাথে সফল মোকাবেলা করেছেন এবং মুসলমানদেরকে এমন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছেন, যা ভারতের বুকে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র (পাকিস্তান) প্রতিষ্ঠা লাভ করা পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়েছিলো।

সুতরাং ২২, ২৩ ও ২৪ শা’বান ১৩৩৯ হিজরিতে (১৯২০ইংরেজী) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সংগঠন ‘তান্যীম-ই আনসারুল ইসলাম’ -এর আহ্বানে বেরেলী শরীফে শানদার জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে আ’লা হযরতের প্রস্তাব অনুসারে খাঁটি মুসলমানগণ পৃথকভাবে ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর হিফাযত ও তুর্কি সালতানাতের (খিলাফত) সাহায্য করার বিষয়ের উপর বিশেষভাবে আলোচনা, দাবী উত্থাপন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ বিশাল জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন-
১. মাওলানা সাইয়্যেদ শাহ্ মুহাম্মদ মিঞা ক্বাদেরী বরকাতী (মারহারাহ্ শরীফ),
২. মাওলানা মুহাম্মদ যোফর উদ্দীন ক্বাদেরী বিহারী (খলীফা-ই আ’লা হযরত মাদরাসা-ই শামসুল হুদা, পাটনা, বিহার),
৩. সদরুল আফাযিল সাইয়্যেদ মাওলানা মুহাম্মদ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী (খলীফা-ই আ’লা হযরত, জামেয়া নঈমিয়া, মুরাদাবাদ)
৪. প্রফেসর সাইয়্যেদ সালমান আশরাফ বিহারী (মুসলিম ইউনিভার্সিটি, আলীগড়),
৫. মাওলানা সাইয়্যেদ দীদার আলী শাহ্ (দারুল উলূম হিযবুল আহনাফ, লাহোর) প্রমুখ।
এ হযরতগণ তুর্কিদের সাহায্য, পবিত্র স্থানগুলোর হিফাযত ও অসহযোগ আন্দোলনের উপর সপ্রমাণ ও সারগর্ভ বক্তব্য পেশ করেছিলেন।

এ জনসভায় গৃহীত প্রস্তাবগুলো হলো-
১. ওলামা-ই আহলে সুন্নাত ও বেরিলীর মুসলমানদের এ আযীমুশ্ শান জলসা বৃটিশ সরকারের প্রতি জোর দাবী জানাচ্ছে যে, তারা যেন নিজেরা ও তাদের মিত্রশক্তিগুলোর প্রভাব প্রতিপত্তি আরব ব-দ্বীপ থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেয় এবং মুসলমানদের উপর তাদের অন্যায় হস্তক্ষেপ জনিত দুর্ভোগ চাপিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকে।
২. এ জলসা তুরস্ক ও আরবভূমিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য অবিলম্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠাবে। আর ব্রিটিশ গভর্ণম্যান্টের প্রতি জোর দাবী জানাচ্ছে যেন আরব ভূমিতে আমাদের প্রতিনিধিদের নিরাপদে পৌঁছানোর পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করে।
৩. এ জলসা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি জোর দাবী জানাচ্ছে যেন সরকার সমর্থণ ইত্যাদির মজলূমদের নিকট যথাযথ আর্থিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছানোর জন্য সন্তোষজনক ব্যবস্থা করে।
৪. এ জলসা মুসলমানদের প্রতিও আহ্বান জানাচ্ছে যেন তাঁরা তাঁদের পরস্পরের মধ্যে চলমান মামলা-মুকাদ্দমাগুলোর মধ্যে যেগুলো পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করে নেয়ার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছেন; সেগুলো যেন শরীয়তের ফয়সালা অনুসারে মীমাংসা করে নেন। আর ইংরেজদের দ্বারা পরিচালিত কোর্ট-কাচারীতে মামলা-মুকাদ্দমা, যেগুলো উভয়পক্ষের জন্য ধ্বংসের কারণ হয়; দায়ের না করে সেগুলো থেকে বিরত থাকেন।
৫. এ জলসা এরও জোর দাবী জানাচ্ছে যেন ব্রিটিশ সরকার এমন কোন আইন পাস না করে, যা কোন ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কিংবা ক্ষতি হবার জন্য সম্ভাবনাময় হয়।
৬. এ জলসা মুসলমান ভাইদেরকে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি করার জন্য উৎসাহিত করার প্রস্তাব পাস করছে। আর এ জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণাদি এমনভাবে বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করছে যেন, মুসলমানগণ কখনো কোন অনৈসলামিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মুখাপেক্ষী হতে না হয়।
৭. এ জলসা ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার প্রতি মুসলমান ভাইদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, যাতে মুসলমানগণ অমুসলিমদের হাতের ক্রীড়ানক হতে না হয়।
৮. এ জলসা আরো প্রস্তাব করছে যেন ব্যবসায়ী ও ধনীরা সম্মিলিতভাবে একটি ইসলামী ‘ধনভাণ্ডার’ প্রতিষ্ঠা করার যৌথ প্রচেষ্টায় নামে, যাতে মাসে-মাসে,বছর -বছর কিছু অর্থ জমা করা হয় এবং যথাসময়ে মুসলমানদের ব্যবসা প্রসারের প্রয়োজনে, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং ইসলামের প্রয়োজনে তা থেকে ব্যয় করা সম্ভবপর হয়।
৯. এ জলসা দ্বীনী ইল্‌ম ও আহলে সুন্নাত ওয়া জামা’আত অনুসারে, (তদানীন্তন) হেরমাঈন শরীফাঈনের আক্বীদাসমূহের প্রচার-প্রসারের প্রতি অত্যন্ত তাকীদ সহকারে মনযোগ দেয়ার জন্য মুসলমানদেরকে আহ্বান জানাচ্ছে।
১০. এ জনসভা প্রস্তাব করছে যেন, যেসব ভুল পন্থা, অবৈধ রাস্তা এবং ক্ষতিকর প্রথাকে ভুলবশত শরীয়তের রূপ দেয়া হয়েছে, সেগুলোর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে মুসলমানদেরকে লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে অবহিত করা হয়।
[সূত্র: মাসিক সাওয়াদ-ই আ’যম]

উপরিউল্লিখিত প্রায় সব প্রস্তাবই হচ্ছে ঐসব পথ-নির্দেশনার শামিল, যেগুলো ১৯১২ ইংরেজী সনে আ’লা হযরত মাওলানা শাহ্ আহমদ রেযা খান বেরলভী আলাইহির রাহমাহ্ দিয়েছিলেন। যদি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিতে দেখা যায়, তবে প্রস্তাবগুলো অতীব বাস্তব। ইসলামী ব্যাংক করার প্রস্তাব, যা আজ থেকে প্রায় এক শ’ বছর পূর্বে ওলামা-ই আহলে সুন্নাত বেরিলী শহরে পেশ করেছিলেন, ইসলামী বিশ্ব আজ তা বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রস্তাবে বিবেক-বুদ্ধির অভিব্যক্তি রয়েছে, বেদনা এবং জ্বালাও রয়েছে। এটা বিবেকবান মাত্রই উত্তমরূপে বুঝতে পারেন। প্রস্তাবনা সন্দেহাতীতভাবে নিরূপণের পরে আসে। প্রথমে রোগ নিরূপন করা হয়, তারপর চিকিৎসা করা হয়। রোগ নির্ণয় বা নিরূপন ব্যতীত চিকিৎসা প্রাণনাশকও হতে পারে। তুর্কিদের সাহায্যের পূর্বে একথাও জেনে নেয়া জরুরী ছিলো যে, তাদের এ পতন কোন্ কোন্ কারণে নেমে এসেছে। এটাও জানা দরকার ছিলো যে, এটা ঘটনাচক্রে হঠাৎ এসেছে না ক্রমান্বয়ে এসেছে। এসব কারণের উপর আলোকপাত করে তাজুল ওলামা ওই পতন ও বিপর্যয়ের নিম্নলিখিত কারণগুলো চিহ্ণিত করেছেন-
১. তুরস্কে মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ,
২. তুর্কী জাতির অমঙ্গলকামী তাদের নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো যারা তাদের শত্রুদের সাথে আতাঁত করে বসেছিলো,
৩. আইন-শৃংখলার অবনতি। তাদের প্রত্যেকে পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করেছিলো।
এসব ব্যাধির চিকিৎসা তাজুল ওলামা আলায়হির রাহমাহ্ এগুলোই পেশ করেছিলেন –
১. ইসলামী ঐক্যের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তাদেরকে ইসলামী সালতানাতের পক্ষে দাঁড় করানো,
২. দেশ ও জাতিকে বিদেশীদের হাতে বিক্রি করাকে সাধারণের দৃষ্টিতে হীন করে দেখিয়ে ঐ বিষাক্ত ও মারাত্মক মহামারীর অশুভ প্রভাব থেকে সেখানকার অধিবাসীদের রক্ষা করা,
৩. বিশ্ব মুসলিমের আবেগ ও প্রেরণাকে তাদের মধ্যে যথাযথভাবে প্রচার করে তাদের মধ্যে নব-উদ্দীপনা সৃষ্টি করা।

নিরূপন ও প্রস্তাবনার পর হযরত তাজুল ওলামা ‘খেলাফত আন্দোলন’-এর নেতাদের প্রতি নিম্নলিখিত প্রশ্নাবলী উপস্থাপন করলেন-
১. এতদুদ্দেশ্যে মুসলমানদের কোন প্রতিনিধি দল কি কন্স্টন্টিটিপোল (ইস্তাম্বুল) পৌঁছেছে ?
২. আরবদেরকে তুর্কীদের সাথে একীভূত করার জন্য কি কোন প্রতিনিধি দল ওখানে গেছে?
৩. আরবদের পারস্পরিক অসন্তোষ ও যুদ্ধবাজি থামানোর জন্য কি কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে ?
৪. “যদি দু’জন মুসলমান পরস্পর ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তবে তৃতীয়জন তাদের মধ্যে সন্ধি করিয়ে দাও।” এজন্যও কি কখনো চেষ্টা করা হয়েছে?
পরিশেষে, খেলাফত আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হুঁশ ও বিবেককে কাজে লাগিয়ে পরিণামদর্শিতার সাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি লিখেছেন-
“আমাদেরকে এখন এটা গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার যে, আমাদের এসব কর্মকাণ্ড দ্বারা তুর্কীদের কোন উপকার সাধন করা সম্ভবপর কিনা। আশা-করি পরামর্শ ও পথ-নির্দেশকগণ আপন আপন বিবেককে হত বুদ্ধিকারী জোশ্ শূন্য করে এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবেন।”
খেলাফত আন্দোলন সম্পর্কে হযরত তাজুল ওলামা তথা আহলে সুন্নাতের ওলামার সন্দেহ বাস্তব রূপ নিয়েছিলো। ১৯২০ সালের জানুয়ারী মাসে ওহাবী মোর্চা থেকে ‘খিলাফত কর্মসূচী’ (Khilafat manifesto) প্রদান করা হয়েছিলো। উক্ত কর্মসূচীতে অবিলম্বে মুসলিম স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ না করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে ব্রিটিশ সরকারকে হুমকি দেয়া হলো, ব্রিটিশ সরকারের সাথে আলোচনা করার জন্য একটি প্রতিনিধি দল খিলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে ইংল্যাণ্ড গমন করলেন। সেখানে অবস্থানকালে প্রতিনিধিদল কিছু দাবী-দাওয়া পেশ করে সরকারের সাথে আলোচনাও করেছিলো বলে জানা যায়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেগুলোর প্রতি কোন গুরুত্বই দেয়নি। তারা খালি হাতে ব্যর্থ হয়ে ভারতে ফিরে আসলেন। ১৯২০ সালের অক্টোবর মাসে তারা ইংল্যাণ্ড থেকে ফিরে এসেছিলেন। ইতোমধ্যে ‘সেভার্স চুক্তি’ (Treaty of severs) প্রকাশিত হয়, যার ফলে সুবৃহৎ ‘আটোম্যান সাম্রাজ্য’ (ওসমানীয় সাম্রাজ্য) ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে যায়। তুরস্ক পরিণত হলো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে।

ইংল্যাণ্ড থেকে ফিরে এসে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ভারতের মুসলমান জনগণের কাছে এক আবেদন পেশ করলেন, যার মূল কথা ছিলো- “ভারতের মুক্তির জন্য হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের হাত মিলিয়ে চলতে হবে। কারণ এটা ব্যতীত ‘খিলাফত ও স্বাধীনতা’ কোনটাই নাকি সম্ভব হবে না।” সুতরাং এ সমস্ত কংগ্রেসী আলিমের নেতৃত্বে ভারতের মুসলমানদের একটি বিরাট অংশ হিন্দুদের নেতৃবৃন্দের (যেমন গান্ধী) প্রতি ঝুঁকে পড়লেন এবং তাদের সহানুভূতি লাভ ও সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করলেন। তাদেরকে খুশী করার জন্য মসজিদের মিম্বরে বসিয়ে বক্তৃতা দেওয়ানো ও ক্বোরবানীতে গাভী যবেহ নিষিদ্ধ করানো ইত্যাদির মতো অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করলেন। এদিকে মি. গান্ধীও মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলনকে যুক্তিযুক্ত বলে ঘোষণা দিয়ে ওই আন্দোলনরত মুসলমানদের জনপ্রিয় হয়ে ওঠলেন। তিনি এমন মুহূর্তকে সদ্ব্যবহার করলেন। তিনি এরপর ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘অসহযোগ আন্দোলন’ এর ঘোষণা দিলেন এবং এসব মুসলমানদের সাথে নিয়ে সুকৌশলে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যান। এ সুযোগটিকে আরো পাকাপোক্ত করার জন্য হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গঠনেরও আন্দোলন চালান।

আরো উল্লেখ থাকে যে, মি. গান্ধী হিন্দু প্রধান ভারতে হিন্দু রাজ্য গঠনের চেষ্টা করেন। আর আ’লা হযরত দিলেন ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’। তিনি ও সুন্নী নেতৃবৃন্দ মি. গান্ধীর চাল যেমন বুঝতে পারলেন, তেমনি তারা হিন্দুদের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের আদর্শকে বিসর্জন দেয়ার সম্পূর্ণ বিপক্ষে ছিলেন। ইংরেজদেরকে এদেশ থেকে তাড়ানো, তাদের সাথে অসহযোগ কোনটারই তাঁরা বিরোধিতা কখনো করেননি। তাঁদের আহ্বান ছিল মুসলমানগণ নিজেদের মান-মর্যাদা ও ইসলামের গৌরব রক্ষা করেই আন্দোলন পরিচালনা করুক!
ফলশ্রুতিতে এ আন্দোলন ভারত বর্ষে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছিলো। ফলে বিগত ১৯৪৭ সালে ইংরেজগণ মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র ‘পাকিস্তান’ও হিন্দুদের জন্য ভারত রাষ্ট্রের নিকট ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ভারত ত্যাগ করেছিলো। পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে ‘বাংলাদেশ’ স্বাধীন হয়েছে। অন্যথায় মি. গান্ধীর পরিকল্পনানুসারে যদি ভারতের সমস্ত মুসলমান তার নেতৃত্বে ভারত স্বাধীন করতেন, তবে কস্মিনকালেও উপমহাদেশে মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র হতো কিনা তো বলা মুশকিল।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, আ’লা হযরত ও সদরুল আফাযিল তথা সুন্নী ওলামা-সাধারণ স্বাধীনতা আন্দোলনে পৃথকভাবে কোন না কোন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিলেন; পক্ষান্তরে, কংগ্রেসী, দেওবন্দী ও আহলে হাদীসের আলেমগণ মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের চিন্তাও করেননি; বরং তারা দ্বি-জাতি তত্ত্বের পক্ষে ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিলেন। মোটকথা, তাদের মনোভাব ও কার্যক্রম হিন্দুদের বেশী উপকৃত করেছে, আর সুন্নী ওলামা-সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান ছিলো ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে। আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- এসব ওহাবী-দেওবন্দীরা তাদের ওই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভুল স্বীকার না করে উল্টো আ’লা হযরত তথা সুন্নী ওলামা-সাধারণের প্রতি ইংরেজদের তথাকথিত পক্ষাবলম্বনের অপবাদ দিয়ে বেড়ায়। সুন্নী মুসলমানগণ যদি ইংরেজদের কখনো বন্ধু হতো, তবে তার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণও থাকতো; কিন্তু সব সময় সুন্নী মুসলমানগণ এ অপবাদ থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র; পক্ষান্তরে, ওহাবী-দেওবন্দী, আহলে হাদীস, কংগ্রেসী মৌলভীদের ইংরেজ প্রীতি ও হিন্দু প্রীতির বহু অখণ্ডনীয় প্রমাণ পাওয়া যায়।
[ওহাবী মাযহাবের হাক্বীক্বত ইত্যাদি প্রমাণ্য পুস্তক দ্রষ্টব্য]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *