সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > হজ্ব এবং কুরবানি > কুরবানীর ইতিহাস

কুরবানীর ইতিহাস

মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ বখতিয়ার উদ্দীন

عليه السلام قالوا فما لنا فيها يا رسول الله قال بكل شعرة خمسة قالوا فالصرف يا رسول الله قال بكل شعرة من الصوف حسنة

[ابن ماجة]

অনুবাদ : হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম, প্রিয় নবীজির নিকট আবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কুরবানী কী? উত্তরে নবীজি ইরশাদ করলেন- কুরবানী তোমাদের পিতা ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম এর সুন্নাত, তারা বললেন এতে আমাদের কী ফজিলত? নবীজি বললেন প্রতিটি পশমের বিনিময়ে পাঁচটি করে সওয়াব। তারা বললেন, ছুফ এর জন্যও? নবীজি জবাব দিলেন- ছুফ (অধিক পশম বিশিষ্ট পশু) এর জন্য নেকী রয়েছে।[ইবনে মাজাহ শরীফ]

>> প্রাসঙ্গিক আলোচনা<<

কুরবানী প্রভূ প্রেমে আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এই কুরবাণীর প্রথা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর সন্তান হাবিল-কাবিলের মাধ্যমে শুরু হয়ে যুগে যুগে ছিল এখনো আছে। তবে আমরা যে কুরবাণী করে থাকি তা হল হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর সুন্নাত। বস্তুত হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম এর সন্তান কুরবানী দেয়ার এ অবিস্মরণীয় ঘটনাকে প্রাণবন্ত করে রাখার জন্য উম্মতে মোহাম্মদীর উপর তা ওয়াজিব করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে-فصل لربك وانحر সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।

আমাদের শরিয়তে যে কুরবানীর বিধান রয়েছে তার ইতিহাস ও রহস্য মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম’র সাথে সম্পৃক্ত। মহান আল্লাহ্ পাক তাঁকে একের পর এক পরীক্ষা করে সবশেষে নিজের একান্ত বন্ধু হিসেবে ঘোষণা দেন। প্রথমত নমরূদ কর্তৃক অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ, হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর উপর অগাধ বিশ্বাস এবং চরম ধৈর্য্যরে মাধ্যমে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরূপ স্বীয় স্ত্রী আর দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মরুভূমিতে নির্বাসনের নির্দেশ, তিনি সেই পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। এভাবে বড় বড় তেত্রিশটি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে সবকটিতে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। সবশেষে পরীক্ষা নেয়া হয়, নিজের কলিজার টুকরো, আদরের সন্তান ইসমাঈল আলায়হিস্ সালামকে কুরবানীর নির্দেশের মাধ্যমে।
হাদীস শরীফে রয়েছে- হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম এক হাজার বকরি, তিনশত গাভী এবং একশত উট আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করেন। মহান রবের প্রতি এমন ভালবাসা দেখে মানুষতো বটে ফেরেশতারাও আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। ফেরেশতাদের অবাক হওয়া দেখে তিনি বললেন আমি আমার রবের জন্য যা করেছি তা তো কিছুই না বরং আমার যদি একটা সন্তান থাকত, রবের সন্তুষ্টির জন্য আমি আমার সেই সন্তানকে কুরবানী দিতেও দ্বিধাবোধ করতাম না। এদিকে অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। কথাটিও তাঁর স্মরণের অগোচরে চলে যায়। অতঃপর যখন তিনি পবিত্র ভূমি মক্কাতে পদার্পণ করেন- রাব্বুল আলামীনের দরবারে সন্তানের জন্য ফরিয়াদ করলে আল্লাহ্ পাক কবুল করেন এবং হযরত ইসমাঈল আলায়হিস্ সালাম এর জন্ম হয়। মায়ের আদর-যত্নে লালিত পালিত শিশু হযরত ইসমাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর বয়স যখন সাত কিংবা দশ বছর হয় পিতা ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামকে স্বপ্নে বলা হল- ওহে ইব্রাহীম! এবার তুমি তোমার প্রিয়বস্তু আমার রাস্তায় কুরবানী দাও।

উল্লেখ্য, নবীদের স্বপ্নও অহী। এভাবে তিনদিন দেখার পর তিনি স্বীয় আদরের দুলাল ইসমাঈলকে বললেন, বাবা! আমি স্বপ্নে দেখছি তোমাকে জবেহ করছি, পুত্র বললেন, বাবা! আপনি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছেন তাই করেন। আমাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হিসেবে পাবেন। পরিশেষে পিতা পুত্র উভয়ে মিনার প্রান্তরে গিয়ে বাবা পুত্রকে মাটিতে শায়িত করে ধারাল ছুরি দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও জবেহ করতে না পেরে পেরেশান হয়ে গেলেন। এক পর্যায়ে রাব্বুল আলামীন বেহেশত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে ইবরাহীমের ছুরির নিচে দিয়ে বললেন-

وناديناه ان يا ابراهيم قد صدقت الرويا انا كذالك نجزى المحسنين

অর্থাৎ, আমি আহ্বান করলাম হে ইবরাহীম ! নিশ্চয় তুমি তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছো। এভাবেই আমি পুণ্যবানদের পুরস্কৃত করি।

সেদিন হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম বেহেশতের দুম্বা কুরবানী দিয়েছিলেন আর উম্মতে মোহাম্মদীর উপর রাব্বুল আলামীন ওয়াজিব করেছেন, বকরি, গরু, মহিষ, উট, ভেড়া ইত্যাদি। অপর বর্ণনায় এসেছে কুরবানীর পশুকে তোমরা সম্মান করো- কেননা এগুলো হাশরের ময়দানে পুলসিরাতের উপর তোমাদের বাহন হবে।

অপর বর্ণনায় রয়েছে কুরবানীর বাজারে যাওয়াও ইবাদত। পশু ক্রয় বিক্রয়ের জন্য কথোপকথন ও তাসবীহ্ হিসেবে লেখা হবে। পশু ক্রয়ের জন্য ঘর হতে বের হওয়ার পর প্রত্যেক কদমের পরিবর্তে একটি করে নেকী লিপিবদ্ধ করা হয়।

উল্লেখ্য, মুসলমানদের নেক আমল সমূহের মধ্যে কুরবানী একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ আমল। রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কুরবানী বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন-

 من كان له سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانا 

অর্থাৎ,সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।

আমাদেরকে বুঝতে হবে কুরবানী কেবল আনুষ্ঠানিকতার নাম কিংবা খাওয়া দাওয়ার নাম নয়। এটি একটি মহান ইবাদত বরং তাঁর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। তাই সেই কুরবানীতে থাকতে হবে একাগ্রতা আরো থাকবে অকৃত্রিম মুহব্বত। কারণ, রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন

لن ينال الله لحومها ولا دمائها ولكن يناله التقوى

অর্থাৎ, আল্লাহর নিকট পশুর মাংস, রক্ত কিছুই পৌঁছবে না বরং পৌঁছবে তোমাদের তাকওয়া।

Check Also

পবিত্র হজ্বঃ মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যের প্রতীক

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী হজ্ব ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। দৈহিক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *