সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা > ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনঃ তাৎপর্য ও পর্যালোচনা

ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনঃ তাৎপর্য ও পর্যালোচনা

মুফতী হাফেজ মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের অসংখ্য নি’আমত দান করে ধন্য করেছেন । তাঁর নিয়ামতরাজি গুনে শেষ করা যাবেনা । একইভাবে এর শুকরিয়া আদায় করেও শেষ করা যাবেনা । মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করছেন-

وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا

“আর যদি আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ গণনা কর, তবে সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবেনা ।” [১]

নিঃসন্দেহে আল্লাহর অনুগ্রহের কোন সীমা নেই, কোন নির্ধারিত সংখ্যা বা হিসাব নেই; কিন্তু তাঁর অফুরন্ত অনুগ্রহরাজির অন্যতম প্রধান, সর্বশ্রেষ্ঠ , এমনকি সকল অনুগ্রহের মূল ও প্রাণ হল হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্ত্বা । যার বদৌলতে সমগ্র অনুগ্রহের সূচনা ও স্থায়িত্ব । আ’লা হযরত মুজাদ্দেদে দ্বীন মিল্লাত ইমাম ইশক্বে মুহাব্বত শাহ আহমদ রেযা বেরেলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-

وہ   جو نہ  تھے تو کچھ نہ تھا وہ جو نہ  ہوں تو کچھ نہ ہو

جان ہیں وہ جہان کی ، جان ہے تو جہان ہے

অর্থাৎ “তিনি যখন ছিলেন না, তখন কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিলনা । তাঁকে যদি সৃষ্টিই করা না হত, তাহলে কোন কিছুরই সৃষ্টি হতোনা । সমগ্র জাহানের তিনি প্রাণ , যতদিন প্রাণ থাকবে ততদিন এই জাহান থাকবে ।”

এজন্যেই আল্লাহ তা’আলা তাঁর(নবীজী) পবিত্র সত্ত্বাকে অনেক মহান, অনেক বেশী গুরুত্ব এবং তাৎপর্যপূর্ণ করে প্রেরণ করে অনুগ্রহ করেছেন । ইরশাদ হচ্ছে-

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولا مِنْ أَنْفُسِهِمْ

“নিশ্চয়ই আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের উপর যে, তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ হয়েছেন” । [২]

যেহেতু আল্লাহ তা’আলা ঈমানদারদের উপর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত প্রদানের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ করেছেন । এজন্যেই ঈমানদারগণ সেই নিয়ামতকে সবচেয়ে বড় মেনে অতি উৎকৃষ্ট পন্থায় এর শুকরিয়া আদায় করে । ঈমানদারেরা তাই যেই পবিত্র মাস ও দিনে এই নি’আমত লাভ করেছে, সেই দিন ও মাসকে নির্দিষ্টভাবে ঈমানের সাথে উদযাপন করে । আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে’র নানা জায়গায় স্বীয় অনুগ্রহরাজির স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও সর্বদা তাঁর নিয়ামতের আলোচনা করার নির্দেশ প্রদান করেন । তিনি ইরশাদ করেন-

وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ

“এবং আপনার প্রতিপালকের নি’আমতের খুব চর্চা করুন”। [৩]

এবার আল্লাহ পাক নির্দিষ্ট করে হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সর্বশ্রেষ্ট নি’আমত হিসেবে উল্লেখ করত এর নাফরমানি ও অকৃতজ্ঞতা কারীদের কাফির মুরতাদ ঘোষণা করেন-

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ بَدَّلُوا نِعْمَةَ اللَّهِ كُفْرًا

“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অকৃতজ্ঞতাবশতঃ পরিবর্তিত করেছে” । [৪]

বুখারী শরীফ ও অন্যান্য তাফসীরগ্রন্থসমূহে মুফাসসিরকুল সম্রাট প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম হতে বর্ণিত, “অকৃতজ্ঞতা পোষণকারীরা কাফির আর আল্লাহ্‌র নি’আমত হল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” । [৫]

যেখানে কুরআনে আল্লাহ্‌র ঘোষণা হতে প্রমাণ হল যে, হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌র খাস নি’আমত । যার উপর আল্লাহ পাক তাঁর খাস অনুগ্রহের উল্লেখ করেন এবং সেই নি’আমতের চর্চা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নির্দেশ প্রদান করেন । সেখানে কোন মুসলমান ঈমানদার আছে যে, সেই পবিত্র নূরানী সত্ত্বার আবির্ভাব ও দুনিয়ার জমীনে তাঁর শান মানের জন্য খুশি হবেনা এবং খুশি উদযাপন করবেনা । এমন ঈমানদার আছে কি ? যে আল্লাহর সবচেয়ে বড় ও প্রিয় নি’আমতের শুকরিয়া আদায় করবেনা, সেই মহান নি’আমতের বেশি বেশি চর্চা করবেনা , তার স্মরণ করবেনা, সেই নি’আমতের স্মরণে মাহফিল সুসজ্জিত করবেনা, তাঁর শুভাগমনের দিনে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুশি উদযাপন করবেনা, জুলুস করবেনা, মীলাদ ক্বিয়াম করবেনা , আর এসকল কাজকে মন্দ বিদ’আত আখ্যায়িত করত বিদ্রুপ করবে । হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ্‌র শ্রেষ্ট ও প্রিয় নি’আমত মেনে তার খুশি উদযাপনে তার চর্চা করা আল্লাহ্‌র আদেশেরই বাস্তবায়ন ।

কুরআনে কারীমে এটাও ইরশাদ হচ্ছে-

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ

“আপনি বলুন, আল্লাহরই আনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া, এবং সেটারই উপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিৎ । তা তাদের সমস্ত ধন দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়” । [৬]

পূর্বাপর বর্ণনায় যেভাবে আল্লাহ্‌র নি’আমতের স্মরণ, আলোচনা করার ব্যাপারে উল্লেখ হয়েছে, এমনিভাবে এখানেও ‘অনুগ্রহ’, ‘দয়া’, ‘রহমত’ এর প্রাপ্তিতে খুশি উদযাপন এর কথাও উল্লেখ হয়েছে । আর কোন ঈমানদার মুসলিম জানে না যে, আল্লাহ্‌র সবচেয়ে বড় নি’আমত, অনুগ্রহ ও দয়া হল হুযুর রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ? [৭]

এখন ‘অনুগ্রহ’ ও ‘দয়া’ দ্বারা যে কোন কিছুকেই উদ্দেশ্য গ্রহণ করা হোক না কেন, এসব কিছুরই মূল, প্রাণ ও প্রধান নিমিত্ত তো তাঁরই পবিত্র সত্ত্বা । উভয় জগতের সব তো তাঁরই দান সবিতে তাঁরই জয়গান । আর তাঁরই পবিত্র সত্ত্বা ও হায়াতের চর্চা, তাঁর বেলাদতের খুশি উদযাপন, তাঁর মর্যাদা সব তো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে তাঁরই ইচ্ছা ও নির্দেশে হয় । আল্লাহ মাফ করুন, এর বিপরীত মত পোষণ ও বিরোধিতা করাই তো বিদ’আত, শিরক ও কুফরী। মাহফিলে মিলাদ হল আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক মহান নিমিত্ত । আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণের মাধ্যম হল ‘মওলুদ শরীফের মাহফিল’ ।  এর মাধ্যমেই যে পাওয়া যেতে পারে উভয় জগতের দয়া ও অনুগ্রহ । তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম যে তা-ই । এতে সুন্নাত বিনষ্টের কিছু নেই, নেই শিরক-বিদ’আত । বরং, এর মাধ্যমেই মূলোৎপাটন হবে সকল শিরক-বিদ’আতের ।

 

নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমণের দিনের তাৎপর্যঃ

হযরত ক্বাতাদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি রাসূল পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারে রোজা রাখার ব্যাপারে জানতে চেয়ে আরজ করলে তিনি ইরশাদ করেন-

وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ

“এই দিনেই আমার আবির্ভাব হয় আর এই দিনই আমার উপর কুরআন অবতীর্ণ শুরু হয়”। [৮]

নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ঘোষণার মাধ্যমে তাঁর শুভাগমণের দিন ও কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার দিনকে স্মরণ করা এবং শুকরিয়া আদায়ে রোজা রাখা প্রমাণিত হয় ।  সপ্তাহের হিসেবে যেমন বেলাদত শরীফ ও কুরআন আবতীর্ণের দিনকে স্মরণ করাকে তাৎপর্যপূর্ণ করা হয়েছে । এমনিভাবে বাৎসরিক হিসাবে বেলাদত শরীফ ও কুরআন অবতীর্ণের দিন ও মাসকে স্মরণ করা, উদযাপন করা উম্মতের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য আমল । কুরআন অবতীর্ণের দিন সোমবার ২৭শে রমজান হওয়ার কারণে সাধারণ হিসাবে রমজান মাস কুরআন অবতীর্ণের মাস । একইভাবে নির্দিষ্ট করে ২৭ রমজান কুরআন অবতীর্ণের রাত হিসেবে শবে ক্বদর উদযাপন করা হয় । এভাবেই ১২ই রবিউল আওয়াল বেলাদত শরীফের দিন ও রবিউল আওয়াল মীলাদের মাস হিসেবে ঈমানদার মুসলমানদের জন্য স্মরণীয় বরণীয় দিন ও মাস । সকলে প্রতি বছর যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে তা পালন করে ।
বুখারি শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম আহমদ বিন মুহাম্মদ কুস্তলানী ও মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যাকার শায়খ মুহাক্কিক আল্লামা আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী আলাইহিমুর রাহমাহ বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মত শীর্ষস্থানীয় ইমামগণ বর্ণনা করেন যে, বেলাদত শরীফের রাত শবে ক্বদর হতেও উত্তম । এরপর তিনি বলেন, যখন জুমু’আর দিনকে আদম আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট করে সম্মানিত করা হয়েছে সেখানে সায়্যিদিল মুরসালীন রাহমাতুল্লিল আলামীনের শুভাগমনের দিন কত সম্মানিত হতে পারে ? [৯] আ’লা হযরত ইমাম ইশকে মুহাব্বত আহমদ রযা ফাজেল বেরেলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ভাষায়-

 جس سہانی گھڑی چمکا طیبہ کا چاند

اس دل افروز ساعت پہ لاکھوں سلام

“যে পবিত্র ক্ষণে চমকিত হয়েছে তাইয়েবার ওই চাঁদ, মনোমুগ্ধকর সেই ক্ষণের প্রতি জানাই লক্ষ লক্ষ সালাম ।” 

‘ঈদ’ শব্দের বিশ্লেষণ

‘ঈদ’ (عِيد) শব্দের বাংলা অর্থ হল- খুশি হওয়া, আনন্দ প্রকাশ করা, উৎসব, একত্রিত হওয়া, উল্লাস করা ইত্যাদি ।

প্রখ্যাত অভিধানগ্রন্থ আল মু’জামুল ওয়াসীত গ্রন্থে বলা হয়েছে-

عِيد  وكل يَوْم يحتفل فِيهِ بذكرى كَرِيمَة أَو حَبِيبَة

“এমন প্রত্যেক দিনকে ঈদের দিন বলা হয়, যেদিন কোন সম্মানিত অথবা প্রিয়তম ব্যক্তির স্মরণে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়” । [১০]

لمّا كان ذلك اليوم مجعولا للسّرور في الشريعة كما نبّه النّبيّ صلّى الله عليه وسلم بقوله: «أيّام أكل وشرب وبعال» صار يستعمل العِيدُ في كلّ يوم فيه مسرّة، وعلى ذلك قوله تعالى: أَنْزِلْ عَلَيْنا مائِدَةً مِنَ السَّماءِ تَكُونُ لَنا عِيداً

 

“যখন শরীয়তে ঈদের দিন আনন্দ-উৎসব করার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যেরূপ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ হতে জানা যায় । ঈদের দিন সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ঐদিন হল খাওয়া দাওয়া ও আনন্দ উৎসব করার দিন । সুতরাং ‘ঈদ’ শব্দটি প্রত্যেক ঐ দিনের জন্য ব্যবহার করা হয়, যাতে রয়েছে আনন্দ ও খুশি ।” এদিকেই ইঙ্গিত করে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, যা ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন- হে আল্লাহ তায়ালা ! আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা নাযিল করুন, যা আমাদের জন্য ঈদের দিন তথা খুশির দিন হসেবে গন্য হবে । (সুরা আল মায়িদাঃ ১১৪) [১১]

লিসানুল আরব অবিধানগ্রন্থে বলা হয়-

العِيدُ: كلُّ يَوْمٍ فِيهِ جَمْعٌ

“একত্রিত হওয়ার প্রত্যেক দিনকে ঈদ বলা হয়” । [১২]

আল্লামা মুফতি আমীমুল ইহসান মুজাদ্দেদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-

الْعِيد كل يَوْم فِيهِ جمع أَو تذكار لذِي فضل

“ঈদ বলে, কোন উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তির স্মরণীয় দিনকে”।  [১৩]

উলামা কেরামগণের মত পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় যে, ‘ঈদ’ এমন একটি দিন, যা প্রতি বছর আমাদের মাঝে ঘুরে আসে এবং এটা কোন নি’আমত অবতীর্ণ হওয়া ও সম্মানিত ব্যক্তির আগমণ উপলক্ষেও হয় । আর মুসলমানদের জন্য হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে বড় নিয়ামত এবং তাঁর চেয়ে বড় সম্মানিত মর্যাদাবান ব্যক্তি আর নেই । সুতরাং তাঁর শুভাগমনের দিনকে ‘ঈদ’ হিসেবে উদযাপন করা হয় । যে নবী না  হলে কুরআন এবং জগতের অন্যান্য অনুগ্রহ লাভ করা সম্ভব হতোনা, সেই নবীর শুভাগমনের দিন নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ট দিন ।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বাল্লেখিত ঘোষণা হতে জুমু’আর দিনকে হযরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির দিন হিসেবে ঈদের দিন হিসেবে সাব্যস্ত হয় এবং তা তাৎপর্যের দিক থেকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা হতেও তাৎপর্যপূর্ণ । [১৪]

সুতরাং নবীকূল সম্রাট হুযুর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনের দিন ঈদে মীলাদুন্নবী কেন হতে পারেনা ? সেখানে সমগ্র সৃষ্টিই তাঁর ওসীলায়, দয়ায়, তাঁরই সত্ত্বা ও নূর হতে সৃষ্টি হয়েছে ।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সুরা মায়িদার ৩ নং আয়াত-

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ

তিলাওয়াত করলে এক ইহুদী বলল, এই আয়াত আমাদের উপর অবতীর্ণ হলে সেই দিনকে আমরা ঈদ হিসেবে পালন করতাম । এ কথা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নিশ্চয়ই এই আয়াত যেদিন অবতীর্ণ হয়, সেদিন দুটি ঈদ ছিল অর্থাৎ সেদিন ছিল জুমু’আর দিন ও আরাফার দিন । [১৫]

মিরক্বাত শরহে মিশকাত গ্রন্থে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম তাবরানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বরাত দিয়ে একই কথপোকথন হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতেও বর্ণনা করেন । [১৬]

লক্ষণীয় বিষয় হল, দুজন শীর্ষস্থানীয় ও মান্যবর সাহাবী এখানে এই কথা উল্লেখ করেননি যে, ইসলামে কেবল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ঈদ হিসেবে স্বীকৃত এতদুভয় ব্যতীত কোন ঈদের অস্তিত্ব নেই এবং তা পালন অপছন্দনীয় ও বিদ’আত । বরঞ্চ জুমু’আর দিন ছাড়াও আরাফার দিনকেও ঈদের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করার মাধ্যমে এই কথা স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যেদিন তাঁর বান্দাদের জন্য কোন নির্দিষ্ট নি’আমত অবতীর্ণ করেন, সেই দিনকে ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করে নি’আমতের কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ প্রকাশ করতে হবে । আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রত্যেক খুশির দিনই ঈদ ।

মোটকথা, জুমু’আর দিন, আরাফার দিন, কুরআন অবতীর্ণের দিন, নি’আমত পূর্ণের আয়াত অবতীর্ণের দিন ঈদ, প্রত্যেক নি’আমত ও করুণা অবতীর্ণের দিন ঈদ এবং প্রত্যেক খুশির দিন ঈদ হিসেবে স্বীকৃত হলে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সব ঈদ হতে উত্তম হয়না কি করে ? যে নবীর শুভাগমণ সবচেয়ে বড় সব কিছুর মূল, তা তো সবচেয়ে উত্তম দিন হতে বাধ্য ।

কুরআন কারীমে ইরশাদ হচ্ছে-

قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنزلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لأوَّلِنَا وَآخِرِنَا 

“মরিয়ম তনয় ঈসা আরয করলেন, হে আল্লাহ, হে আমাদের রব! আমাদের উপর আকাশ থেকে একটা ‘খাদ্য-খাঞ্চা’ অবতারণ করুন, যা আমাদের জন্য আনন্দের (ঈদ) নিমিত্ত হবে, আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য” । [১৭]

সুবহানাল্লাহ! যখন আসমান হতে খাদ্য-খাঞ্চা এবং মান্না-সালওয়ার মতো মতো নি’আমত অবতীর্ণের দিন ঈদের দিন হিসেবে সাব্যস্ত, তখন সবচেয়ে বড় নি’আমত মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিন ঈদের দিন হওয়াতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে ? ইমাম আহমদ বিন মুহাম্মদ কুস্তলানী, আল্লামা মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল বাক্বী যুরক্বানী, আল্লামা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী আলাইহিমুর রাহমাহ বর্ণনা করেন-

فرحم الله امرأ اتخذ ليالي شهر مولده المبارك أعيادًا

“আল্লাহ পাক ঐ ব্যক্তির উপর রহমত করুন, যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনের মাসের রাতসমূহকে ঈদের ন্যয় পালন করে” । [১৮]

দেখুন, এমন সব সম্মানিত গ্রহণযোগ্য মুহাদ্দিসগণ কেবল এক রাত নয়, বরং মওলুদ শরিফের রাতসমূহকে ‘ঈদ’ হিসেবে ঘোষণা দেন এবং মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালনকারীদের জন্য ক্ষমা কল্যাণের দু’আ করেন । যেই দিনের বরকতে রবিউল আউয়াল মাসের রাতসমূহ ‘ঈদ’ হয়, সেই নির্দিষ্ট দিন ১২ই রবিউল আউয়াল কিভাবে ঈদ হয়না ?
হুযুর কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান সবচেয়ে উত্তম । আর মক্কাবাসী দুই ঈদের চেয়ে এই পবিত্র স্থানে অধিকহারে মাহফিলে মীলাদ পালন করত । হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এই পবিত্র স্থানে মীলাদ মাহফিল আয়োজনের ঘটনার সাক্ষ্য প্রদান করেন । [১৯]

ইমাম ইবনে হাজর মাক্কী ,তাফসীরে কবীর প্রণেতা ইমাম ফখরুদ্দিন রাযী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি সামান্য লবণ, গম বা অন্য কোন খাদ্য দিয়ে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাহফিল আয়োজন করবে, নিশ্চয়ই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতে এ সংশ্লিষ্ট সব কিছুতেই বরকত হবে । সে খাবার ততক্ষণ পর্যন্ত অস্থিতিশীল থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত ভক্ষণকারীকে আল্লাহ মাফ না করেন ।[২০]

মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ইমাম সুয়ূতী, ইমাম সুবুকী, ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী, ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী, ইমাম সাখাভী আলাইহিমুর রাহমাহর ন্যায় শীর্ষস্থানীয় ইমাম হতে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের বৈধতা ও গুরুত্ব বর্ণনা করেন, ‘মীলাদুন্নবী’ উদযাপন তাঁর শুভাগমণ, তাঁর প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসা প্রদর্শনের মাধ্যম । মুসলমানরা সদা সর্বদা সর্বস্থানে তা পালন করে । [২১]

হুযুর কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “নিশ্চই আমার উম্মত পথভ্রষ্টতার উপর একমত হবেনা” । [২২]

তাঁর এই বাণীর মর্ম পাওয়া মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদযাপনের স্বপক্ষে মুসলিম উম্মাহর আবস্থান এবং পথপ্রদর্শক উলামাদের মতামত । তাঁর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শনের এক মহান নিমিত্ত হল মীলাদ উদযাপন । এর বিরোধিতা কেবল পথভ্রষ্ট ও শয়তানের অনুসারী ব্যক্তিদের পক্ষেই সম্ভব । আল্লাহ পাক আমাদের মীলাদুন্নবী উদযাপনের মাধ্যমে সরকারে দো’আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন । আমীন বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন ।

 

  • তথ্যসূত্রঃ

১. সুরা ইবরাহীম আয়াতঃ ৩৪, অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
২. সুরা আলে ইমরান আয়াতঃ ১৬৪, অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
৩. সুরা আদ দোহা আয়াতঃ ১২, অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
৪. সুরা ইবরাহীম আয়াতঃ ২৮, অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
৫. সহীহ আল বুখারী ১:১১৮/২০৭ হাদীস নং-৫৬৭/৫৪২ ।
৬. সুরা আল ইউনুস আয়াতঃ ৫৮ অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
৭. সুরা আল আম্বিয়া আয়াতঃ ১০৭ অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
৮. সহীহ মুসলিম কিতাবুস সিয়াম হাদীস নং- ১১৬২ দারু ইহয়ায়ুত তুরাছিল আরাবি বৈরুত ।
৯. কুস্তলানী শরহে মাওয়াহিবে লাদুনিয়াহ ১:১৩২-১৩৫, মাদারিজুন নবুওয়ত ২:১৩ ।
১০. আল মু’জামুল ওয়াসীত ২:৬৩৫ দারুত দা’ওয়াহ মিশর ।
১১. রাগিব ইস্পাহানী কৃত আল মুফরিদাত ৫৯৪পৃঃ দারুল ক্বলম বৈরুত ।
১২. ইবনে মানযুর কৃত লিসানুল আরব ৩:৩১৯ দারুস সাদির বৈরুত ।
১৩. কাওয়ায়িদুল ফিকহ ৩৯৫ পৃঃ আশরাফী বুক ডিপো ভারত ।
১৪. ইমাম খতিব তবরিযী কৃত মিশকাতুল মাসাবীহ হাদীস নং-১৩৬৩ আল মাকতাবল ইসলামী বৈরুত ।
১৫. ইমাম খতিব তবরিযী কৃত মিশকাতুল মাসাবীহ হাদীস নং-১৩৬৮ আল মাকতাবল ইসলামী বৈরুত ।
১৬. মোল্লা আলী ক্বারী কৃত মিরক্বাত শরহে মিশকাত ৩:১০২২ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১৭. সুরা আল মায়িদা আয়াতঃ ১১৩, অনুবাদ আ’লা হযরত কৃত কানযুল ঈমান ।
১৮. কুস্তলানী মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যাহ ১:৯০ মাকতাবাতুত তাওফিক্বিয়্যাহ মিশর ,মা সাবাতা বিস সুন্নাহ ১০২ পৃঃ।
১৯. জাওয়াহিরুল বিহার ৩:১১৫৪, ফুয়ুজুল হারামাইন ৮০ পৃঃ ।
২০. আন নে’মাতুল কুবরা আলাল আলাম ৯ পৃঃ ।
২১. তাফসীরে রুহুল বয়ান ৯:৫৬ সুরা ফাতহ ৪৮ নং আয়াতের আলোচনা, দারুল ফিকর বৈরুত ।
২২. ইমাম খতিব তবরিযী কৃত মিশকাতুল মাসাবীহ হাদীস নং-১৭৩ আল মাকতাবল ইসলামী বৈরুত ।

Check Also

ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাঃ কোরআন, সুন্নাহ্ ও ইজমা’র আলোকে [তৃতীয় পর্ব]

[দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন এখানে] মূলঃ আল্লামা ঈ’ছামানে আল্ হিময়ারী জেনারেল ডাইরেক্টর – ওয়াক্‌ফ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *