সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > আদব ও শিষ্টাচার > ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার

আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ জালালুদ্দীন

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! আমি আজ আলোচনা করব এমন একটি বিষয়ে,প্রতিটি মানুষ যার প্রয়োজন অনুভব করে প্রতিটি মুহূর্তে। যে বিষয়ে সচেতন ও দায়িত্ববান না হলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তার আশা করা যায় না। বরং বলা যায় জীবনে পূর্ণতাই আসে না। জীবনকে অর্থবহ ও অনাবিল সুখময় করতে হলে সে বিষয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হয় যথাযথভাবে। বিষয়টির সাথে আমরা সকলেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিষয়টি হলো, ‘প্রতিবেশী ও তার অধিকার’।

মানুষ হিসাবে আমাদেরকে সমাজবদ্ধ জীবন যাপন করতে হয়।আমাদের সমাজে বসবাস করতে গেলে কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়।সমাজ ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী। প্রতিবেশী ভালো হলে সামাজিক জীবন সুন্দর ও মধুময় হয়। এর বিপরীতে প্রতিবেশী মন্দ হলে সমস্যার কোনো শেষ থাকে না। এক প্রতিবেশী অন্য প্রতিবেশী ও তার সন্তানদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে থাকে, পরস্পর মেলা-মেশা ও দেখা-সাক্ষাতের কারণে। সে হিসেবে প্রতিবেশী যদি সৎ হয় তাহলে ব্যক্তির ঘর ও পরিবার নিরাপদ হয়ে যায়। আর যদি অসৎ হয়, তাহলে উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও অকল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভালো প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীর গোপন বিষয় অবহিত হলে গোপন রাখে। আর অসৎ প্রতিবেশী তা প্রকাশ ও প্রচার করে বেড়ায়। ভালো প্রতিবেশী ভালো কাজে সাহায্য করে, সৎ উপদেশ দেয়। আর অসৎ প্রতিবেশী ধোঁকা দিয়ে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। তাই ইসলামে প্রতিবেশী নির্বাচনের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য হল, সব সময় সৎ প্রতিবেশী বেছে নেয়ার দিকে দৃষ্টি দেয়া; যে তার অধিকারগুলো আদায় করবে; এবং তাকে কষ্ট দেবে না; যে তাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। বলা হয় ‘বাড়ি বানানোর পূর্বে প্রতিবেশী নির্বাচন কর’।

প্রতিবেশী কারা?

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! প্রতিবেশী মূলত নিজ বাড়ির আশে পাশে বসবাসকারীকে বলা হয়। কেউ বলেছেন: নিজের বাড়ীর চতুর্দিকে চল্লিশ ঘর পর্যন্ত হচ্ছে প্রতিবেশীর সীমানা। আবার কেউ বলেন, যে তোমার সাথে ফজর পড়ল সেই তোমার প্রতিবেশী, ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতামত হচ্ছে, নিজের বাড়ীর পাশে যার বাড়ী সেই আসল প্রতিবেশী। সে হিসেবে নিজ বাড়ীর সাথে লাগানো বা কাছাকাছি প্রতিবেশীর প্রতি, দূরের প্রতিবেশীর চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে। যে ব্যক্তি সমাজে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রতিবেশী, সেই প্রতিবেশী।সফর সঙ্গী অথবা কাজের সঙ্গীকেও প্রতিবেশী বলা হয়। অনুরূপভাবে বাজার, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির অভিন্নতার দিক থেকেও প্রতিবেশী হতে পারে। নিজ দেশের পার্শ্ববর্তী দেশও প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত।

প্রতিবেশী মুসলিমও হতে পারে আবার অমুসলিমও। পূন্যবানও হতে পারে আবার পাপীও। প্রতিবেশীই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে নিকট জন, যিনি তার খবরাখবর সম্পর্কে অন্যদের তুলনায় বেশি জানেন। তাই ইসলাম ধর্মে প্রতিবেশীর অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং তার অধিকারকে খুব বড় করে দেখা হয়েছে।

এক ধরনের প্রতিবেশী আছে যার অধিকার তিনটি। আর সে হলো নিকটাত্মীয়-মুসলমান-প্রতিবেশী। তার অধিকার তিনটি হলো: ১) আত্মীয়তা, ২) ইসলাম ও ৩) প্রতিবেশীত্ব। আরেক ধরনের প্রতিবেশী আছে যার অধিকার দু’টি। আর সে হলো অনাত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী। এ প্রতিবেশীর অধিকার হলোঃ ১) প্রতিবেশীত্ব ও ২) ইসলাম । আরেক ধরনের প্রতিবেশী রয়েছে, যার অধিকার একটি। আর সে হলো অমুসলিম প্রতিবেশী। এ প্রতিবেশীর অধিকার শুধু প্রতিবেশীত্ব।

প্রতিবেশী সম্পর্কে আমাদের ইসলাম কী বলে?

আজকে আমরা সেই সম্পর্কে জানতে এবং তার উপর আমলের চেষ্টা করব। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :

“তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী” (সূরা আন নিসা : ৩৬)।

সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:

“জিবরীল আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে অনবরত অসিয়ত করতে থাকেন, এমনকি এক পর্যায়ে আমার ধারণা হয়েছিল, আল্লাহ তা‘আলা তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন” (বুখারী ৬০১৪ ও মুসলিম ২৬২৪)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন কল্যাণমূলক কথা বলে,না হয় নিশ্চুপ থাকে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর সম্মান রক্ষা করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন নিজ মেহমানের মেহমানদারী করে’ (বুখারী ও মুসলিম)।

প্রকৃত ঈমানদার মানুষের দ্বারা কখনো তার প্রতিবেশী কষ্ট পেতে পারে না। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পাক জবানে ইরশাদ করেন:

“আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়।প্রশ্ন করা হলো- হে আল্লাহর রাসূল! ‘কোন ব্যক্তি? তিনি ইরশাদ করেন: “যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ নয়।” (সহীহ বুখারী ৬০১৬)

প্রতিবেশীর অসুবিধা হয় এমন কাজ করা যাবে না, যেমনঃ কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া, অর্থাৎ তাকে অভিশাপ দেওয়া, তার গীবত করা, কটুকথা বলা, নিন্দা করা,গোয়েন্দাগিরি করা, পরনিন্দা করা, তিরস্কার করা, উত্ত্যক্ত করা, গালি দেয়া, কুৎসা রটানো, খোঁটা দেয়া,গোলযোগ ও মনোমালিন্য সৃষ্টি করা, উপহাস করা, ছিদ্রান্বেষণ করা ইত্যাদি।

এক ব্যক্তি রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরয করলো,

‘হে রাসূলুল্লাহ, অমুক মহিলা প্রচুর নফল নামাজ, রোজা ও সদকার জন্য প্রসিদ্ধ কিন্তু প্রতিবেশীকে কটুকথা বলার মাধ্যমে কষ্ট দেয়। রাসূলুল্লাহ বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি আবার বললেন, হে রাসূলুল্লাহ অমুক মহিলা সম্পর্কে খ্যাতি রয়েছে যে, সে নফল নামাজ, রোজা ও সদকা করে; কিন্তু নিজের জিহ্বা(কথা) দিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে জান্নাতে যাবে।’ রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে দুই ব্যক্তির মামলা আল্লাহর আদালতে বিচারার্থে পেশ করা হবে তারা হবে দু’জন প্রতিবেশী। (মিশকাত)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:

“সেই ব্যক্তি মু’মিন হতে পারে না, যে ব্যক্তি নিজে পেট ভরে পানাহার করে, কিন্তু তার পার্শ্বেই প্রতিবেশী খাদ্যের অভাবে অভুক্ত থাকে।” (মিশকাত-বায়হাকী)

রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, ‘দরিদ্র প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন ধনী প্রতিবেশীকে জাপটে ধরে বলবেঃ হে আল্লাহ, এই ভাইকে তুমি সচ্ছল বানিয়েছিলে এবং সে আমার নিকটেই থাকত; কিন্তু আমি ভুখা থাকতাম আর সে পেটপুরে খেত। তাকে জিজ্ঞেস করো, কেন সে আমার ওপর দরজা বন্ধ করে রাখত এবং আমাকে বঞ্চিত করত।(হাদিস)

উপঢৌকন প্রদান করাঃ

প্রতিবেশীকে মাঝে মাঝে কিছু উপহার প্রদান করা উচিৎ।এর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় ও দ্বন্দ্ব নিরসন হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরকে ভালোবাস এবং উপঢৌকন দাও।’

আবূ যার রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

“হে আবূ যার! যখন তুমি ঝোল (ওয়ালা তরকারি) রান্না করবে, তখন তাতে পানির পরিমান বেশী কর। অতঃপর তোমার প্রতিবেশীর বাড়িতে রীতিমত পৌছে দাও। (মুসলিম ২৬২৫)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :

“হে মুসলিম রমণীগণ! কোন প্রতিবেশী যেন অপর প্রতিবেশীর দেয়া কোন উপঢৌকন কে তুচ্ছ মনে না করে। যদিও তা একটি বকরীর সামান্য পায়াও হয়।” (বুখারী ২৫৬৬ ও মুসলিম ১০৩০)

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আরয করলেন, আমি হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম,

ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমাদের দু’জন প্রতিবেশী আছেন। আমি উপঢৌকন পাঠাতে চাই একজনের কাছে। এখন আমি কার কাছে পাঠাবো? আল্লাহর নবী জবাবে ইরশাদ করলেন, “ঐ প্রতিবেশীকে পাঠাবে, যার ঘর তোমার ঘরের অধিক নিকটে।” (বুখারী ৬০২০,২২৫৯, আবূ দাউদ ৫১৫৫)

প্রতিবেশী অমুসলিম হলেও:

হজরত ইবনে উমরে রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র একজন ইহুদি প্রতিবেশী ছিল। যখনই তার বাড়িতে ছাগল জবাই হতো, তিনি বলতেন, আমার ইহুদি প্রতিবেশীকে কিছু গোশত দিয়ে আস (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর কাছে উত্তম।আল্লাহর নিকট সেই প্রতিবেশী সর্বোত্তম,যে তার প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে সর্বাধিক উত্তম।”(তিরমিযী ১৯৪৪, আহমাদ ৬৫৩০, দারমী ২৪৩৭)

একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল ! আমাকে এমন একটি কাজ বলে দিন, যা করলে আমি জান্নাতে যেতে পারব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বললেন, পরোপকারী হও। সে বলল, আমি কিভাবে বুঝব পরোপকারী হয়েছি কি না? রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বললেন: তোমার প্রতিবেশীর কাছে জিজ্ঞেস করো সে যদি বলে যে, তুমি পরোপকারী, তাহলে তুমি পরোপকারী (বায়হাকি)।

প্রতিবেশীর প্রতি অন্য কর্তব্যগুলো হলো:

প্রতিবেশীকে সালাম দেওয়া, তার সালামের উত্তর দেয়া, কেউ অসুস্থ হলে তার সেবা-সুশ্রুষা করা, বিভিন্ন উপলক্ষে তাকে দাওয়াত দেয়া এবং তার দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করা, প্রয়োজনে সাহায্য করা, কোন জিনিস ব্যবহার করতে চাইলে তা দেয়া, ইত্যাদি।তার দুঃখ-কষ্টে যেমন সহমর্মিতা দেখাতে হবে তেমনি তার ভাল কোন সংবাদ যেমন-সন্তান জন্ম নিলে, তার সন্তান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে,কারো বিয়ে হলে এবং এ জাতীয় উপলক্ষে তাকে মোবারকবাদ জানানো এবং বরকতের দোয়া করতে হবে।

Check Also

ইসলামে মুসাফাহার বিধান

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী عن البراء بن عازب قال قال رسول الله صلى …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *