সাম্প্রতিক আপডেটঃ
Home > রোযা ও রমযান সংশ্লিষ্ট > আহলান সাহলান মাহে রমযান

আহলান সাহলান মাহে রমযান

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

 

নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি ওয়ানুসাল্লিমু আলা হাবীবিহিল কারীম আম্মা বা’দ, বছর ঘুরে আমাদের মাঝে সমাগত হয়েছে পবিত্র রমযান মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হতে প্রদত্ত অঢেল নিয়ামতরাজির অন্যতম একটি নিয়ামত হল রমযান। এ মাসের ফজিলত,বরকত ও নিয়ামত বর্ণনা করে শেষ করা যাবেনা। এ মাস দু’আ কবুলের মাস, ইবাদতের মাস, দান-সদকার মাস, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস । আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসকে ‘শাহরুন আযীম’ এবং ‘শাহরুন মুবারাকাহ’ বলেছেন । আসীম ফযীলতের মাস রমজান । এ মাস মানুষের জন্য সৌভাগ্যের মাস ।

প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ সামর্থ্যবান নর-নারীর জন্য রমযান মাসে রোযা রাখা ফরয। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে –

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে ঈমানদারগণ ! তমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের পরহেযগারী অর্জিত হয় ।[১] 

আরও ইরশাদ হয়-

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
সুতরাং, তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই সেটার রোযা পালন করে । আর যে ব্যক্তি রুগ্ন হয় কিংবা সফরে থাকে, তবে ততোসংখ্যক রোযা রাখবে অন্য দিবসসমূহে । [২]

♦ হাদীস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে-
عَنْ جَابِرٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” قَالَ رَبُّنَا عَزَّ وَجَلَّ: الصِّيَامُ جُنَّةٌ يَسْتَجِنُّ بِهَا الْعَبْدُ مِنَ النَّارِ، وَهُوَ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ
হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার রব ইরশাদ করেন নিশ্চই সিয়াম তথা রোযা ঢাল স্বরূপ এর মাধ্যমে বান্দা আগুন থেকে মুক্তি পায়। আর তা আমার জন্য আর আমিই এর প্রতিদান দিব ।[৩]
♦ হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-
إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ
নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন রমযান মাস আগমন করে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় । [৪]

♦ বুখারী শরীফে উক্ত হাদীস এভাবে বর্ণিত হয়-
إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ، وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন রমযান মাস আগমন করে, তখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। [৫]

কোন বর্ণনায় রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে। তিরমিযি শরীফে এই বর্ণনায় আরও যোগ হয় যে-
فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ، وَيُنَادِي مُنَادٍ: يَا بَاغِيَ الخَيْرِ أَقْبِلْ، وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ، وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلكَ كُلُّ لَيْلَةٍ
আর একটি দরজাও বন্ধ করা হয়না । আর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে কল্যাণকামী! অগ্রসর হও, হে পাপাসক্ত ! বিরত হও ! আর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে জাহান্নাম হতে বহু লোককে মুক্তি । প্রতি রাতেই এরূপ চলতে থাকে ।[৬]

♦ হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَا أَتَى عَلَى الْمُسْلِمِينَ شَهْرٌ خَيْرٌ لَهُمْ مِنْ رَمَضَانَ، وَلَا أَتَى عَلَى الْمُنَافِقِينَ شَهْرٌ شَرٌّ لَهُمْ مِنْ رَمَضَانَ، وَذَلِكَ لِمَا يُعِدُّ الْمُؤْمِنُونَ فِيهِ مِنَ الْقُوَّةِ لِلْعِبَادَةِ، وَمَا يُعِدُّ فِيهِ الْمُنَافِقُونَ مِنْ غَفَلَاتِ النَّاسِ وَعَوْرَاتِهِمْ، هُوَ غنْمٌ الْمُؤْمِنُ يَغْتَنِمُهُ الْفَاجِرُ
মুসলমানদের জন্য রমযানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমযান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ। [৭] 

উল্লেখিত হাদীসসমূহ হতে বুঝা যায়, রোযা মহান আল্লাহর এক মহান নিয়ামত, এমন মাস যাতে অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত, বান্দাদের ইবাদত ও মাগফেরাতের জন্য রয়েছে প্রচুর সুযোগ । গুনাহের রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়য় আর সাওয়াবের রাস্তা প্রশস্ত করে দেয়া হয়য় । এ মাসে মুমিনের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় । মোট কথা রমযানের আমলের সাথে অন্য মাসের আমলের কোন তুলণাই হয়না । রোযা রাখার মাধ্যমে এবং রোযা রাখা অবস্থার আমল সমুহের মাধ্যমে বান্দা সহজেই আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে যায় এবং আল্লাহর অফুরন্ত রহমতের ভাগীদার হয়।

♦ হাদীস শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা হচ্ছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ، الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ إِلَى مَا شَاءَ اللَّهُ، يَقُولُ اللَّهُ: إِلَّا الصَّوْمَ؛ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ
আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের দশগুণ থেকে সাতশ গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়, আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন বলেন, একমাত্র ব্যতিক্রম হল রোযা। রোযা আমারই জন্য আর আমিই তার (আগণিত-আফুরন্ত) প্রতিদান প্রদান করব ।

উক্ত হাদীসেই রোযা পালন কারীদের মুখের গন্ধ সম্পর্কে ইরশাদ হয়-
وَلَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ
সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশক আম্বরের চেয়ে অধিক প্রিয় । আরও ইরশাদ হয়-

لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا: إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ

রোযাদারের জন্য রয়েছে দুটি খুশি যা তাকে আনন্দিত করবে । এক যিখন সে ইফতার করবে এবং খুশি হয় দুই যখন সে তার রবের সাক্ষাত লাভ করবে এবং রোযার বিনিময় লাভ করবে । [৮]

এমন নেয়ামত কে না পেতে চায় আর কজনই বা হারাতে চায় । রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমযান আমাদের মাঝে তার অফুরন্ত ভান্দার নিয়ে উপস্থিত হয়য় । বান্দা তার আমল দ্বারা এই মাসকে অতিবাহিত করে আর এর বরকত হাসিল করে । এ মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দার সকল গুবাহ মাফ করে দেয়া হয় । সে সম্পূর্ণ নিস্পাপ বনে যায় । আসুন এই সুমহান মাসকে স্বাগত জানাই আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে । আর এ মাসকে অতিবাহিত করি আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবা ও আওলিয়া কেরামের নির্দেশনা অনুসারে । এ মাসকে ভরিয়ে তুলি ইবাদত, রোযা, ইস্তেগফার, কুরআন তিলাওয়াত, যিকর, দরূদ, দান-সাদকা সহ নানা আমল দ্বারা । আর নিজেদের মুক্ত রাখি সকল পাপকাজ, বিদ’আতি [এমন কাজ যা ইসলামী শরীয়ত সমর্থন করেনা এমন কাজ নয় কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমর্থন করেনা] জুলুম হতে । আল্লাহ আমাদের হেদায়াতের উপর অটল রাখুন এবং মাহে রমযানের বরকত লাভের তাওফিক দান করুন, বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন ।

তথ্যসূত্রঃ

১. সুরা বাক্বারা আয়াতঃ১৮৩ , আনুবাদ কানযুল ঈমান ।
২. সুরা বাক্বারা আয়াতঃ১৮৫ , আনুবাদ কানযুল ঈমান ।
৩. মুসনাদে আহমদ,হাদীস নং-১৪৬৬৯ , বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান ৫:১৯৩ হাদীস নং-৩২৯২
৪. সহীহ মুসলিম ,কিতাবুস সিয়াম (بَابُ فَضْلِ شَهْرِ رَمَضَانَ) হাদীস নং- ১০৭৯
৫. সহীহ বুখারী, কিতাবুস সাওম (بَابٌ: هَلْ يُقَالُ رَمَضَانُ أَوْ شَهْرُ رَمَضَانَ، وَمَنْ رَأَى كُلَّهُ وَاسِعًا) হাদীস নং- ১৮৯৯/১৮০০
৬. সুনানে তিরমিযি, আবওয়াবুস সাওম হাদীস নং- ৬৮২, সুনানে ইবন মাজাহ হাদীস-১৬৪২
৭. মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৩৬৮,৮৮৭০, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস-৮৯৬৮,৮৮৭৬, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-১৮৮৪ ।
৮. সহীহ মুসলিম, কিতাবু সিয়াম, বাবু ফাদ্বলিস সিয়াম ২:৮০৭ হাদীস নং-১১৫১ [দারু ইহইয়ায়ুত তুরাসিল আরাবী বৈরুত], সহীহ বুখারী, কিতাবুস সাওম (بَابٌ: هَلْ يَقُولُ إِنِّي صَائِمٌ إِذَا شُتِمَ) হাদীস নং- ১৯০৪/১৮০৫ ।

Check Also

রোজার শারিরিক ও মানসিক উপকারীতা

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান অনেক মুসলমানই  স্বাস্থ্যজনিত কারণ দেখিয়ে রোজা রাখেন না,অথচ কুরআনে কারীমে রোজা রাখার ব্যাপারে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *